নিরাপত্তা ও সংবাদকর্মী

মাজহারুল ইসলাম :
‘সাংবাদিকদের সন্তানদেরকে চিকিৎসাই করাব না’
-কিছুদিন আগে এক ডাক্তার নেতার এমন বক্তব্যে বিস্মিত হয়েছিলাম আমরা। আমাদের নৈতিকতার কতটা অবক্ষয় হলে এরকম বেফাঁস কথা চিকিৎসকদের মুখ থেকে বের হয়।
এরকম আরোও বহু কথা শুনতে হয় সাংবাদিকদের।
যখন চিকিৎসক বা চিকিৎসা ক্ষেত্রের দুর্নীতি কিংবা অনিয়ম তুলে ধরা হয়, তখন চিকিৎসকরা সাংবাদিকদের চিকিৎসা করাবে না, যখন পরিবহন সেক্টরের বিশৃঙ্খলা তুলে ধরা হয় তখন পরিবহন মালিকরা কিংবা শ্রমিকরা সাংবাদিকদের পাবলিক বাসে উঠতে দেবে না বলে হুমকি দেয়। অথচ সাংবাদিকরা জনগণের পক্ষে, রাষ্ট্রের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্র্ণ কাজটি করে যাচ্ছে।
সংবাদপত্র কিংবা সাংবাদিকরা একটি সমাজ তথা রাষ্ট্রের দর্পণ।
বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বিশ্বের যা কিছু বিপ্লব তার অগ্রগণ্য ভূমিকা রয়েছে সাংবাদিকদের।
প্রতিটা সমাজে, রাষ্ট্রে যা কিছু অসঙ্গতি, অনিয়ম, দুরাচার সব কিছুই উঠে এসেছে সাংবাদিকদের লিখনীতে। সত্য ও সুন্দরের পক্ষে বরাবরই সাংবাদিকদের অবস্থান গুটি কয়েক হয়তো ব্যক্তি স্বার্থে জড়িত সেটাও নিয়মের বাইরে।
সাংবাদিকরা পেশাগত কারণেই বিভিন্ন বিষয়, স্থান, ঘটনাকে কেন্দ্র করে এর অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক সমুদয় সত্যটা উদ্ঘাটন করে জন সম্মুখে তুলে ধরেন। এটা করতে গিয়ে সম্প্র্রতি সাংবাদিকদের হয়রানি শেষ দেখছি না। প্রতি পদে পদে সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
সম্প্র্রতি ঘটে যাওয়া ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমরা বেশ কিছু সাংবাদিক হামলার ঘটনা দেখেছি। সাংবাদিক এমএ আহাদ হামলার ঘটনাটির ভিডিওচিত্র দেখে আঁতকে উঠে বিবেক।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম অ্যাসোসিয়েট প্রেসের ফটো সাংবাদিক ছেলেটি। গত ৫ আগস্ট জিগাতলা এলাকা যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন সংবাদকর্মীরা।
লাঠি-রড দিয়ে একনাগাড়ে আঘাত করা হচ্ছিল ছেলেটিকে। বাঁচার জন্য কাকুতি-মিনতি করা ছাড়া, তার আর কিছু করার ছিল না। পালানোর পথ খুঁজছিলেন। একটু সুযোগ পেলে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। যুবকরা যেন প্রশিক্ষিত, নির্দয়-নির্মম। তাকে পালানোর কোনো সুযোগ না দিয়ে আঘাত করেই যাচ্ছিল। নিজেকে বাঁচাতে দৌড় দেয় প্রাণ বাঁচানোর জন্যে। রডের আঘাতে ফুটপাতে পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার পরেও আঘাত চলতে থাকে। পুলিশ একটু দূরে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল। আহাদসহ সেদিন কমপক্ষে ১২ জন সংবাদকর্মীকে পিটিয়ে আহত, ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। সবাইকে প্রায় একইভাবে আঘাত করা হয়েছে। আক্রমণের নমুনা দেখে মনেই হচ্ছে এদের মূল টার্গেট সাংবাদিকরা।
কিন্তু কেন?
আন্দোলন যারা করেছেন, যারা সমর্থন করেছেন, যারা সমর্থন করেননি, সংবাদকর্মীরা কারোরই প্রতিপক্ষ নন। যা ঘটনা ঘটছিল, সংবাদকর্মীরা তা সংগ্রহ করছিলেন, নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কারা এই হামলাকারী?
