নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রেলে লোকসান, ইজারায় লাভ

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ রেলওয়ে বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনে যাচ্ছে। গত অর্থবছরেও লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। কিন্তু একই ট্রেন যখন বেসরকারি ব্যবস্থাপনা বা ইজারায় দেয়া হয় তখন লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে। এমনটা কেন হচ্ছে? রহস্যইবা কি? এ প্রশ্ন আজ সবার। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবহেলার কারণেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রেলের লোকসান বাড়ছে।

সূত্রমতে, গত কয়েক বছর ধরে লোকাল ও ডেমু মিলে অন্তত ১৫টি ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়া হয়। রেলওয়ের আয় ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, ভাড়া একই, ট্রেনের কোচ ও যাত্রী সংখ্যাও সমান। তারপরও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলাকালে ১৫টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বছরে ১৯ কোটি টাকা লোকসান গুনতো। কিন্তু ইজারা দেয়ার পর প্রতি ট্রেন থেকে বছরে ৭৮ লাখ টাকা মুনাফা করছে রেলওয়ে।

এদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ের আয় বাড়াতে ৫ বছরে দুদফা রেলওয়ের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি বছর এক কিংবা দুবার ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। যার ফলে আয় বাড়লেও তার সঙ্গে ব্যয় বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলের আয় হয় ১ হাজার ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একই অর্থবছরে ব্যয় হয় ২ হাজার ৫৩২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার ২২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ে অপারেশন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তারা বলছেন, গত অর্থবছরে আয় বেড়েছে। ব্যয় বেড়েছে কিনা তা তারা জানেন না। তারা শুধু আয় করছেন, ব্যয় করছেন না। আয়ের পুরো টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন জানান, রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, সঙ্গে সেবাও বাড়ছে। বাড়ছে আয়ও। রেল সেবা খাত, এখানে সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করাই তাদের চ্যালেঞ্জ। ট্রেন চলাচল কখনো বন্ধ থাকে না। যাত্রী কম বা বেশি, ট্রেন চালাতেই হয়। তিনি বলেন, রেলওয়ের আয়ের টাকা পুরো সরকারের খাতে চলে যায়। এ টাকা থেকে সরকার আমাদের আয়-ব্যয় করতে দেয়নি। আমরা সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ট্রেন চালাচ্ছি। জনগণের সার্ভিস আমরা দিচ্ছি। পলিসি নির্ধারণও সরকার করছে। বরং আমরা বিভিন্ন খাত যেমন- রেলওয়ে পুলিশ, নিরাপত্তাবাহিনী, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করছি। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধও আমাদের করতে হচ্ছে। এসব ব্যয় রেলওয়ে থেকে করার কথা নয়। নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে করার কথা। এসব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৮শ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুধু বেতন-ভাতা খাতেই প্রায় ৪শ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে।

রেলওয়ে সূত্রমতে, মূলত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সঠিকভাবে টিকিট বিক্রি ও চেকিং না করায় প্রতিটি ট্রেন থেকেই বড় অংকের আয় বঞ্চিত হতো। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন ৩২ বার যাতায়াত করে ট্রেন। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসব ট্রেন পরিচালনাকালে প্রতি বছর রেলওয়ের ব্যয় হতো ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অথচ আয় ছিল ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এতে প্রতি বছর ৩৮ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হতো রেলওয়েকে। পরে রেলগুলো ইজরাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে ছেড়ে দেয়ার পর থেকে বছরে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।

রেলওয়ের আয়-ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ১৫টি ট্রেন পরিচালনায় বছরে ব্যয় হতো ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জ্বালানি বাবদ ৩২ কোটি ৬৬ লাখ, লোকোমাস্টারের (ট্রেনচালক) বেতন বাবদ ২ কোটি ৯৮ লাখ ও গার্ডের বেতন বাবদ ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় হতো। এ ছাড়া টিকিট ছাপানো ও চেকিং, কোচ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, যন্ত্রাংশের নিরাপত্তা বাবদ ব্যয় হতো ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অথচ আয় হতো ২২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এতে বছরে ১৯ কোটি টাকা লোকসান হতো। ট্রেনগুলো ইজারা দিলেও জ্বালানি তেল, ট্রেনচালক ও গার্ডের ব্যবস্থা রেলওয়ে নিজেই করছে। এতে ১৫টি ট্রেনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। আর আয় হচ্ছে ৩৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এতে ৭৮ লাখ টাকা মুনাফা করছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, বেসরকারি ইজারাদাররা প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করেন। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রেলওয়ের পক্ষে তা সবসময় সম্ভব হয় না। এতে অনেকেই বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করেন। ফলে রেলের আয় অনেক কম হয়। তাই কিছু ট্রেন ইজারা দেয়া হয়েছে।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কয়েক কর্মকর্তা জানান, ইজারা দেয়া প্রতিটি ট্রেনেই আয় বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় বেড়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেনে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলাকালে রুটটিতে রেলওয়ে মাসে আয় করতো ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকা। এখন রেলের আয় হচ্ছে ৫০ লাখ টাকা। যদিও বেসরকারি কোম্পানি মাসে ১ কোটি টাকা আয় করে বলে মনে করেন তারা।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী ট্রেনের ইজারা নেয়া সংস্থা এসআর ট্রেডিংয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেনে প্রতিটি কোচে দুজন করে টিকিট চেকার রাখা হয়েছে। এতে ১৩টি কোচে ২৬ জন নিয়মিত টিকিট চেক করেন। এতে কেউ বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারেন না। যে কারণে আয় অনেক বেড়ে গেছে।

নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেনের পর ইজারা দেয়া অন্যান্য ট্রেনের মধ্যে জামালপুর কমিউটার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস কমিউটার, উত্তরবঙ্গ মেইল ও মহুয়া এক্সপ্রেসের আয় বেশি বেড়েছে। ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটে চলাচলকারী জামালপুর কমিউটার থেকে বর্তমানে রেলের আয় হয় বছরে ৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। একই রুটের অন্য ট্রেন দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার থেকে আয় হয় ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। আগে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ট্রেন দুটি থেকে আয় হতো যথাক্রমে ১ কোটি ৯১ লাখ ও ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই ট্রেনে বছরে আয় বেড়েছে যথাক্রমে ১ কোটি ১৮ লাখ ও ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এদিকে সান্তাহার-পঞ্চগড় রুটে চলা উত্তরবঙ্গ মেইল ট্রেনে আয় বেড়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ও ঢাকা-মোহনগঞ্জ রুটের মহুয়া এক্সপ্রেসে আয় বেড়েছে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। ট্রেন দুটি থেকে বর্তমানে রেলের আয় হয় যথাক্রমে ২ কোটি ৮২ লাখ ও ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর ইজারা দেয়ার আগে আয় ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৫৩ লাখ ও ৭২ লাখ টাকা। খুলনা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও খুলনা-গোয়ালন্দঘাট রুটে মহানন্দা ও নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস একসঙ্গে ইজারা দেয়া হয়েছে। এ ট্রেন দুটি থেকে রেলের আয় বেড়েছে ৬২ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বলেন, রেলকে লাভজনক করার জন্য বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এগুলো চলমান। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রেলওয়ে আর লোকসানে থাকবে না। এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