নিজের ভাষাটাও ভুলে গেছেন চা শ্রমিকরা

নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন চর্চা থেকে সরে যাচ্ছেন সিলেটের চা বাগানে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষগুলো। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, অবহেলা এবং বিচ্ছিন্নভাবে চা বাগানগুলোতে বসবাসের কারণে নিজেদের ভাষা ও কৃষ্টি জানে না এ প্রজন্মের অনেকেই। চা বাগানে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সহাবস্থানের কারণে ‘চা শ্রমিক’ হিসেবে তাদের পরিচয় তৈরি হয়েছে। যার কারণে তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় পড়ে যাচ্ছে আড়ালে।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, রাজনগরসহ ৭টি উপজেলায় ৯২টি চা বাগান রয়েছে। আর এসব চা বাগানে চা শ্রমিক হিসেবে মুণ্ডা, সাঁওতাল, ওঁড়াও, মাহালি, সবর, পাসি, রবিদাস, হাজরা, নায়েক, বাউরি, তেলেগু, তাঁতি, কৈরী, দেশওয়ারা, বর্মা, কানু, পানিকা, কুর্মী, চাষা, অলমিক, মোদি, তেলি, পাত্র, মাঝি, রাজবংশী, মোদক, বাড়াইক, ভূমিজসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করে।

এদের অধিকাংশ মানুষ অতি দরিদ্র শ্রেণিতে বসবাসের কারণে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন চর্চা করা সম্ভব হয় না। ভাষা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি চর্চা কমে আসায় তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় পড়েছে সংকটে। আর্থ সামাজিক অবস্থার কারণেও তারা তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ধরে রাখতে পারছে না। এ ছাড়া চা শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূজপুরী ভাষায় কথা বলেন। যার ফলে নিজেদের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্র কমে গেছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানের বয়ো মুণ্ডা জানান, ছেলেমেয়েরা এখন মুণ্ডা ভাষা শিখতে চায় না। নিজেদের মধ্যে তারা মাঝেমধ্যে দু’একটা মুণ্ডা ভাষায় কথা বলেন।

মিরতিংগা চা বাগানের আদিবাসী মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর মেয়ে সাবি জানান, তিনি স্থানীয় কমলগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে লেখাপড়া করেন। মা মারা গেছেন অনেক আগে। চা শ্রমিক বাবার অল্প আয়ে চলে না তাদের পাঁচজনের সংসার। তাই মাটি কাটা, কখনো ইট ভাঙার কাজ করে নিজের পড়ালেখার খরচ যোগাড় করেন তিনি। সংসার চালাতেও সহযোগিতা করেন। তবে তিনি জানেন না তার নিজের আত্মপরিচয়, ভাষা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি।

শুধু সাবি নয়, এ অবস্থা তার বান্ধবী দিপালী মুণ্ডারও। দিপালী জানান, তাদের আলাদা সংস্কৃতি কী তা তিনি জানেন না। বাইরে সবার সঙ্গে যে ভাষায় (বাংলা ও ভূজপুরী ভাষায় মিশ্রণ) কথা বলেন পরিবারের মধ্যেও সেই ভাষাতেই কথা বলেন। নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা আছে কিনা তা জানেন না তিনি। কমলগঞ্জ উপজেলার দেওরা ছড়া চা বাগানের অর্জুন ওঁড়াও জানান, তাদের নামের পরে তারা পদবি লিখেন উড়াং। আসলে তারা যে ওঁড়াও আদিবাসী এটা তিনি জেনেছেন কয়েক দিন আগে তাদের সমাজের এক সভায়।

একই বাগানের সত্যজিৎ ওঁড়াও জানান, ওঁড়াও না উড়াং তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। টিকে থাকতে তাদের সংগ্রাম করতে করতেই জীবন পার হচ্ছে। তাই অন্য কিছু ভাবার সময় নেই।

সাঁওতাল মেয়ে মমতা জানান, দেওরাছড়া চা বাগানে তারা মাত্র কয়েকটি পরিবার বাস করেন। এখানে তারা সংখ্যায় অল্প বলে নিজেদের অনুষ্ঠান তেমন হয় না। যার ফলে তারা তেমন কিছু শিখতে পারছেন না। সাঁওতালি কিছু নাচ তিনি জানেন। তবে তাদের ভাষা তিনি জানেন না।

চা শ্রমিক আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেন মৌলভীবাজারের সাংবাদিক আফরোজ আহমদ। তিনি জানান, চা শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই তাদের আত্মপরিচয় ভুলে গেছে। আবার অনেকে আত্মপরিচয় গোপন করছে বাধ্য হয়েই। কারণ আদিবাসী চা জনগোষ্ঠীর মানুষরা সংখ্যালঘু ও বিচ্ছিন্ন। তাদের সমাজে খাটো করে দেখা হয়।

তিনি আরো জানান, দলিত নৃগোষ্ঠী শব্দকর সমাজের অনেকেই এখন ‘শব্দ’ বাদ দিয়ে শুধু ‘কর’ লিখেন। এটা লজ্জাজনক। পিছিয়ে পড়া এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে সংঘটিতভাবে তাদের জীবন চর্চা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যকে লালন করার মাধ্যমে এরা রক্ষা পাবে। আর এই দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা জ্যোতি সিনহা বলেন, ‘ভাষা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে পারলে তাদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে। এ জন্য সরকারের কিছু উদ্যোগ রয়েছে। আমার জেলার সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একত্রিত করে আগামীতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করব। যাতে করে তারা নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে। আর তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছি।’

গবেষকরা বলছেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে এখনই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা এক সময় তাদের আসল পরিচয় হারিয়ে যেতে পারে। আর এদের রক্ষা করতে না পারলে আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যও একদিন হারিয়ে যাবে। আগামীকাল শেষ পর্ব: মজুরির টাকা মদ পান করেই শেষ করে চা শ্রমিকরা

মানবকণ্ঠ/এএএএ্ম