নতুন মন্ত্রিসভা: ধাপে ধাপে তৈরি হবে নেতৃত্ব, হবেন অভিজ্ঞ

নতুন মন্ত্রিসভা: ধাপে ধাপে তৈরি হবে নেতৃত্ব, হবেন অভিজ্ঞ

স্বাধীনতা পরবর্তী এবারের একাদশ জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এত দীর্ঘ সময় ধরে দেশ পরিচালনার ইতিহাস শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বেও বিরল। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সবাই উন্মুখ হয়ে ছিলেন পরবর্তী চমক দেখার জন্য। এতদিন সবার দৃষ্টি ছিল নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। কে হবেন কাঙ্ক্ষিত মন্ত্রী, এর আকার হবে কেমন, কারা বাদ পড়ছেন বা নতুন কারা আসছেন— দেশের গুরুত্বপূর্ণ সচিবালয় থেকে মাঠ পর্যায়, সর্বত্রই এ নিয়ে ছিল গুঞ্জন। দেশে বড় বড় মেগা কিছু প্রজেক্ট এসেছে তাই ধরে নেয়া হয়েছিল, আগের চেয়ে সামান্য বড় হতে পারে মন্ত্রী পরিষদ। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। সবকিছুই নির্ভর করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ওপর। তার মেধা, বিচার-বিবেচনা সবসময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। গত সপ্তাহে দেশবাসী দেখল সে চমক। একঝাঁক নতুন মন্ত্রী নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের মন্ত্রিসভা। যাদের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অর্থমন্ত্রী একজন পেশাদার অ্যাকাউন্টেন্ট (এফসিএ), আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক, একজন আর্কিটেক্ট আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, একজন শিক্ষিকার সন্তান, চিকিত্সা শাস্ত্রের মেধাবী শিক্ষার্থী এবারের শিক্ষামন্ত্রী, একজন কৃষিবিদ এখন কৃষিমন্ত্রী, পেশাদার কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক আমলা পরিকল্পনামন্ত্রী, নারায়ণগঞ্জের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, দলের প্রচার সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী, কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ধান-চাল ব্যবসায়ী আজ খাদ্যমন্ত্রী, আইটি বিশেষজ্ঞ ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী, একজন অসমতল অঞ্চলের (পাহাড়ি) মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী, একজন কোরানের হাফেজ আজ ধর্মপ্রতিমন্ত্রী, শ্রমিকনেত্রী শ্রম কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী, ডাক্তার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, রানা প্লাজায় হাসপাতালের দুয়ার খুলে দেয়া ডা. এনাম দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী একজন গবেষক। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো অতীতেও করে এসেছেন। এদের বেশিরভাগই ইয়াং, ডেডিকেটেড, এনার্জিটিক এবং পরিশ্রমী। প্রায় সবারই ব্যাকগ্রাউন্ড প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে চুলচেড়া বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আমি দারুণভাবে আশাবাদী নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে। বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে নতুন মন্ত্রিসভা তার মেধা, শ্রম আর সততার স্বাক্ষর রাখবেন এ প্রত্যাশা সবার। যেহেতু আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ও বিশাল দল। তাই, সবার সমান মূল্যায়ন করাটা দুরূহ। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি ও মেধার পরিচয় দিতে এ সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী মনে হয়েছে আমার কাছে। প্রবীণরা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে শক্ত স্তম্ভ গড়েছেন গত দশ বছরে এবার নবীনরা উপসংহার টানবেন। ধাপে ধাপে তৈরি হচ্ছে নেতৃত্ব, সৃষ্টি হবে অভিজ্ঞতা। আর সর্বোপরী প্রধানমন্ত্রী তো বটবৃক্ষের মতো সবাইকে আগলে রেখেছেন। আমি বিজ্ঞানের শিক্ষক। তাই শিক্ষা এবং প্রযুক্তি-বিজ্ঞানের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হয় তা নিয়ে প্রচণ্ডভাবে উন্মুখ হয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি আশ্বস্ত হলাম। এখন আত্মবিশ্বাসী। বুকের ছাতিটা বড় হয়ে গেল। ইয়াফেস ওসমান ও ডা. দীপু মনি দু’জনই দারুণ প্রফেশনাল। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং মানসম্পন্ন আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়তে তারা অগ্রদূত হয়ে থাকবেন। আর তরুণ নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আছেন সঙ্গে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার মেধা, বিচার-বিবেচনা সব সময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। ধরেই নিয়েছিলাম, অতীতের মতো এবারো ডায়নামিক, দক্ষ, যোগ্য, জনপ্রিয়, ত্যাগীরাই এগিয়ে থাকবেন। শেখ হাসিনার কাছে জনগণের যে চাওয়া, প্রত্যাশা, তার বাস্তব প্রভাব পড়বে এই মন্ত্রীর পরিষদের মাধ্যমে। তাই, জনগণ অধীর আগ্রহ নিয়ে চেয়েছিলেন নৌকার মাঝির দিকে। তাদের বিশ্বাস, ওয়াদা পূরণে শেখ হাসিনার বিকল্প এ দেশে কেউ নেই। নতুন পুরাতন সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার ডেল্টা প্লান ২১০০ বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু করবেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার প্রধান লক্ষ্য, সরকারকে দল থেকে আলাদা করে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত, সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ গড়ার। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার এক সপ্তাহ পর ১২ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল ৪৮ সদস্যর নতুন মন্ত্রিসভা।

