নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য, নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়ার জন্য নারী-পুরুষ সবাইকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি। নারীর সমতায়ন, অধিকার বা সামনে এগিয়ে যাওয়া এ সবকিছুর মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। মানুষ যখন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয় তখন সমাজে অন্যরা একটু না একটু সমীহ করে চলে। পরিবারের মধ্যে যার আর্থিক সামর্থ্য বেশি তার কথা সবাই শোনে বা তার মতামতের মূল্য একটু বেশিই থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের দেশের নারীদের অর্থনৈতিক অবস্থান দুর্বল। ফলে সমাজে তারা পুরুষের চাইতে পিছিয়ে থাকে। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে আমাদের দেশে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমাদের উপলব্ধিতে এটি দেরিতে হলেও এসেছে। আর সেই কারণে শিক্ষায় নারীদের অবস্থান এখন পুরুষের চাইতে বেশি লক্ষ্য করা যায়। নারীরা যত শিক্ষিত হবে, দেশ তত দ্রুত এগিয়ে যাবে। নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত উল্লেখযোগ্যভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মোট জাতীয় আয়ের ২৫ থেকে ৩০ ভাগ আসছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত থেকে। দেশের শিল্প শ্রমিকের প্রায় ৮০-৮৫ ভাগের কর্মসংস্থান করছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। পোশাক শিল্প খাতে দুই-তৃতীয়াংশ নারী কাজ করেন। এ খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন এবং নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই। জাতিসংঘে অনুমোদিত এসডিজি ও গ্লোবাল রোডম্যাপ-২০৩০-এ নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে (এসএমই) নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে আর্থিক সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের সহায়ক জামানত ছাড়া ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা প্রদান, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে (শতকরা ৯ ভাগ) পুনঃঅর্থায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রুপভিত্তিক ঋণ সুবিধা প্রদান, ঋণ আবেদন স্বল্প সময়ে প্রক্রিয়াকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে এগিয়ে আসছে। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তবে এ নারীদের মধ্যে উদ্যোক্তার সংখ্যা খুবই নগণ্য। প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনীতির মূল স্রোতে নারীদের অংশগ্রহণ আবশ্যক। নারী উদ্যোক্তাদের যাতে বেশি করে ঋণ দেয়া হয় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়নের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণ বিতরণে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। পুনঃঅর্থায়ন পেতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা খাতে বিতরণ করতে হবে। সাধারণত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থায়ন পেতে হলে দুই বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ট্রেড লাইসেন্স ও প্রযোজ্য জামানত থাকতে হয়। তবে নারী উদ্যোক্তাদের (নতুন উদ্যোক্তা ব্যতীত) ক্ষেত্রে এক বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ঋণ প্রদান করা হয়।

নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে বাংলাদেশ সরকার বেশ সচেষ্ট। সেই লক্ষ্যে ২০১০ সালের শিল্পনীতিতে নতুন করে নারী উদ্যোক্তাদের সংজ্ঞায়িত করেছে। শিল্পনীতি-২০১০ অনুযায়ী, ‘যদি কোনো নারী ব্যক্তি মালিকানাধীন বা প্রোপ্রাইটরি হন কিংবা অংশীদারী প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে শতকরা ৫১ ভাগের মালিক হন, তাহলে সেই উদ্যোগকে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিগণিত করা হবে।’ বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। দেশের অধিকাংশ নারী এখনো অর্থনৈতিকভাবে পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল। দেশের এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পরনির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য একটা বোঝা। যোগ্যতা অনুযায়ী নারীদের কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা অত্যন্ত দরকার। এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ হচ্ছে আত্মকর্মসংস্থান তথা স্বনির্ভরতা। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের বিকল্প নাই।

দেশের বেকার নারীদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা গেলে এতে একজন নারীর নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে কাজ করবে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অর্থনীতির মূল স্রোতে নারীদের অংশগ্রহণ একান্তভাবেই অপরিহার্য। দেশের দারিদ্র্য হ্রাসকরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি জড়িত। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণের মাত্রা এখনো অপ্রতুল। অর্থনীতির মূলস্রোতে নারীদের অংশগ্রহণে বেশকিছু বাধা বিরাজমান। প্রথম এবং প্রধান বাধা এখনো পরিবার থেকেই আসে। তাই সর্বাগ্রে পারিবারিক বাধা দূর করতে হবে। পরিবারের সবাইকে সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। আমাদের নারী সমাজের নিষ্ঠা, মনোনিবেশ, উদ্ভাবনী শক্তি ও শ্রম নিপুণতা ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষের চাইতে অনেক। নারীরা অনেক দায়িত্বশীল। যে কোনো কাজ তারা অনেক দক্ষ এবং সুচারুরূপে করতে সক্ষম। তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা অনুকরণীয়। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে তারা বেশ সচেতন। সেই কারণেই বোধহয় নারীদের খেলাপি ঋণ অনেক কম। বর্তমানে আমাদের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। আর খেলাপি ঋণের কশাঘাত থেকে মুক্তি পেতে নারী উদ্যোক্তাদের বেশি বেশি করে ঋণ প্রদান করা উচিত। মাইক্রো ক্রেডিট কার্যক্রম ও পোশাক শিল্পে নারীদের অব্যাহত অংশগ্রহণ শিল্পায়নে প্রভূত ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে অধিকতর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
– লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এসএস