নির্বাচনী মাঠে রাজনৈতিক দল

একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে আরো দেড় বছর পরে। কিন্তু দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আর বিএনপি তাদের প্রস্তুতি কাজ আরম্ভ করেছে এর মধ্যে। জাতীয় পার্টির এরশাদও পিছিয়ে নেই। এ অশীতিপর বৃদ্ধ সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদও জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামী নির্বাচনে প্রত্যেক কেন্দ্রে প্রার্র্থী দেয়ার জন্য। শুনলাম বামরাও একটা ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে, সম্ভবত তারাও পৃথকভাবে নির্বাচন করবে। ওলামা মাশায়েকেরও অনেক দল আছে। তাদের সংঘবদ্ধ হওয়ার কোনো প্রক্রিয়া এখনো চোখে পড়েনি।

ওলামাদের পক্ষে সংঘবদ্ধ হওয়া কঠিন। তারা সম্ভবত দুই ডমিনেন্ট পার্টির লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত থাকবে। জামায়াতে ইসলামী বহু কিছু হারিয়েছে সত্য কিন্তু এখনো তাদের কাজ বন্ধ হয়নি। অন্য পার্টির চেয়ে তাদের সাংগঠনিক কাজের গতি কম তা বলা যাবে না। বিএনপির সঙ্গে তারা বিএনপির মার্কা নিয়েই নির্বাচন করবে। এটা অনেকটা নির্ধারিত সত্য। এ ছাড়া তাদের অন্য কোনো পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না। নিশ্চয়ই কোনো এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কারণে বিএনপি আর জামায়াতের ঐক্য অটুট রয়েছে।

বিএনপি অনেক বদনাম গায়ে মেখেও জামায়াতকে ছাড়েনি। জামায়াতও কখনো বেগম জিয়ার অবাধ্য হয়নি। ২০১৩ সালের শেষ চার মাস এবং ২০১৫ সালের প্রথম ৯৩ দিন বেগম জিয়া রাষ্ট্রটিকে অনেকটা জিম্মি করে ফেলেছিলেন। তাতে তো জামায়াতেরই অবদান বেশি। শুধু মাঠে মানুষ নামাতে পারেননি বলে এমন একটি ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ বেগম জিয়াকে ঘরছাড়া করেছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের যুদ্ধপরাধের দায়ে বিচার করেছে, ফাঁসি দিয়েছে, সুতরাং এসব দুঃখ-বেদনার শোধ নেয়ার কোনো মওকা তাদের নাগালের মধ্যে এলে নিশ্চয়ই তারা তা নেবে। এখন নিশ্চুপ ধ্যান করছে শুধু সে সুযোগের অপেক্ষায়।

বেগম খালেদা জিয়া তো বিভিন্ন ইফতার অনুষ্ঠানে বলে বেড়াচ্ছেন এক কাপড়ে বের করে দেবেন। অবশ্য শেখ হাসিনার নসিব ভালো। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে তেমন কোনো কথাবার্তা হয়নি। বিদেশেও কেউ শেখ হাসিনার সরকারকে অমান্য করেনি। অবশ্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন জিতলে হয়তো সরকার অসুবিধার সম্মুখীন হতো। শেখ হাসিনার কপাল ভালো হিলারি জিততে জিততে হেরে গেছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনও সেরূপ কিছু হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। শেখ হাসিনার বৃহস্পতি মনে হয় তুঙ্গে। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের একটানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ হবে।

দশ বছর তো কম সময় নয়। প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার সম্মুখীন তো হবেই। তবে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জনিপ্রয়তা এখনো কম নয়। সম্ভবত মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সময়ও তার জনপ্রিয়তা অব্যাহত থাকবে। কর্মীর সংখ্যা আওয়ামী লীগে বেশি। একটানা দশ বছর ক্ষমতায় সুতরাং আগের চেয়ে এখন কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। বিএনপির বহুকর্মী এমনকি জামায়াতে ইসলামীর কিছু কর্মীও আওয়ামী লীগে যোগদান করেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকাতে কর্মীদের মাঝে অলসতা এসেছে। টাকা রোজগারের ফন্দি-ফিকির করতে গিয়ে কিছু বদনামও কামিয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষমতায় গেলে সব রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এ কর্মটা করে থাকে। সব দলেই সৎ ও ত্যাগী নেতাকর্মী এখন বিলুপ্তির পথে। কিছু সময়ের মাঝে সৎ ও ত্যাগী নেতাকর্মী বাটি চালান দিয়েও কোনো দলে সম্ভবত আর পাওয়া যাবে না। এ কারণেই রাজনীতি মহিমা হারাচ্ছে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা-সর্বত্র রাজনীতির এমনই হাল। পশ্চিমবঙ্গে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে কয় টাকা দিতে হয়। থানা নিজেই জিজ্ঞেস করে ‘রাজনদের’ সঙ্গে দেখা হয়েছে কিনা। দেখা না হলে থানা ডায়েরি নেয় না। এটা ক্ষমতাসীন দল আর থানার সঙ্গে সম্ভবত সমঝোতা।

