নজরুলের বিমত, অমত ও স্বমত

নজরুলের বিমত, অমত ও স্বমত

বিচার বিবেচনা দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কোনো বিষয়ে কারোর মতামত প্রকাশিত হয়ে থাকে। বিবেচনার মাত্রা আবার অনুভবের তীক্ষ্ণতা, উপলদ্ধির সূক্ষ্মতা, অভিজ্ঞতার তীব্রতা দ্বারা শাণিত, শমিত ও শীলিত হয়। কোনো বিষয়ে কারোর নিজস্ব মত গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো আদর্শ, ব্যক্তিত্ব, আকর্ষণ, আগ্রহ ও মনোযোগের দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও সমানভাবে উজ্জ্বল। যখন বিবেচ্য ব্যক্তিটি হয় পরম সূক্ষ্ম চেতনার অনুবর্তী সুতীক্ষ্ণ মননে অগ্রবর্তী কেউ তখন তার মতোও হয় গুরুত্বে-শ্রেষ্ঠত্বে স্থিতিবর্তী। বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক মহান রূপকার এবং একই সঙ্গে বিশ্বনাগরিকতার এক অনন্য উপচার বাংলাদেশের জাতীয় কবি বাঙালির চিরমনপ্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরম সূক্ষ্ম চেতনাবর্তী একজন সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু গণপতি ছিলেন না একইসঙ্গে ছিলেন মনপতিও। ছক-বাঁধা কোনো আটপৌরে জীবনে যেমন-শিক্ষা-চাকরি-প্রতিষ্ঠা (নিতান্ত জৈবিক জীবনযাপনের জন্য) -মৃত্যুতে তিনি ফুরিয়ে যাননি। জীবনকে অনন্তমাত্রিক পর্যবেক্ষণ-পরীক্ষণ মূল্যায়ন উদযাপনের মাধ্যমে রয়ে গেছেন অফুরান। মানবিক স্বভাব ‘বিদ্রোহ’ সম্পর্কে অবিস্মরণীয় কবিতা ‘বিদ্রোহীর’ মাধ্যমে উচ্চকিত ঘোষণা ব্যক্ত করে তার জীবনযাত্রা শুরু, তারপর ক্রমাগত পরিবর্তন নিজের মধ্যে এবং তার সঞ্চালনা অজস্র অনুসারীর মধ্যে, পরোক্ষে বিরুদ্ধাচারীদের মধ্যেও।

যখন কোনো প্রতিভাবান প্রভাবক ব্যক্তির যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন কিংবা বিচার-বিশ্লেষণসিদ্ধ কোনো মত গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের ঐকমত্য অথবা মতানৈক্যের ভিত্তিতে বৃহত্তর মানবসমাজ কর্তৃক গৃহীত, অনুশীলিত অথবা বর্জিত কিংবা প্রতিবাদিত হয় তখন তা মতবাদের রূপ লাভ করে। নজরুলের বিস্ময়কর প্রতিভার বিকাশের এবং বিস্তারণের বিভিন্ন স্তরে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বহুমাত্রিক বিবেচনার বৈশ্লেষণিকরূপ কখনো বিদ্রোহী, কখনো সাম্যবাদিতা, কখনো শ্রমিক, কৃষক-সরাজ এবং চূড়ান্তভাবে সর্বতোপ্লাবী মানববাদিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।

ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে বাঙালি জাতির স্বশাসনের তেমন দীর্ঘ নজির পাওয়া যায় না। এমনকি পাল রাজবংশের যারা শাসক ছিলেন তাদের বাঙালি পরিচয় নিয়ে সর্বস্বীকৃত মীমাংসা পাওয়া যায় না। ইতিহাসের পরিক্রমায় বাঙালি জাতির পূর্ণ স্বশাসনের উদাহরণ স্থাপিত হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই। বাঙালি জাতীয় জীবনের যাপন বা উদযাপন কিংবা জাতীয়তার অনুক্রমেরও এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সূচিত হয়। প্রায় সর্বদাই বিদেশি বিজাতি-বিভাষী শাসিত এই বাঙালি জাতি বাধ্য হয়ে অনুসরণীয় অনেক বিষয়ে মতৈক্যে উপনীত হয়েছে।