ঘটনার ভিডিওচিত্রে দেখা যাচ্ছে আক্রমণকারীদের। হেলমেট পড়ে থাকলেও কারো কারো চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এদেরকে চিহ্নিত করে কি আদৌ বিচারের আওতায় আনা হবে? আমাদের সরকারের একজন মন্ত্রী যখন সাংবাদিকদের কাছেই হামলাকারীদের তালিকা চাইলেন, আমরা হতবাক হলাম।
বিস্ময় প্রকাশ করব নাকি দুঃখ প্রকাশ করব?
সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে সাংবাদিকদের উপর। এ ধরনের হামলা যে কারো উপরেই হোক না কেন, এটা তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রশাসন তথা সরকারের দায়িত্ব। সরকার চাইলে এদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা খুব কঠিন কাজ নয়। সেদিন হামলার সময় প্রশাসনের ভূমিকা দেখেও জাতি হতবাক। অদূরেই পুলিশ দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু সাংবাদিকদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি কেউ। মনে হচ্ছিল যেন সাংবাদিকরাই অপরাধী! সবাইকে মনে রাখতে হবে এদেশে মেধাবী ছেলেমেয়েরা সাংবাদিকতা করে। এরা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। অনেকে সাংবদিকতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন, করছেন। কেউ কেউ কর্পোরেট সেক্টরের বেশি সুযোগ-সুবিধার চাকরি বাদ দিয়ে সাংবাদিকতা করছেন। ইচ্ছে করলে তাদের অনেকে অন্য কোনো পেশা বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তারা জনগণের স্বার্থে, রাষ্ট্রের স্বার্থে বিবেকের দায়বদ্ধতায় সাংবাদিকতার মতো পবিত্র কাজকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
সাংবাদিকদের প্রতি যেমন সাধারণ পাবলিকের ক্ষোভ যে তারা ঘটনার সঠিক চিত্র তুলে ধরছেন না, আবার প্রশাসন তথা সরকারেও ক্ষোভ তারা সঠিকটা উদ্ঘাটনে সক্রিয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যম একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে এতে সন্দেহ নেই। পাঠকের অভিযোগ ‘গণমাধ্যম অনেক সংবাদ তাদের জানাচ্ছে না। বন্ধুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার অভিযোগেও অভিযুক্ত হচ্ছে অনেক গণমাধ্যম।
সাংবাদিক মহল পড়েছে উভয় সংকটে। ‘জলে মাছ ডাঙায় কুমির’ অবস্থায় চলছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম। প্রতিবার প্রত্যেক দলেরই ক্ষোভ উপচেপড়ে সাংবাদিকদের উপরে। অথচ সাংবাদিকরা কোনো বিশেষ ব্যক্তি কিংবা দলের হয়ে কাজ করছে না, তারা রাষ্ট্রের তথা সাধারণ জনগণের জন্য কাজ করছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত সত্য উপস্থাপনে সদা সচেষ্ট এরা।
এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অপমৃত্য ঘটবে। বাকস্বাধীনতাহীন জাতি মৃতের সমতুল্য। যেখানে সাংবাদিকদেরই টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের অধিকার সেখানে অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ।
সাংবাদিকদের হয়রানির চিত্র শুধু সম্প্র্রতি নয়, ইতিপূর্বেও দেখেছি আমরা। স্বাধীনতা পরবর্তী কোনো সরকারই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রতিবার প্রতিটি সরকার কিংবা বিরোধী দল সকলের কাছেই সাংবাদিকরা দৃষ্টিকটু। প্রভাবশালী দুর্নীতিগ্রস্ত মহল তো সাংবাদিকদের গিলে খাবে মনোভাব পোষণ করে মনে।
সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার অনেকগুলো সংগঠন আছে বলে আমরা জানি। কিন্তু কোনো সংগঠনই সাংবাদিক অধিকার আদায়ে সফল হয়ে ওঠেনি। একজন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়ে পুলিশি হয়রানির শিকার হলে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারছে না এসব সংগঠন। কোনো সাংবাদিক হামলার শিকার হলে পর্যাপ্ত আন্দোলনও করতে পারছে না, কিংবা বিচার চাইতেও পারছে না।
কিছু কিছু সংগঠনকে বিবৃতি দিতে দেখলেও এটা খুবই অপ্রতুল। আর সরকারের তো এ বিষয়ে মাথা ব্যথা নেই বললেই চলে। সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য কঠোর কোনো নীতিমালা নেই সরকারের। যদি থাকত তাহলে সাগর-রুনির কলঙ্কিত অধ্যায় বয়ে বেড়াতে হতো না আমাদের। অনেক বছর কেটে যাচ্ছে সাংবাদিক সাগর রুনি হত্যার, অথচ বিচার কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। আদৌ বিচার হবে কি না সেটাও অজানা। এভাবে সাংবাদিকদের আক্রমণকারী কিংবা হত্যাকারীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকলে খুব দ্রুত আমরা স্বাধীনতার স্বাদ হারাতে বসব।
