‘নির্দলীয়’ ও ‘জাতীয় সরকার’, দাবি আছে রূপরেখা নেই

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন সরকার ব্যবস্থার অধীনে হবে- এ নিয়ে অনেক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে চলছে জোর আলোচনা। এ বিষয়ে আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’, ‘নিরপেক্ষ সরকার’, ‘নির্দলীয় সরকার’, ‘সহায়ক সরকারসহ নানারকম সরকারের নাম। সম্প্রতি এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান, বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদোজ্জা চৌধুরী ঘোষিত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব। বিকল্পধারার এই বিশেষ ‘প্রকল্প’ চলমান রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা।

পাশাপাশি নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ঘনীভূত হচ্ছে এসবের আলোচনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রায় প্রতিদিনই এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত প্রকাশ করছেন। তবে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উত্থাপন না করায় এ নিয়ে আলোচনায় কেউই কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে এ নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ শঙ্কিত। আবার সমস্যার সমাধান না হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে অশনি সংকেত দেখছেন কেউ কেউ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’ এবং ২০১৬ নভেম্বর থেকে ‘সহায়ক সরকারের’ অধীনে জাতীয় নির্বাচনের কথা বলছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে খালেদা জিয়া যথাসময়ে এই সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়ার কথা বললেও এখনো সেই রূপরেখা আসেনি অথচ দলের শীর্ষ নেতারা বলে আসছেন নির্বাচন হতে হবে সহায়ক সরকারের অধীনে এবং তাদের প্রস্তাব না মানলে তারা আন্দোলনে যাবেন। আবার সহায়ক সরকারের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা না দিয়েই ক্ষমতাসীন দলকে সংলাপে বসার দাবিও জানাচ্ছেন তারা।

সংলাপ না হলে আন্দোলনের হুমকিও দিচ্ছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও বলে আসছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতোই নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার অসাংবিধানিক। আর সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে কাউকে ডেকে আনবে না তারা। কাজেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচন করতে হবে বিএনপিকে। একই সঙ্গে তারা বলছে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি নিশ্চিত পরাজয় জানতে পেরে নির্বাচন থেকে সরে আসার বাহানা করছে এবং নির্বাচন প্রতিহতের কথা বলছে।
সহায়ক সরকারের কোনো স্পস্ট ধারণা ছাড়া এই নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব বা আন্দোলনের হুমকির অর্থ কী? দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলে নির্বাচন প্রতিহতে ঘোষণা দিয়ে সাড়ে চার বছর ধরে সংসদের বাইরে রয়েছে যে বিএনপি সেই দলটি আবারো নির্বাচন বানচাল করতে চাইছে বলে আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্মিলিত এই অভিযোগেরই বা ভিত্তি কী! এ নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে চলছে জোর আলোচনা। বিষয়টি এরই মধ্যে গড়িয়েছে কূটনৈতিক মহলে এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে স্থান করে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে লেখালেখি হচ্ছে।

এ বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই সহায়ক সরকার বলতে কিছু নেই। তাই আমরাও সহায়ক সরকার বলতে কিছু বুঝি না। সংবিধান অনুযায়ী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময় ক্ষমতায় থাকবেন, এটাই নিয়ম। অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে হলে সহায়ক সরকারের দাবি মানতেই হবে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় বিএনপি। আমরা নির্বাচনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে পরিবর্তনে বিশ্বাসী।

তিনি বলেন, এ নিয়ে আমাদের দলের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি এ বিষয়টি ভালো বোঝেন তাদের সবার সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। সবার মতামতের ভিত্তিতেই আমার সহায়ক সরকারের রূপরেখা দিতে চাই। বি. চৌধুরী হ্যাটট্রিক প্রস্তাব: এদিকে ২৯ মে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী আগামী পাঁচ বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি তিন বারের মতো এ প্রস্তাব দিলেন।

তিনি বলেছেন, জাতীয় সরকার হলে দেশে সহিংসতা হবে না, আগুন জ্বলবে না, অন্যায়-অবিচার হবে না। দেশের সব মেধাবী লোক একত্র হতে পারলে বাংলাদেশ আরেকটা সুযোগ পাবে। জাতীয় সরকারের বিষয়ে তার প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান বি. চৌধুরী। তবে এখন পর্যন্ত তিনি এই জাতীয় সরকারের কোনো রূপরেখা প্রকাশ করেননি।

এর আগে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে অবিলম্বে একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানান বি. চৌধুরী। বারিধারার বাসভবনে বি. চৌধুরীর ৮৫তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ঘুমালে চলবে না, একচোখা নীতি ছাড়তে হবে। দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে।’

তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, আগের সংসদের লোকজন এবং অন্যান্য দল ও শ্রেণি-পেশার মধ্য থেকে ভালো মানুষ নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। জাতীয় সরকারে বর্তমান সংসদের লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ এই সংসদের লোকজন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। তবে এর কোনো রূপরেখা তিনি উত্থাপন করেননি।

এর আগে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বি. চৌধুরী ওই সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাবনার সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন। রাজনীতির নিষিদ্ধ সময়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং পাশাপাশি ১০ বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এতে সাড়া দেয়নি।

ফলে বি. চৌধুরীর কোনো প্রস্তাবই হালে পানি পায়নি। তবে এবার কী হয়- এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানামুখী আলোচনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৪ দলের শরিক একটি দলের শীর্ষ নেতা বলেন, আমার গোটা বিষয়টি বেশ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে যাবে নাকি ভিন্নখাতে পরিচালিত হবে তা নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনের ওপর। তবে আমরা আশাবাদী। কারণ এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ দৃঢ়।

মানবকণ্ঠ/এএএম