নারীর ক্ষমতায়নে ইংরেজি

ভাবতেই ভালো লাগে আমাদের দেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি সর্বত্র তাদের পদচারণা। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষ নারী কর্মীর অভাব রয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এমনকি যারা প্রবাসে কাজ করছেন তাদের মধ্যেও। একবিংশ শতাব্দীতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার ভাষা। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন তারা।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির ক্ষেত্রে। বিশ্বায়নের এই যুগে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য/ভেদাভেদ নেই। নারী-পুরুষ সবাইকে ইংরেজি শিখতে হবে। বিশ্বব্যাপী ইংরেজির দাপট দিন দিন বেড়ে চলেছে। ঘর থেকে এক পা বাইরে গেলে ইংরেজির প্রয়োজন হয়। এ দেশের নারীরা ইংরেজি থেকে অনেক দূরে রয়েছে এখনো। ফলে পদে পদে তারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন দেশে-বিদেশে। সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না তাদের মেধা ও যোগ্যতার।

মস্কোর স্পুটনিক নিউজের এক সংবাদে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশি নারী ইংরেজি বলতে পারেন না। আবার ৭ লাখ ৭০ হাজার মানুষ ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলেন বা একেবারেই বলতে পারেন না। তাদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নারী। এই নারীদের অধিকাংশই পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। ইংরেজিতে কথা না বলতে পারার কারণে ব্রিটেন তার নাগরিকদের যেসব সুবিধা দেয়, তার সবটুকু নিতে পারেন না ওই নারীরা।

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিম নারীরা যদি ভালোমতো ইংরেজি ভাষা রপ্ত করতে না পারেন তাহলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে- এমন কথা বলেছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। যুক্তরাজ্যের অভিবাসন আইনে দেশটির নাগরিকরা অন্য দেশ থেকে স্ত্রী বা জীবনসঙ্গীকে বসবাসের জন্য আনতে চাইলে তাকে অবশ্যই ইংরেজি জানতে হবে। এ ধরনের আইনই তারা করেছেন। আমাদের দেশে এমন অনেক নারী আছেন যাদের স্বামীরা যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। সেই স্ত্রীরা যুক্তরাজ্যে যেতে চাইলে তাদের অবশ্যই ইংরেজি ভাষা শিখতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

দেশে অনেক নারীরই ইংরেজি শেখার যথেষ্ট আগ্রহ আছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা বা অবকাঠামো নেই আমাদের দেশে। লজ্জা-সঙ্কচ-ভয়, কো-এডুকেশন, ধর্মীয় বিধি-বিধান আর সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক নারীর ইংরেজি শেখা হয়ে উঠছে না। ভালো ইংরেজি না জানার কারণে কর্মক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বঞ্চিত হচ্ছে নানা ধরনের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে। শুধু ইংরেজি না জানার কারণে আমাদের দেশের নারীরা দেশি-বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে ঝরে পড়ছে মেধা থাকা সত্ত্বে¡ও। প্রতিযোগিতামূলক অনেক চাকরির ক্ষেত্রে তারা সফল হতে পারছে না। প্রত্যাশিত কেরিয়ার তাদের কাছে স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে।

একজন নারী সে যতই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন, ইংরেজিতে দুর্বল থাকার কারণে তার জীবনে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া বারবার বাধাপ্রাপ্ত হবে। শুধু কি তাই? সামাজিকভাবেও তার মর্যাদা হোঁচট খাবে। ইংরেজি ভাষার দক্ষতা প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, উচ্চতর লেখাপড়া চাকরিপ্রাপ্তি, কর্মক্ষেত্রে প্রমোশন তথা সব ক্ষেত্রে সফলতার বিশেষ মানদণ্ড বলে বিবেচিত হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থী যত বেশি গুণাবলির অধিকারিণী বা যোগ্যতর হোক না কেন, একমাত্র ইংরেজি জ্ঞানের অভাবই তাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে ক্রমাগত।

প্রতিটি পরিবারের মাতা-পিতা বা অভিভাকের উচিত তার পরিবারে ছেলে সন্তানটির পাশাপাশি মেয়েটিকেও ইংরেজি শেখার সুযোগ করে দেয়া। এখনো আমাদের দেশের অনেকেই মনে করেন তার পরিবারের নারী সদস্যের ইংরেজি শেখার কোনো প্রয়োজন নেই। মেয়েদের ইংরেজি শিখিয়ে কোনো লাভ হবে না। বিয়ে হয়ে পরের বাড়িতে চলে যাবে। মেয়ের পেছনে বিনিয়োগ করা অর্থহীন। ছেলেদের ইংরেজি শেখালেই চলবে। তাদের এই ভুল ধারণা ভাঙতে হবে দ্রুত। ইংরেজি সবার জন্য, এ বোধ সৃষ্টি করতে হবে আমজনতার মাঝে।

ইংরেজি শুধু কর্মজীবী বা উচ্চশিক্ষিত নারীর জন্যই আবশ্যক, তা নয়। সু-সন্তান গড়ে তুলতে হলে বাড়িতে যে নারীরা থাকেন তাদেরও ইংরেজি শিখতে হবে। আমাদের দেশে এখনো বাড়িতে থাকেন এমন নারীর সংখ্যাই বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর প্রথম পাঠ বা হাতেখড়ি বাড়িতে মায়ের হাতেই ঘটে। নারীদের শুধু শিক্ষিত হলেই চলবে না। আধুনিক ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। আমাদের দেশে পাসের হার বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষিতের হার বাড়েনি। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল থেকেই আমরা জেনেছি ইংরেজির করুণ অবস্থার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে পাস নম্বর পেয়েছে মাত্র দু’জন।

ভারতীয় চলচ্চিত্র ইংলিশ ভিংলিশ অনেকেই দেখেছেন। ইংরেজি না জানার কারণে নায়িকা শ্রীদেবীকে পদে পদে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে তার পরিবার ও সমাজে। ইংরেজি বলতে পারেন না শ্রীদেবী তাই তার স্বামী ও কন্যা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে খারাপ ব্যবহার করে। বিদেশে মানুষের সামনে লজ্জা পায় সে। বিদেশের মাটিতে ইংরেজি শেখার জন্য রীতিমতো কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে শ্রীদেবীকে। শ্রীদেবীর এ চলচ্চিত্র দেখে আমাদের দেশের নারীরাও অনুপ্রাণিত হতে পারেন। এ বয়সেও ইংরেজি শেখা সম্ভব। শুধু সাহস আর ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। তাহলেই অসম্ভবকে সম্ভব করা যাবে। এটা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়।

ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে শহরের নারীরা কিছুটা সুযোগ পেলেও উপজেলা বা গ্রামের নারীরা ভয়াবহভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অতি সাধারণ ইংরেজি সম্পর্কেও তাদের ধারণা নেই। ইংরেজি শেখাকে তাদের অনেকে এখনো ফ্যাশন বা বিলাসিতাই মনে করেন। মনে করেন ইংরেজি তাদের জন্য নয়, যারা দেশ-বিদেশে কাজ করবেন শুধু তাদের জন্যই প্রয়োজন।

তাদের এই ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে সেকেলে মানসিকতা নিয়ে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। চোখ কান খুলে তাকাতে হবে ভার্চুয়াল জগতের দিকে। ইংরেজি ছাড়া পৃথিবী অচল। বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে পড়া সমাজে ইংরেজিই বদলে দিতে পারে যে কোনো নারীর জীবন। এমনকি ইংরেজির মাধ্যমে অনলাইনে ঘরে বসেও আয়-রোজগার করা সম্ভব তাদের পক্ষে। সে ধরনের কাজ শুরু হয়েছে আমাদের দেশেও। বর্তমান পেক্ষাপটে ইংরেজির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে ইংরেজি নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। – লেখক : সাংবাদিক ও রম্যলেখক

মানবকণ্ঠ/এএএম