নতুন বছরে নতুন সরকার পুঁজিবাজারে সুবাতাস

নতুন বছরে নতুন সরকার পুঁজিবাজারে সুবাতাস

পুঁজিবাজারের জন্য বিগত ২০১৮ সাল ছিল মন্দার। আগের বছর অর্থাত্ ২০১৭ সালে বাজারে চাঙ্গাভাব বজায় থাকলেও বাজার পড়তে পড়তেই শেষ হয়েছে ২০১৮ সাল। সূচক ও লেনদেন- সবদিক থেকেই ভালো অবস্থানে ছিল না বছরটা। তবে বছরের শেষ মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আগের সরকার বহাল থাকায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাজার। নির্বাচনের পরপরই নড়েচড়ে উঠেছেন বিনিয়োগকারীরা। প্রতিদিনই বাড়ছে সূচকের দাম ও লেনদেনের পরিমাণ।

এ অবস্থা ভবিষ্যতে বহাল রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাজারে নতুন নতুন পণ্য চালু করা এবং ভালোমানের কোম্পানি বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাজারে উত্থানের সময়ে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সচেতনা ও রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি বাড়ানো দরকার বলে মনে করছেন তারা।

ডিএসইর বাজার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগের বছরের তুলনায় বিদায়ী বছরে লেনদেন কমেছে ৮৩ হাজার কোটি টাকা। আর ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ৮৫৯ পয়েন্ট। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী বছর তথা ২০১৮ সালে মোট লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। যা গত বছরের চেয়ে ৮৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা বা ৩৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। বিদায়ী বছরে ২৪২ কার্যদিবসে গড়ে লেনদেন হয় ৫৫২ কোটি ৩ লাখ টাকা। অপরদিকে ২০১৭ সালে ২৪৮ কার্যদিবসে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ১৬ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা এবং গড়ে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ৮৫৮ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট বা ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৫৩৮৫ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে দাঁড়ায়। পাশাপাশি অপর সূচক ডিএসই৩০ সূচক ৪০২ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট বা ১৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৮৮০ দশমিক ৭৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। আর ডিএসইএক্স শরিয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) একই বছর ১৫৭ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট বা ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১২৩২ দশমিক ৮২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী বছর হওয়ায় এই মন্দাভাব বছরের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত ছিল। নির্বাচনে কোন সরকার আসে, তাদের নীতি কেমন হবে— এসব নিয়েই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের সেই দ্বিধা কেটে যায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে। ফলে নতুন বছরের শুরু থেকেই সক্রিয় হতে দেখা যায় বিনিয়োগকারীদের। বছরের প্রথম সপ্তাহের তিন কার্যদিবসেই তার লক্ষণ দেখা যায়।

ডিএসই ও সিএসই সূত্রে জানা গেছে, সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে দেশের উভয় পুঁজিবাজারে লেনদেন হয়েছে। বিদায়ী সপ্তাহে (১-৩ জানুয়ারি) মোট তিন কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। এ সময় সূচক, লেনদেন ও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। ফলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা নতুন বছরের শুরুতে ফিরে পেয়েছেন ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি পুঁজি। এর মধ্যে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিনিয়োগকারীরা পুঁজি ফিরে পেয়েছেন সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বিনিয়োগকারীরা ফিরে পেলেন সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

ডিএসইর তথ্য মতে, ২০১৯ সালের প্রথম সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৩১২টির, কমেছে ২৯টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ৬ কোম্পানির শেয়ারের দাম। এর আগের সপ্তাহে লেনদেন হওয়া কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছিল ২১০টির, কমেছিল ১১২টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৪ কোম্পানির শেয়ারের দাম।

ফলে তিন সূচক পথচলা ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের চেয়ে ২০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৯০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএস-৩০ সূচক ১ হাজার ৯৪১ পয়েন্ট এবং ডিএসইএস ৩৮ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ২৭১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

বেশিরভাগ শেয়ারের দাম ও সূচক বৃদ্ধির ফলে আগের সপ্তাহের চেয়ে ৫১৩ কোটি টাকা বেড়ে বিদায়ী সপ্তাহে মোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ১৫১ কোটি ৫৪ লাখ ৪ হাজার ৬৭ টাকা। এর আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬৩৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৪১৮ টাকা। যা শতাংশের হিসেবে ৩১ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি।

বাজার সম্পর্কে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান বলেন, নির্বাচনী বছর উপলক্ষে ২০১৮ সালে বাজার কিছুটা গতি মন্থর দেখা গেছে। কিন্ত তার পরও আশানুরূপ যে গতি অর্জন করার কথা ছিল তা অর্জন করতে না পারলেও দেশের পুঁজিবাজার এমন একটি মাত্রায় অবস্থান করতে পেরেছে যার ফলে বাজারে তেমন কোনো সংকট দেখা দেয়নি। এর পুরো কৃতিত্ব পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, অর্থমন্ত্রণালয় এবং পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ব্রোকার এবং বিনিয়োগকারীদের।

মাজেদুর রহমান আরো বলেন, এ বছরে নতুন কিছু প্রোডাক্ট চালু করার কথা ছিল যেমন এসএমই এবং অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড। এ বিষয়ে ডিএসই প্রযুক্তিগত সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নতুন বছরের প্রারম্ভেই ডিএসই নতুন এ বিষয়গুলো চালু করার উদ্যোগ নেবে। একটি উন্নত ও কার্যকর বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠা বিষয়েও ডিএসই কাজ করছে। নতুন বছরের বাজেটে প্রণোদনা পাওয়া সাপেক্ষে বন্ডমার্কেটও শিগগিরই চালু করা সম্ভব। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের বিশেষ করে একটি ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ বাজারে আনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নতুন বছর আমরা এটি চালু করতে পারব বলে দৃঢ় বিশ্বাস। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আমরা করতে পারব কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ। আশা করি নতুন বছর এই অর্জনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে এক নতুন মাত্রা যোগ হবে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, সবাই যদি বাজার পরিস্থিতি ভালো বলে তাহলে তো ভালোই। নতুন বছরে নতুন সরকারের অধীনে বাজারের সবাই আস্থা রাখতে পারলে তো কোনো সমস্যা দেখছি না। তবে আমরা বরাবরের মতোই বলে যাবো, নতুন নতুন পণ্য আনতে হবে। ভালো কোম্পানি বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এটি না করা গেলে এই ইতিবাচক ধারা স্থিতিশীল হবে না। নতুন বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ ডিএসই ও সিএসই এ ব্যাপারে কী ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটাই এখন দেখতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস