নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় আর্জেন্টিনার আকাশ!

মহিউদ্দিন পলাশ:
মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়
আড়ালে তার সূর্য হাসে
ক্রোয়েশিয়ার কাছে তিন গোলে হেরে আর্জেন্টিনার আকাশে যে সূর্য অস্তগামী হওয়ার পথে ছিল, সেই সূর্যই আবার উদ্ভাসিত হওয়ার পথে। ক্রোয়েশিয়ার কাছে আর্জেন্টিনার এ রকম বড় ব্যবধানে পরাজয় ছিল হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে ভরদুপুরেই সন্ধ্যা নামার মতোই। সেই সন্ধ্যা দূর করে দিয়েছে নাইজেরিয়া। আবার সেই নাইজেরিয়ার বিপক্ষেই মেসিদের নতুন প্রভাতের সন্ধান করতে হবে। নতুন করে সেই সূর্যের সন্ধান পেতে হলে আর্জেন্টিনাকে আজ হারাতেই হবে নাইজেরিয়াকে! তবে এখানে আবার কিন্তু আছে। মেসিদের চেয়ে থাকতে হবে ‘ডি’ গ্রুপের ক্রোয়েশিয়া ও নবাগত আইসল্যান্ডের ম্যাচের দিকে। এই ম্যাচ যদি আইসল্যান্ড জয় পায়, তখন আইসল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার পয়েন্ট সমান হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে গ্রুপ রানার্সআপ হতে দুই দলের গোল গড় বিবেচনা করতে হবে। দুই দলই শেষ ম্যাচ খেলতে নামবে গোল গড়ে মাইনাসে থেকে। আর্জেন্টিনার-৩ ও আইসল্যান্ডের-২। তখন আইসল্যান্ড যে কয় গোলে জিতবে আর্জেন্টিনাকে তার চেয়ে ২ গোল বেশি দিয়ে জিততে হবে। তবে এ সমীকরণ শুধুই কাগজে-কলমে। কারণ দলগত শক্তির বিচ্ছেদ করলে আইসল্যান্ডের পক্ষে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয় পাওয়া দূরের কথা, ড্র করাটাও হবে অনেক কঠিন। বাস্তব সত্য হলো ক্রোয়েশিয়া হালকা মেজাজে না খেললে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে বড় ব্যবধানেই জেতার কথা।
বিশ্বকাপে নাইজেরিয়া ও আর্জেন্টিনা যেন পরম বন্ধু হয়ে উঠেছে। এবার নিয়ে নাইজেরিয়া ছয়বার বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে। এর মাঝে ৫ বারই দুই দল একই গ্রুপে খেলেছে। তবে এবারের মতো কঠিন সমীকরণে আগে কখনো পড়েনি। যদিও ইতিমধ্যে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতে নাইজেরিয়া বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আর্জেন্টিনার দিকে। যে কারণে সমীকরণটা কিছুটা হলেও হালকা হয়ে এসেছে। তাদের এই সমীকরণে মিলে যাচ্ছে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের বাধা টপকানোর সঙ্গে। যেখানে শেষ ম্যাচে মেসিদের জয়ের পাশাপাশি পেরুর পয়েন্ট হারানোর বিষয়ও ছিল। এই দুই-ই মিলে গিয়েছিল আর্জেন্টিরা ক্ষেত্রে।
আজ সেন্ট পিটার্সবাগে আর্জেন্টিনার জন্য যে জয় ‘অত্যাবশ্যকীয়’ সেই জয় কিন্তু আসার পথে নাইজেরিয়া ছেড়ে কথা বলবে না। ম্যাচে আবার তারা নামবে আর্জেন্টিনার চাইতে ২ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে। নাইজেরিয়ার পয়েন্ট ৩, আর্জেন্টিনার ১। আর্জেন্টিনাকে হতাশায় ভাসিয়ে দিতে নাইজেরিয়ার ড্রই যথেষ্ট। নাইজেরিয়ার এই মনোভাবই হতে পারে আবার আর্জেন্টিনার জন্য বাড়তি সুবিধা। যদিও দলের কোচ গার্নট রোর আশাবাদী আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই দ্বিতীয় পর্বের টিকিট নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে হারাতে অনেক সুযোগ রয়েছে আমাদের সামনে। আমরা জানি আমরা এটা করতে পারব। এটা সত্যিই একটি দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ হবে। কারণ যারা হারবে তারাই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবে।’ কোচের তুরুপের তাস হতে পারেন আহমেদ মুসা। আর্জেন্টিনার হƒৎপিণ্ডের স্পন্দন পুনরায় সচল করেছেন এই আহমেদ মুসাই আইসল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোল দিয়ে। ব্রাজিল বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার দুটি গোল ছিল। যদিও সে ম্যাচে নাইজেরিয়া হেরিছিল ৩-২ গোলে। আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেছিল মেসি ২টি ও মর্কোস রজো।
বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে যে শনির দশা আর্জেন্টিনার লেগেছিল, তা যেন মূল পর্বে এসেও পিছু ছাড়ছে না। নতুবা দুই জায়গাতেই কেন প্রায় একই সমীকরণ থাকবে! যে আর্জেন্টিনাকে শিরোপার সম্ভাব্য দাবিদার ভাবা হয়ে থাকে, তারা এখন দ্বিতীয় পর্বের যাওয়ার জন্য খুঁড়াচ্ছে! মেসি ও তার দলের জন্য যা খুবই বেমানান। সাম্পাওলির দল কি পারবে আজ সব সমীকরণ মেলাতে। না কি সরল অঙ্কের যোগফল মেলনোর মতোই কঠিন হয়ে যাবে তাদের রাস্তা।
ক্রোয়েশিয়ার কাছে বড় হারে আর্জেন্টিনার শিবিরে চাপা ক্ষোভ অগ্নিশিখা হয়ে বের হয়ে এসেছে। যেখানে মেসি থেকে শুরু করে দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন বাঁচা মরার শেষ ম্যাচ তো সাম্পাওলির অধীনে না খেলারই প্রকাশ্য ঘোষণা দেন ৬ মেসিরা। এর কারণ ছিল কোচের একঘুয়েমিতা। সেরা একাদশ নিয়ে মেসিদের অসন্তুষ্টি! দেয়ালে পিঠ পেকে যাওয়াতে যদিও শেষ পর্যন্ত সাম্পাওলি টিকে গেছেন। দলের বৃহত্তর স্বার্থে সব বিভেদ ভুলে সবাই এক হয়ে গেছেন। কোচের সঙ্গে নেই কোনো বিভেদ। মাসচেরানো বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সাম্পাওলির সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।’ তাই সাম্পাওলি আজও থাকবেন ডাগ আউটে। তবে সেখানে থাকবে না তার একঘুয়েমিপনা। সেরা একাদশে তাই আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। পরিবর্তন আসবে তার ফরম্যাশনেও। প্রথম ম্যাচ আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচে তিনি দল সাজিয়েছিলেন ৪-২-৩-পদ্ধতিতে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পরিবর্তন এনে খেলিয়েছিলেন ৩-৪-৩ পদ্ধতিতে। আজকের ম্যাচে থাকছে না এই দুই পদ্ধতিই। সেখানে দেখা যেতে পারে ৪-৩-৩ পদ্ধতি। সেরা একাদশে প্রথমেই ছুড়ে ফেলা হচ্ছে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মারাত্মক ভুল করে প্রথম গোল হজম করা গোলরক্ষক উইলি কাবেয়ারোরকে তার পরিবর্তে গোলপোস্টের সতীত্ব রক্ষা করবেন ঘরোয়া ফুটবলে রিভার প্লেটের হয়ে দারুণ মৌসুম কাটানো ফ্রাঙ্কো আরমানি। পরিশ্রমী খেলোয়াড় ডি মারিয়াকেও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে সেরা একাদশে। অ্যাগুয়েরার পরিবর্তে হিগুয়েনও ফিরছেন সেরা একাদশে।
আর্জেন্টিনা ভক্তদের জন্য আজ মনোবল চাঙ্গা করার মতো আরেকটি রসদ হতে পারে গত দুই ম্যাচে মেসি বা দল কেউই নামের প্রতি সুবিচার করতে না পারা। মেসি বা আর্জেন্টিনার মতো দল সব সময় বাজে খেলতে পারে না। কে জানে নিজেদের সেরাটা তারা আজকের জন্য মজুদ রেখে দিয়েছেন কি না?