নারী ভোটারেই ফল নির্ধারণ

নারী ভোটারেই ফল নির্ধারণএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার নারী ভোটাররা অনেক প্রার্থীর জন্যই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। কোনো কারণে নারী ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না গেলে অনেক প্রার্থীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬। নারী ভোটারের চেয়ে পুরুষ ভোটার মাত্র ৮ লাখ ৮১ হাজার ৮২৯ জন বেশি। আর পুরুষ ও নারী ভোটারের অনুপাত ৫০ দশমিক ৪২: ৪৯ দশমিক ৫৮। দশ বছরে নতুন ভোটার বেড়েছে দুই কোটি ৩২ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারী ভোটারের সংখ্যা এক কোটি প্রায় ১৬ লাখ।

এবারের নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো দেশে ৬টি আসনের ৮০০টি কেন্দ্রের প্রায় ৪ হাজার ২৬৭টি কক্ষে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হবে। ২১ লাখ ২৪ হাজার ৪১১ জন ভোটার ইভিএমে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন। সেখানেও ১১ লাখ নারী ভোটার ইভিএমে ভোট প্রদান করবেন।

আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রায় আড়াই কোটি তরুণ ভোটার অংশ নিতে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে মোট ভোটারের অর্ধেক অংশই হচ্ছেন নারী। পাঁচ কোটির বেশি ভোটারই নারী ভোটার। বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারদেরই বেশি ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত দেখা যায়। তাই ফলাফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নবম সংসদ নির্বাচনের পর যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের আমরা তরুণ ভোটার হিসেবেই বিবেচনা করতে পারি।

নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম এ বিষয়ে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের প্রায় অর্ধেকই নারী ভোটার। তাই নির্বাচনকালীন নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকবে নির্বাচন কমিশন। নারীরা যাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশের প্রথম এই নারী নির্বাচন কমিশনার বলেন, জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে আজকের মধ্যেই বাতিল হওয়া প্রার্থীদের সার্টিফাইড কপি দেয়া হয়। নবম জাতীয় সংসদ নর্বাচনের সময় ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার। এবার ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ জন এবং নারী ভোটার ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। দশ বছরে ভোটার বেড়েছে দুই কোটি ৩২ লাখ। প্রতিটি আসনে ভোটার বৃদ্ধির সংখ্যা গড় প্রায় ৭৭ হাজার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ইসিতে মনোনয়নপত্র জামা দিয়েছেন। আগামী দুই এক দিনের মধ্যে দলীয়ভাবে চ‚ড়ান্ত প্রার্থিতা ঘোষণা দেয়া হবে। এর পরে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী ভোটারদের আশা-আকাক্সক্ষা ভিন্নমাত্রার। শিক্ষিত ও বয়সে তরুণ এই নারীরা ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদেরই ভোট দেবেন। বিষয়টি সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোও নারী ভোটারদের নির্বাচনে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর উন্নয়নের বিষয়টি পেতে যাচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়েই তাদের নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের মধ্যে অর্ধেক নারী ভোটার কার্যত এবারই প্রথম ভোট প্রয়োগ করে আইনসভার জন্য নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। তাই নারীদের অবহেলা করে যাওয়ার দিন প্রায় শেষ। ক্ষমতার মসনদ পেতে হলে তাদের গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই কারোরই।

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের ব্যাপারে জানা গেছে, নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। এক্ষেত্রে ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলক মনোনয়নের বিধান করা হবে। তবে এই বিধান প্রণয়ন করা হলেও আগামী অন্তত দুটি নির্বাচনে ১০ শতাংশ সংরক্ষিত নারী আসন রাখা হবে ৩০০ আসনের বাইরে। এছাড়া, সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার স্থাপন, বেসরকারি ডে-কেয়ার স্থাপনে ঋণ সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও থাকবে। নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারীদের ওপর সংঘটিত নানা অত্যাচার বৈষম্য দূর করা, সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিকভাবে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টিও তাদের ইশতেহারে থাকছে বলে জানা যায়।

২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে ‘দিনবদলে’র নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল, মনে করা হয় ওই ইশতেহার তরুণ প্রজন্মের ভোট আকর্ষণে দারুণ ভ‚মিকা রেখেছিল। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাদের ইশতেহারের স্লোগান ছিল ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ যেখানে সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমানা নাগালে রাখা, শিল্পায়ন বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি ছিল। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করা হয়েছিল ওই ইশতেহারে।

বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করায় ওই বছর তারা কোনো ইশতেহার না দিলেও পরবর্তী সময়ে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাদের একটি লক্ষ্যমাত্রা ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেন। যেখানে সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কথা বলা হয়। রূপরেখায় মানবাধিকার, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দূর করারও অঙ্গীকার করা হয়। নারীদের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা, প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা ভারসাম্য করতে সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সংস্কার এবং দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলা হয় ভিশন ২০৩০-এ।

এবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইশতেহারে কী থাকছে? এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইশতেহারের খসড়া চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ১৭ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হতে পারে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং দারিদ্র্যের হার কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে এবার আওয়ামী লীগের ইশতেহার ঘোষণা করার ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে শোনা যাচ্ছে, এবার দলটির ইশতেহারে গ্রামকে শহর বানানো তথা শহরের সুবিধা গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার থাকছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্যেও গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণীদের উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে পারে।

আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে এবার প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, দুদকের সংস্কার, সরকারি অর্থায়নে দরিদ্রদের শিক্ষা চিকিৎসা ও বাসস্থান, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫, চাহিদা অনুযায়ী কোটা সংস্কারের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে পারে। সেইসঙ্গে এ মুহূর্তে দেশের অন্যতম বড় সংকট রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠানোর অঙ্গীকারও থাকতে পারে তাদের ইশতেহারে।

মানবকণ্ঠ/এএম