নির্বাচনী বছরে সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংকের

নির্বাচনী বছরে সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংকেরনির্বাচনী বছরে বেসরকারি খাতে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরে সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের মুদ্রানীতিতেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত ছিল।

মঙ্গলবার চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এ সময় ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান, এসএম মনিরুজ্জামান, আহমেদ জামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট পরামর্শক আল্লাহ মালিক কাজমী, ব্যাংকিং রিফর্ম অ্যাডভাইজার এস. কে. সুর চৌধুরী, প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফয়সল আহমেদ, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মো. আখতারুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারি ঋণের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

মুদ্রনীতি ঘোষণাকালে গভর্নর বলেন, নির্বাচনী বছরে টাকার সরবরাহ বেড়ে যাবে। এজন্য আগের ধারাবাহিকতায় প্রবৃদ্ধি সহায়ক এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির ভঙ্গি সংযত ধরনের হবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ জোগান যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকেও নজর রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গভর্নর বলেন, ২০১৮ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির নির্ধারিত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রকৃত অর্জন বেশি অর্থাৎ ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে। তবে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে পরিমিত রাখার লক্ষ্যমাত্রাটি অর্জিত হয়নি। এ বছরের জুনে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আমদানি পণ্যের খরচ বাড়ায় এ মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকগুলোর ছয়নয় সুদহার বাস্তবায়ন নজরদারিতে আছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলো কী হারে আমানত সংগ্রহ করছে এবং ঋণ কী হারে দিচ্ছে, তা নজরদারির মধ্যে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণের ব্যবহার বিলাসী অপ্রয়োজনীয় আমদানি পণ্যের জন্য না হয়ে প্রকৃত উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থান সৃজনমুখী অগ্রাধিকার খাতে ব্যবহার হওয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব নজরদারির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক কর্তৃপক্ষ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি নিবিড়তর করা প্রয়োজন হবে।

এ ছাড়া, বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি পরিমিত রাখার জন্য রফতানি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স অন্তঃপ্রবাহ জোরদার করার পাশাপাশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণ কার্যক্রম জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বর্তমানে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। সুদহার কমানোর কারণে পুঁজিবাজারে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই। পুঁজিবাজারে মিসম্যাচ কমে গেছে। এ ছাড়া আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সুদহার কম রয়েছে। এগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াবে। তাই এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় সবসময় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণীয় কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে। এজন্য মুদ্রানীতি ঘোষণার পর থেকে মূলধন বাজারে ইকুইটি এবং বন্ড ইস্যু কার্যক্রম বিকাশের জন্য বার বার বলা হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সঙ্গে চীনা কনসোর্টিয়ামের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের চুক্তি হয়েছে। চায়নিজদের জড়িত হওয়ার কারণে বর্তমান পুঁজিবাজার আরো গতিশীল হবে। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর জন্য আলোচনা চলছে। এটি সমন্বয় করা হবে। এতে করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়বে। এ ছাড়া দেশের পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় পাশে থাকবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে কাস্টমস কর্মকর্তারা স্বর্ণ যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন ঠিক সেই অবস্থাতেই রয়েছে। তিনি বলেন, ভল্টে কাস্টমসের কর্মকর্তাদের রাখা স্বর্ণের কোনো হেরফের হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট খুবই সুরক্ষিত। ছয় স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তার মধ্যে ৪২টি সিসিটিভি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের স্বর্ণ নিয়ে এই প্রথম তিনি কথা বললেন।

আমদানির সঙ্গে টাকা পাচার হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, এলসির মাধ্যমে আমদানিতে আমাদের অনুসন্ধানে ৪ হাজার কোটি টাকা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তা পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে আরো কাজ চলছে।

প্রসঙ্গত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর দুবার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে থাকে। ৬ মাস অন্তর এই মুদ্রানীতি একটি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পরবর্তী ৬ মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে এর একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

মানবকণ্ঠ/ডিএইচ