নারী লাখ টাকা ও দেনমোহর

নারী লাখ টাকা ও দেনমোহর

এক সময় দেশে লাখ টাকার অনেক মূল্য ছিল। কথায় কথায় চায়ের আড্ডায় আলোচিত হতো লাখ টাকার কথা। সে সব আলোচনা আমাদের শিল্প-সাহিত্যে নানাভাবে উঠে এসেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ছিল- তোমরা লক্ষ টাকার গহনা/ দিতে যখন পার না/ বিয়ের বাজারে কন্যা/ এত সস্তা না (আমজাদ হোসেন : গোলাপী এখন ট্রেনে)। এ থেকে বোঝা যায় একজন নারীর বিয়েতে লাখ টাকার গহনা দিলেই পুরুষশাসিত সমাজে তাকে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো। নারীরা যে এখনো খুব বেশি টাকা-পয়সা নাড়াচারা করার সুযোগ পান তাও না। তবে দিন বদল শুরু হয়েছে। সমাজে লাখ টাকার আলোচনা এখন কোটিতে পৌঁছে গেছে। ছেলে এখন লাখোপতি, কোটি টাকার কাবিন নামের সিনেমায় উঠে এসেছে আমাদের জীবনাচার।

আর্থিকভাবে দুর্বল একজন বাংলাদেশের নারী ও তার পরিবারের কাছে বিয়ে, বিয়ের গহনা ও দেনমোহর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ নারী তার দেনমোহরের টাকাও ঠিকমতো পান না। ইসলামি আইনে এই টাকা পাওয়া তার হক বা বিশেষ অধিকার। সেই টাকা দাবি করতে কুণ্ঠাবোধ করেন অনেকেই। আজ থেকে তিন দশক আগেও লাখ টাকা দেনমোহর ছিল সমাজে আলোচিত বিষয়। সে সময় অনেক নারীই স্বপ্ন দেখতেন তার বিয়ের দেনমোহর হবে এক লাখ টাকায়। লাখ টাকার দেনমোহর মিডিয়াতে আলোচিত বিষয় ছিল। এখন মোটা অঙ্কের দেনমোহরে বিয়ে হচ্ছে হরহামেশাই। লাখ টাকাকে ছাড়িয়ে কোটি প্লাস টাকায় পৌঁছে গেছে। বিবাহিত অনেক নারীই আজকাল মনে করেন তার বিয়ের দেনমোহর আরো বেশি টাকাতে হওয়া উচিত ছিল। বিয়ের সময় মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি পারিবারিক ও সামাজিক কারণে। পরিবারের মুরুব্বিদের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারা এখন মনে করছেন বেশি টাকা দেনমোহর হলে তাকে সম্মানিত করা হতো। শ্বশুরবাড়ির পাশাপাশি সামাজিকভাবে তার সম্মান বৃদ্ধি পেত। দেনমোহরের কথা বলতে এখন অনেকেই লজ্জা পান যে, তার দেনমোহর এত কম টাকায় হয়েছিল সমৃদ্ধ এবং শিক্ষিত পরিবারের নারী হওয়ার পরও। কিন্তু আজকের দিনের অনেক নারীই বিয়ের দেনমোহরবিষয়ক কথা বলতে লজ্জা পান না। উচ্চমূল্যের দেনমোহর হালআমলে ফ্যাশনে পরিণত হতে চলেছে। শাড়ি গহনার মতো উচ্চমূল্যের দেনমোহরও তার অলংকার এবং অহংকার। কোন বিয়েতে কম টাকার দেনমোহর হয়েছে শুনলে আগত অতিথিরা দেনমোহরের অংক নিয়ে কানাঘুষা করেন।

দেনমোহরের প্রচলন অতি প্রাচীন ও পুরনো। আমাদের দেশে মুসলিমদের বিয়েতে দেনমোহর গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। আইন মোতাবেক যা পাত্রপক্ষের সামর্থ্য অনুযায়ী হওয়ার কথা। কিন্তু এ নিয়ে রীতিমতো অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে চট্টগ্রামে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মূল্যের দেনমোহরে বিয়ে হয় চট্টগ্রামে। এ প্রতিযোগিতা কম-বেশি সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত হচ্ছে পারিবারের সামর্থ্যের কথা চিন্তা না করে। ফলে বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি, ভাঙছে সংসার। ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। দেনমোহর নিয়ে এ অস্বাভাবিকতাকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দেনমোহর বিযয়ে মানা হচ্চ্ছে না প্রচলিত সামাজিক অনুশাসন। সামাজিক মর্যাদা দেখাতে গিয়ে, দেনমোহর নির্ধারণ কখনো কখনো চলে যায় বাড়াবাড়ি পর্যায়ে। এমনকি তা ৫০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ধরা হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে যার বেশিরভাগই অনাদায়ী রয়ে যায়। ফলে এ নিয়ে প্রায়শ ঘটছে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, দেনমোহর অস্বাভাবিক হলেও নির্লিপ্ত থাকেন নিকাহ রেজিস্ট্রাররা। বেশি দেনমোহর হলে তাদের ফি বহুগুণ বেড়ে যায়। তার থেকে একটি অংশ রেজিস্ট্রার কাজিরা পেয়ে থাকেন। চট্টগ্রামের দু’টি পারিবারিক আদালতে প্রায় ৫ হাজার মামলা বিচারাধীন, তার মধ্যে ২ হাজারই দেনমোহর সংক্রান্ত। আগে ৭০ শতাংশ তালাকের ঘটনা ঘটত স্বামী কর্তৃক। আর এখন ৮০ শতাংশ তালাকের ঘটনা ঘটছে স্ত্রী কর্তৃক।