এমনিতেই বিএনপিতে যোগ্য নেতার অভাব। বিএনপির স্থায়ী কমিটির চেহারা দেখলেই তা বোঝা যায়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভূমিকা রাখতে হলে এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ বজায় রাখতে হলে খুবই উর্বর মস্তিষ্কের নেতৃত্বের প্রয়োজন সে লোক বিএনপিতে কোথায়! তারেক জিয়ার যদি শাস্তিই হয় তবে তিনি তো বীজাগারেই থেকে গেলেন ডালপালা মেলে তো বৃক্ষ হতে পারলেন না। এমতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বিএনপির কাণ্ডারি কে হবেন?

গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার আয়ুষ্কালও মনে হয় ফুরিয়ে আসছে। দলীয় ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। সেই শক্তিটাই যদি রোগাক্রান্ত হয়ে যায় তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা আর বেঁচে থাকবে কীভাবে? রাজনীতি শুধু একটা কেতাবি বিষয় নয়। এটি একটি নৈতিক ইস্যুও। নৈতিক অপরিহার্যতা এবং নৈতিক সম্পূর্ণতার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে এতে। কিন্তু এখন রাজনীতি থেকে নৈতিকতাকে ঝেঁটিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে সহিষ্ণুতা, সমতা, সুবিধাবঞ্চিতদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কোনো মূল্যবোধই রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের মাঝে নেই। আসলে এখন রাজনৈতিক দলে যেসব কর্মী রয়েছে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অথবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য শুধু দলীয় পেটুয়া বাহিনী। স্বার্থের হানাহানিতে প্রতিদিন তারা জীবন হারাচ্ছে।

একাদশ সংসদে আওয়ামী লীগকে ভোট দিলাম দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিলাম অনুরূপ বদলা-বদলিতে রাজনীতির কেন গুণগত পরিবর্তন আসবে না। এটা একটা পর্বত প্রমাণ সমস্যা। আবার যে কোনো বড় জাতীয় সমস্যা মোকাবিলার মতো জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার যোগ্যতাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর মতো দু’একজন নেতা, রাজনীতির মাঠে রয়েছেন যাদের যোগ্যতা ও সততা সম্পর্কে মানুষের আস্থা রয়েছে। কিন্তু তারা দীঘির পাড়ের তাল গাছ। সবার উপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু কোনো বন সৃষ্টি করতে পারছেন না। বাম ঘরনার দলগুলো বিভক্ত হতে হতে অনু-পরমাণু হয়ে গেছে। এখন তারা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। হয়তো বা কোনো একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ময়দানে এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি। তৃণমূল পর্যায়ে দলটি নার্সিংয়ের অভাবে বিধ্বস্ত হয়ে রয়েছে। আর জেলা পর্যায়ে যে সব কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে তার নেতৃত্বে বসানো হয়েছে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ লোক অবশ্য তারা পয়সাওয়ালা। তাদের পয়সার জোরে কমিটি হয়েছে। বিএনপি অফিসের সামনে গেলে কর্মীদের মুখে গুঞ্জন শোনা যায়- কমিটি বাণিজ্যে কোন নেতা কত পয়সা হাতিয়ে নিয়েছেন। এটিও আপনি অবহিত হতে পারবেন কোন নেতা ক্ষমতায় থাকতে কত টাকার মালিক হয়েছেন। বর্তমানে তাদের কত ঘরবাড়ি আছে। যে দলের অফিসের সামনে কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে অর্থহীন আলাপে মশগুল থাকে সে কর্মীদের থেকে জাতি কী প্রত্যাশা করতে পারে! বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে এখন হেভস্ অ্যান্ড হেভ্ নটস শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে। যদি একাদশ সংসদ নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন হতে পারে তবে এই দুই দলের মল্লযুদ্ধ খুবই উপভোগ্য হবে।

বিএনপি রূপকল্প ২০৩০ নামে একটা কর্মসূচি দিয়েছে। খোদ বেগম জিয়াকে কোনো মিটিংয়ে বা ইফতার পার্টিতে এ সম্পর্কে আর কিছু বলতে শুনিনি। নেতাকর্মীদের মুখে তো তার কোনো কথাই নেই। ইলেকশনে জেতা, কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল করা খুবই শক্ত কাজ। দুর্বল সংগঠন আর অসুস্থ শরীর নিয়ে বেগম জিয়ার সফলতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়া মুশকিল। আবার অসংখ্য মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কোনো কোনো মামলার রায় অচিরেই হয়ে যাবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলার রায় আর ২১ আগস্ট গ্র্রেনেড হত্যার মামলার রায় খুব সহসা হবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হত্যায় তারেক রহমান আসামি। তার ‘হাওয়া ভবনেই’ নাকি গ্রেনেড হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল। এক মামলায় তার ৮ বছরের কারাদণ্ড ও ১২ কোটি টাকা জরিমানা হয়েছে।

গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন কর্মী ও একজন নেত্রী নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশের তৎপরতা আর জজ মিঞার নাটক দেখে ‘হাওয়া ভবন’-এর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় বলে আমাদের মতো লোকেরা কমনসেন্স দিয়ে ধারণা করি। সুতরাং ওই মামলায় বহু লোকের ফাঁসির আদেশও হতে পারে। তারেক জিয়ারও যে একটা শাস্তি হবে তাও অনুমান করা যায়। জিয়া ট্রাস্টের মামলায় মনে হয় বেগম জিয়ার শাস্তি হবে। না হয় এতবার আদালতের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিতেন না। শেষ পর্যন্ত আগামী নির্বাচনের আগেই এই দুই মামলার রায় হবে। এতে যদি তারেক জিয়া এবং খালেদা জিয়া দু’জনই নির্বাচনের অযোগ্য হয়ে যান তবে বিএনপির মূল নেতৃত্বই তো বিধ্বস্ত হয়ে যাবে।

এমনিতেই বিএনপিতে যোগ্য নেতার অভাব। বিএনপির স্থায়ী কমিটির চেহারা দেখলেই তা বোঝা যায়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভূমিকা রাখতে হলে এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ বজায় রাখতে হলে খুবই উর্বর মস্তিষ্কের নেতৃত্বের প্রয়োজন সে লোক বিএনপিতে কোথায়! তারেক জিয়ার যদি শাস্তিই হয় তবে তিনি তো বীজাগারেই থেকে গেলেন ডালপালা মেলে তো বৃক্ষ হতে পারলেন না। এমতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বিএনপির কাণ্ডারি কে হবেন? আসলে ক্ষমতা কীভাবে মানুষকে বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে সম্ভবত আগামীতে বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়া হবে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

দিল্লি থেকে ফিরে এক সাংবাদিক লিখেছেন, বেগম জিয়ার প্রতিনিধিরা নাকি দিল্লিতে বসে আছেন আর দিল্লির অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য লবিং করছেন। আসলে কোনো বড় রাষ্ট্রের হেভি প্রেসার না হলে বেগম জিয়ার বিধ্বস্ত অবস্থা ঠিক করা খুবই মুশকিল হবে। ওই সাংবাদিক আরো লিখেছেন সাউথ ব্লকের অফিসাররা নাকি তাকে বলেছেন, বেগম জিয়া নাকি যে কোনো স্বার্থে ভারতের সঙ্গে নির্বাচনের পূর্বে একটা চুক্তিতে পৌঁছতে চান। জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘মিথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ বলে একটা বই পড়েছিলাম। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বড় রাষ্ট্রের হাতে কীভাবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হারায় বইটাতে তারই বর্ণনা। নিজে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার দিকে বেগম জিয়া পা বাড়ালে ভুল করবেন। ইতিহাসের কাঠগড়ায় আসামি হয়ে থাকবেন চিরদিন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/আরএ