গত দুই এক মাস ধরে টেলিভিশন, পত্রিকায় দেখেছি ড. কামাল হোসেনের সরব উপস্থিতি। বিএনপির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করছেন তিনি। মাঝে মাঝে মান্না, রব সাহেব, সুলতান মনসুরসহ অনেকেই বজ বাক্য ছুড়ছেন। তাদের কথায় আমার মতো ষাটোর্ধ্ব নাগরিক ভড়কে যান। তারেক জিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন, বেপরোয়া জীবনযাপনে ক্ষুব্ধ সবাই। এছাড়াও দলের ভেতরে ভাঙন, সিনিয়রদের অবমূল্যায়ন, সীমাহীন দুর্নীতি, নমিনেশন বিক্রি, ঘুষ, অস্ত্রের চোরাচালানসহ নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক নেতিবাচক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারেক। বিএনপির ঝাণ্ডা নিয়ে মাঠ চষে বেড়ানো সত্, ভদ্র নেতা ফখরুল ইসলামের মতো অনেকেই তখন জায়গা পায়নি তারেক জিয়ার অঘোষিত কেবিনেটে। আজ দলটির একজন জেলে অন্যজন পলাতক। নির্বাচনে আসার আগে বিএনপির অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত ছিল। আগে বুঝতে হবে, এদেশের মানুষ অপশাসন, অন্যায় কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। শেষ পর্যন্ত ৩০ ডিসেম্বর জনগণ তাদের বয়কট করে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।

এত চড়াই-উতরাইয়ের পরও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছে সরকার। এদেশের জনগণও তাই পুনর্নির্বাচিত করেছে শেখ হাসিনাকে। কারণ, জনগণ মনে করে একমাত্র শেখ হাসিনাই পারে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে। একটি সমৃদ্ধশালী, প্রযুক্তিক, আত্মমর্যাদাশীল জাতি গড়তে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে খালেদা বা তারেক জিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনা বা সজীব ওয়াজেদ জয়ের এখানেই গুণগত, মৌলিক পার্থক্য।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যে সব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা দেশের জনগণকে আরো বেশি আস্থাশীল করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। গ্রামগুলোতে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেয়া, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে তা সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আগামীর স্বপ্নে ভাসিয়েছে জনতাকে। আমাদের বন্ধু, সুহূদ শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকের সঙ্গে কথা হলো, সবার চাওয়া একটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে আগে। সুশাসনের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে। সন্ত্রাস, মাদকদ্রব্য নির্মূল ও রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধাবাদীরা যেন জনগণের ভরসায় চির ধরাতে না পারে। দলের ত্যাগী, প্রকৃত কর্মীরা যেন নিরাশ না হয় সে দিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিপুল ভোটের মাধ্যমে জনগণের যে আমানত শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিল তার সঠিক প্রয়োগ যেন হয়। সরকার পরিচালনায় সে দিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে একটি বিশেষ টিম গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন।

গত সেপ্টেম্বরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে জরুরি সেবা প্রদানের চিন্তাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক, সময়োপযোগী। ত্বরিত ফলাফল ও দোড়গোড়ায় সেবা পেতে এ ধরনের আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে। তাদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তা সমাধান বা পরিত্রাণের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্বশীল ভূমিকাই সবার কাম্য। স্বচ্ছতা, সুনিশ্চিত জবাবদিহির মাধ্যমে, উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। আপনার নির্বাচিত মন্ত্রী জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে। কারণ, অতীতে আপনার সিলেকশন বিস্মিত করেছে সবাইকে।

বাঙালি স্বপ্নবান জাতি, তাদের স্বপ্নের কাণ্ডারি এখন শেখ হাসিনা। তাই সব আবদার, প্রত্যাশা শেখ হাসিনাকে ঘিরেই। এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আপনাকে নিয়ে যাবে মহাকালের চঁড়ায়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রূপ আপনি দেবেন এটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এসএস