কখনো কখনো মেহেদীর রং শুকানোর আগেই ভেঙে যাচ্ছে সংসার। বিয়ের আগেই ডিভোর্সের কথা ভেবে অনেক পরিবার দেনমোহর নির্ধারণ করছে। তারা মনে করে বিয়েতে বেশি টাকার দেনমোহর হলে স্বামী স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারবে না। অর্থাত্ ডিভোর্স দেয়া সম্ভব হবে না। ইদানীং অনেক বিয়েতে উচ্চমূল্যে দেনমোহর হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তার আশায়। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, মোহরের পরিমাণ উভয়পক্ষের সম্মতিতে বরের সামর্থ্য ও কনের যোগ্যতা বিবেচনায় নির্ধারিত হবে। এর সর্বনিম্ন কোনো পরিমাপ নির্ধারিত নেই। তবে মোহরের পরিমাণ এত কম হওয়া উচিত নয়, যাতে মেয়ের সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং এত বেশি হওয়া বাঞ্ছিত নয়, যাতে ছেলের ওপর জুলুম হয়। ছেলে বা পাত্রের আর্থিক সঙ্গতি অনুসারেই দেনমোহর হওয়া উচিত। মোটা অঙ্কের দেনমোহর ভালো-মন্দ উচিত-অনুচিতের কথাও সমাজে তেমনভাবে আলোচিত হচ্ছে না। এই টাকা পরিশোধের ক্ষমতা আছে কিনা, সেটা ভাববার অবকাশ কই? সবাই দেনমোহরের ফিগারটাই শুনতে চায়। বিয়ের মজলিসে সেটাই আলোচিত হয়।

উচ্চমূল্যের দেনমোহর নারীকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারছে না। বেশি দেনমোহরের কারণে অনেকের সঙ্গতকারণ থাকা সত্ত্বেও বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে না। নারীরা পুরুষদের ব্ল্যাকমেইল করছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। আবার মোটা অঙ্কের দেনমোহর করেও বিবাহ বিচ্ছেদ ঠেকানো যাচ্ছে না। মোটা অঙ্কের দেনমোহরই নারীর জন্য কাল হয়ে দেখা দিচ্ছে। উচ্চমূল্যের দেনমোহর নারীকে জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে। দেনমোহরের কারণে অনেক ছেলে বিয়ে করতে সাহস পাচ্ছে না। উচ্চমূল্যের দেনমোহর শুধু নারীর জন্য নয়, পুরুষের জন্যও কাল হচ্ছে। চট্টগ্রামের এক ডাঃ স্বামীর আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে। তাদের বিয়ের দেনমোহর ছিল ৩৫ লাখ টাকা। মিডিয়া থেকে জানা যায়, দেনমোহর নিয়ে নানা ধরনের প্রতারণাও হচ্ছে সমাজে।

অনেকেই মনে করছেন, দেনমোহর বৃদ্ধিতে লাখ/কোটি টাকার কাবিন নামক চলচ্চিত্রের প্রভাব কিছুটা হলেও সমাজে পড়েছে। সমাজ বদল না হলে মোটা অঙ্কের দেনমোহরও যে নারীকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। সে ধরনের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। মোটা অঙ্কের দেনমোহরের অসুস্থ মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। বিয়ে টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ওপর। বেশি টাকার দেনমোহরের ওপর নির্ভর করে কোনো দাম্পত্য সম্পর্ক বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। লোক দেখানো দেনমোহর বিকৃতরুচির মানসিকতাই নির্দেশ করে। দেনমোহর নির্ধারণ নিয়ে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। সঙ্গতি অনুযায়ী স্বাভাবিক দেনমোহর ধার্যের অনুশীলন চর্চা করতে হবে। মেনে চলতে হবে ধর্মীয় বিধান ও অনুশাসন।
– লেখক: সাংবাদিক ও রম্যলেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস