নিউজিল্যান্ডের হিরো আজিজ

নিউজিল্যান্ডর ক্রাইস্টচার্চে মসজিদের বাইরে শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি ব্রেনটন ট্যারেন্ট অস্ত্র নিয়ে আস্ফালন করছিলেন। এ দৃশ্য দেখে রক্ত টগবগিয়ে ওঠে আফগান শরণার্থী আবদুল আজিজের। তিনি অস্ত্রবাজকে তাড়া করেন। তখন তার হাতে ছিল কেবল একটি ক্রেডিট কার্ড মেশিন। আর এ কারণে সারাবিশ্বে তিনি আজ প্রশংসিত। গতকাল রোববার ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান এ খবর দিয়েছে।

জঙ্গিকে তাড়া করতে আফগান শরণার্থীর দুঃসাহসিক ভূমিকা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্থানীয়রা তাকে হিরো উপাধি দিলে বিনয়ের সঙ্গে তা উড়িয়ে দেন তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, এমন সময় আপনিও ভাবার কোনো সময় পাবেন না। যাই ভাবেন না কেন, আপনি এমনটিই করতেন।

যদি আবদুল আজিজ কোনো ভ‚মিকা না রাখতেন, তবে নিহতের সংখ্যা আরো বেড়ে যেত বলে জানিয়েছেন লিনউড মসজিদের ইমাম লতিফ আলাবি। তিনি বলেন, শুক্রবার ১টা ৫৫ মিনিটে মসজিদ থেকে বের হই। নামাজ শেষে দেখতে আসছিলাম বাইরে কী ঘটছে। তখন সামরিক পোশাকে এবং মাথায় হেলমেট পরা ভারী অস্ত্র হাতে একজনকে দেখতে পাই। প্রথমে ভেবেছিলাম, তিনি পুলিশ কর্মকর্তা হবেন। ‘এরপর দুটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখতে পাই এবং এ ছাড়া হামলাকারী মুসল্লিদের প্রতি অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করছিলেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম- কিছু একটা ঘটেছে। এটা একটা খুনি।’ ইমাম বলেন, মুসল্লিরা তখন ইতস্তত বোধ করছিলেন। তখন বন্দুকধারী ওই সন্ত্রাসী গুলি করলে জানালা চুরমার হয়ে যায় এবং একটি লাশ পড়ে। লোকজন বুঝতে শুরু করেন, সত্যিকার কিছু একটা ঘটছে।

আলাবি বলেন, তখন আমাদের ভাই (আবদুল আজিজ) বেরিয়ে আসেন। বন্দুকধারীকে ধাওয়া করেন। তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। এভাবেই আমরা নিরাপদ ছিলাম সেদিন। লিনউড মসজিদে জঙ্গি হামলায় শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী এক অস্ট্রেলীয় যুবকের হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার জুমার নামাজ চলছিল, মুসল্লিরা তখন রুকুতে গিয়েছিলেন। তখনই এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে তাদের হত্যা করা হয়। একইদিন আল নূর মসজিদে ৪৩ মুসল্লিকে হত্যা করা হয়েছে। মসজিদটিতে আজিজ ও তার চার সন্তান নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। প্রথমে গুলির বিকট শব্দ পেয়ে তারা ভেবেছিলেন, পটকাবাজি টাইপের কিছু হবে।

কিছুটা সন্দেহ তৈরি হলে আবদুল আজিজ মসজিদ থেকে দৌড়ে বাইরে চলে আসেন। সঙ্গে একটি ক্রেডিট কার্ড মেশিন নিয়ে বের হন। বাইরে এসে সামরিক পোশাকে একজন সশস্ত্র লোক দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, প্রথমে আমি জানতাম না, তিনি ভালো কিংবা খারাপ লোক। কিন্তু হামলাকারী যখন শপথবাক্য পড়ছিলেন, তখন জানলাম- তিনি কোনো ভালো লোক হতে পারেন না। আজিজ সন্ত্রাসীর দিকে ক্রেডিট কার্ড মেশিন ছুড়ে মারেন। এরপর আত্মস্বীকৃত ফ্যাসিস্ট যখন বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকেন, তখন তিনি গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেন। এ সময় তিনি শুনতে পান, তার বছর পাঁচেকের ছেলে তাকে পেছন থেকে ডাকছেন, বাবা ভেতরে চলে এসো।

আবদুল আজিজ একটি খালি শটগান তুলে নেন। এতে শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি নিরুৎসাহিত নিজের হাতের অস্ত্র ফেলে দেন। ছেলে ও অন্যান্য মুসল্লির কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিতে ওই জঙ্গি তাকে বলেন, এখানে এসো, এখানে এসো। এ আফগান শরণার্থী বলেন, যখন তিনি আমার হাতে একটি অস্ত্র দেখতে পান, আমি জানি না কী ঘটেছিল, তিনি অস্ত্র ফেলে দেন। এরপর আমার বন্দুক দিয়ে তাকে ধাওয়া করি। বন্দুকটি তার গাড়িতে ছুড়ে সেটির কাচ ভেঙে দিই। দেখলাম- তিনি খুবই ভয় পেয়ে গেছেন। গাড়ির গতি বেড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে তাড়াতে থাকেন আবদুল আজিজ। এরপর ৪৮ বছর বয়সী এ যুবক মসজিদে ফিরে আসেন। আবদুল আজিজও তিন দশক অস্ট্রেলিয়ায় বাস করেছেন। কয়েক বছর আগে তিনি ক্রাইস্টচার্চে আসেন।

মানবকণ্ঠ/এএম