আমাদের নতুন প্রজš§ এ ধরনের মহান পেশায় আসতে ভয় পাবে। আমাদের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন মহল উদ্বিগ্ন। এ অবস্থা চলতে থাকলে রাষ্ট্রের সমুদয় নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। রাষ্ট্র সুরক্ষার দায়িত্ব যেমন সরকারের, রাষ্ট্রের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রদান করাও সরকারের দায়িত্ব। কোনো ক্রমেই কাল বিলম্ব করা অনুচিত। এ বিষয়ে সম্পাদক মহোদয়গণকে আরো সুসংগঠিত হতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে একতাবদ্ধ হয়ে নিজেদের শক্তিশালী সংগঠনের রূপ দিতে হবে। গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানাতে হবে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ কিছু পদক্ষেপ থাকতে হবে। প্রয়োজনে নীতিমালার খসড়া দিতে হবে সরকারের কাছে।
সাংবাদিকদের সব অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। গণমাধ্যম সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করে না, তারা বিদ্যমান নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে তা নির্মূলে সহায়তা করে থাকে। সত্য প্রকাশে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই কারো, এটা সরকার, প্রশাসন, বিরোধী দলসহ জনসাধারণকে বুঝতে হবে। একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চলতে থাকা দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা তুলে ধরতে সাংবাদিকরা আয়না স্বরূপ। আয়নায় যেমন নিজের চেহারার কুৎসিত দিক ফুটে ওঠে, তেমনি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কুৎসিত দিকটি সাংবাদিকরা ফুটিয়ে তোলেন। এতে করে কিছু দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উšে§াচিত হবেই। তা যে কোনো দল বা গোত্রেরই হতে পারে। ক্ষমতার দাপটে এগুলো ধামাচাপা না দিয়ে সরকারকেও উচিত এসব দুর্নীতিকে সমূলে উৎখাত করা। গণমাধ্যমকে বাহবা দেয়া। ইতিপূর্বে সরকার কর্তৃক তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে সাংবাদিকদের বাকস্বাধীনতা রোধ করা হয়েছে বলেও কেউ কেউ মনে করেন। যদি এরকমটা হয়ে থাকে তা সংশোধিত করে গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে স্বতন্ত্র অধিকার দিতে হবে।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে সাংবাদিকরা বরং সহযোগিতা করে, সুতরাং সাংবাদিকদের শত্রুর কাতারে দেখার কোনো কারণ নেই প্রশাসনের কাছে। কেউ দুর্নীতি করলে এটা উঠে আসবেই, এতে করে গণমাধ্যমকর্মীদের হয়রানি করার সাহস যেন কেউ না পায়। ক্ষমতার দাপটে মিডিয়ার ডানা ছেঁটে দেয়ার পাঁয়তারা মোটেও সমীচীন নয়।
সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যেই ক্ষতির কারণ হবে। রাষ্ট্রের জন্য মরণব্যাধি হয়ে দাঁড়াবে এই কণ্ঠরোধ। পুরো জাতি ছেঁয়ে যাবে অন্যায় অবিচারে। ঘুণে ধরে পঁচে যাবে সমাজের শাসন ব্যবস্থা। শোষিত হবে আম জনতা। মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়ে কাঁদতে ভুলে যাবে নিপীড়িত মানুষ। রাষ্ট্রকে নির্বিঘেœ ধর্ষণ করে যাবে স্বার্থান্বেষী মহলগুলো।
অকালে ঝরে যাবে প্রষ্ফুটিত স্বপ্ন।
অতঃপর হবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপমৃত্যু। ধূলিসাৎ হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার ভবিষ্যৎ। ইতিহাসের কাঠগড়ায় জমা হবে নোংরা এভিডেন্স। মহামান্য সরকারের কাছে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের অনুরোধ থাকবে- আপনারা গণমাধ্যমের প্রতি আন্তরিক হোন। সাংবাদিক বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করে এদেরকে সুরক্ষা করুন। যে বা যারা ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের ওপর অমানবিক হামলার মতো দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন করেছে, তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হোক। তারা যে কোনো মহলেরই হোক না কেন দেশ ও সমাজের শত্রু তারা, তাদেরকে বাড়তে দেয়া যাবে না।
সাংবাদিক নেতারাদের সঙ্গে বৈঠক করে এদের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়া উচিত সরকারকে। সাংবাদিক হামলায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাস্তবায়ন করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এই বাংলায় এমন দুঃসাহস আর কারো না হয়।