কিন্তু এরূপ কোনো বিষয় নিজেদের জন্য প্রতিষ্ঠা করার সক্ষমতা তাদের ছিল না। তাই তারা সংস্কারমুখী (Reformist) হয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু বাঙালি জাতিকে জাতিসত্তাগতভাবে পূর্ণ সংস্কারমুখিতার দিকে ধাবমান করার দিকে ঐকমত্য গড়ে তুলতে নজরুলের মতো কখনো প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে বিমতে, কখনো বা ভিন্নমত হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শাসকদের চাহিত-নির্দেশিত-আদেশিতমতে শতাব্দীর পর শতাব্দী জীবনযাপনের দরুন তাদের কারোর নিজ মত গড়ে ওঠা বা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়নি। এই প্রেক্ষাপটে বিংশ শতাব্দীতে বাঙালির সংস্কৃতি জগতের এক অনন্যপূর্ব মহানায়ক কাজী নজরুলের বাধ্য হয়ে মানা মতের বিপরীতে বিমত, দ্বিমত ও স্বমত বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

জীবনের প্রায় ক্ষেত্রে ঊনবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এই পরিবর্তন সাধনে যত উপাদানই অবদান রাখুক না কেন বিমত বা ভিন্নমতের প্রভাবই ছিল সবচে বেশি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জীবনের সব ক্ষেত্রে সামগ্রিক পরিবর্তনের এই আবহকে রেনেসাঁ বা নবজাগৃতিও বলেন কেউ কেউ। ভারতের বিখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার বলেন, ‘এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান যে, সমাজ জটিল এবং পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে, যদি ভারতীয় সমাজ হয় এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য তাহলে অবশ্যই বিমত বা ভিন্নমতের প্রতিবাদ এবং অননুগামিতাকে (non-conformity) প্রত্যক্ষ করতে হবে নতুবা পরিবর্তনের উদাহরণ শূন্য হয়ে যাবে। সক্রেটিস ও গ্যালিলিও এর মত ভিন্নমতীদের নিয়ে আলোচনা সন্নিবেশিত করেছে এমন গ্রন্থ Great Dissents এর প্রণেতা Norman Thomas রূপান্তর বা নবজাগৃতির জন্য পরিবর্তনশীলতায় ব্যাপকতাকে অনুমোদন করেছেন এভাবে-

‘কলা এবং বিজ্ঞানের সাথে সাথে ধর্ম রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে যে কোন প্রগতি অথবা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন পূর্বের স্বীকৃতি/সম্মতিতে কোন না কোন মাত্রার পরিবর্তন।’

মানুষের ‘বিমত বা অমত’ তার জ্ঞানজগতে পৃথক কোনো অধ্যয়নের বা গবেষণার ক্ষেত্র ছিল কিনা তা অনুসন্ধানসাপেক্ষ। সামাজিক বিজ্ঞানের বিশ্বকোষ ঘেঁটে বিমত বা অমত এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Dissent সম্পর্কীয় অনুসন্ধানে Disraeli ও Distribution এর মধ্যবর্তী এর কাছাকাছি কোনো শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গতানুগতিকভাবে বিমত বা ভিন্নমত বলতে ধর্মীয় অননুগামিতাকেই (non-conformity) বোঝানো হতো ষোড়শ সপ্তদশ শতকের ব্রিটেনে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ধর্মের ওপর বিজ্ঞান এবং গণতন্ত্রের জয়যাত্রা বিমত বা ভিন্নমতকে একটি প্রায় নিরপেক্ষ ধারণার কাছাকাছি নিয়ে আসে। অধুনাতনকালে বিমত বা ভিন্নমত ধর্মীয় যেন নয় বরং অর্থনৈতিক এবং নিরপেক্ষ। বিমত বা ভিন্নমত সাধারণভাবে স্থিতাবস্থার বিপরীত কোনো অবস্থাকে বোঝায়। সময় পরিক্রমায় রীতিনীতি এবং ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হওয়া প্রতিষ্ঠিত কোনো কর্তৃপক্ষীয় অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবাদ করার প্রয়াসও বিমত বা ভিন্নমতের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে।

বিদ্যমান অবস্থার প্রতি অসমর্থন কিংবা কোন স্থিতিবান মতামতের সাথে পার্থক্যকেই বিমত, অমত বা ভিন্নমত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অমত বা ভিন্নমতের সামগ্রিক অর্থে বিমত প্রাথমিকভাবে মনের অভ্যন্তরে সংগঠিত একটি বুদ্ধিভিত্তিক ক্রিয়াকে বোঝায়। বিমত কার্যকরভাবে বুদ্ধিভিত্তিক এবং জটিল যা সাধারণভাবে অধিকার, মুক্তিও স্বাধীনতা সংরক্ষণে নিয়োজিত থাকে। মুক্তি ও অধিকারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিমত একপ্রকার নৈতিক সমর্থন লাভ করে এবং প্রায়শঃ প্রতিবাদের মাধামে প্রকাশিত হওয়ার পথ খোঁজে। কোনো বিদ্যমান মত যা কর্মের বিদ্যমান শৃঙ্খলায় কোনো বিচ্যুতি বিমতবাদী উদ্ঘাটন করে তার প্রতিকার অনুসন্ধান করেন। বিমত আবার প্রতিষ্ঠিত আদর্শে কিংবা বিশ্বাস পদ্ধতিকে পশ্নবিদ্ধ করার মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকতে পারে অথবা নতুন কোনো আদর্শের মূল হতে পারে। সুতরাং বিমতের প্রকাশ আপেক্ষিকভাবে সীমাবদ্ধতা আকীর্ণ যে অবধি না তা কর্মে রূপ নেয়। প্রতিবাদ তাই বিমতের চেয়ে গুরুতর। এর জন্য দরকার আদর্শ, সংহতি এবং স্বচ্ছভাবে নিরূপিত কর্মধারা।

বিমত হচ্ছে একটি মনস্ক্রিয় এবং উদ্ভবের দিক দিয়ে প্রথমত তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এটি মূলত কোনো ব্যক্তির বিবেকজাত বিপুলসংখ্যক জনমানুষের অবধারণাজাত নয় কোনোক্রমেই। উদাহরণ হিসেবে পেশ করা যায়, বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬) এর বিখ্যাত নাটকে ঞযব ঊহবসু ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব বিমত এবং প্রতিবাদ তথা আপত্তি সম্পর্কীয় বিশ্লেষণ। নাটকটির মূল চরিত্র স্টকম্যানের সরল এবং অকপট বিশ্বাস হলো মানুষের স্বাভাবিক ধার্মিকতা সাধুত্বে। কিন্তু এই মত বা ধারণা থেকে ক্রমশ মোহমুক্তি ঘটে মানুষের অজ্ঞতা এবং নীচতা-নিকৃষ্টতার প্রতি সংঘবদ্ধ পক্ষপাতের প্রত্যক্ষণে। এ অবস্থা থেকে তিনি বিদ্রোহ করার সংকল্পবদ্ধ হন এই ধারণায় যে পৃথিবীর সবলতম মানুষ হচ্ছেন তিনি যিনি সবাইকে ছাড়িয়ে একাকী দাঁড়াতে পারেন। (বিদ্রোহী কবিতার বিখ্যাত উচ্চারণ, ‘বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়েছি একা আমি চির উন্নত শির’ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ)।

বিমত এবং প্রতিবাদ বা আপত্তি কোনো কোনো সময় একই অর্থে ব্যবহƒত হয়। দুটি ধারণা অতি নিকট অন্বয়যুক্ত। কোনো কোনো সময় এগুলো কার্যকারণ সম্পর্ক দ্বারাও অন্বিত থাকে। উৎসগতভাবে বিমত হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক যা কারণ এবং আপত্তি বা প্রতিবাদ হচ্ছে তার কার্য যা ফল। প্রচলিত মত বা ধারণায় যখন কোনো বিচ্যুতি পরিদৃষ্ট হয় তখন যিনি তা দেখেন বা উদ্ঘাটন করেন তিনি হন বিমতবাদী এবং যখন তিনি তার প্রতিকার অন্বেষী হন তখন তিনি হন প্রতিবাদী বা আপত্তিকারী।

স্থিতিবান কোনো মতের সঙ্গে পার্থক্য প্রকাশ করে বিমতবাদী তার পাশে সমবেত হওয়ার নিমিত্ত কারো জন্য অপেক্ষা না করেই এককভাবে কোনো প্রতিবাদ বা আপত্তি প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু যখন তা ব্যক্তিগত প্রতিবাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃততর পরিমণ্ডলে ব্যাপ্ত হয় এবং রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে তখন আদর্শ এর প্রয়োজন হয়। এই অনুক্রমে বিমত কোনো আন্দোলন বা বিপ্লবের উদ্গাতা হয়ে যেতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে ব্যক্তিক বিমত বা ভিন্নমত মতদ্বৈধতার মূল বৈশিষ্ট্য হারিয়ে কোনো গোঁড়া মতবাদ কিংবা গোঁড়ামির রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। বিমতবাদীকে প্রায়শ বিদ্রোহীর সমার্থক হিসেবে গণ্য করা হয়; সক্রেটিসকে যেইরূপ ‘প্রতিনিধিত্বশীলবিদ্রোহী চিন্তাবিদ’ হিসেবে গবেষক হার্বার্ট চিত্রিত করেছেন। সক্রেটিসের ওপর অন্য এক গবেষক নর্মান থমাস মন্তব্য করেছেন, গির্জা এবং রাষ্ট্রের প্রতি উচ্চতর (তথা উন্নততর) আনুগত্য প্রায়শ তাকে এ সম্পর্কীয় প্রচলিত মত বা প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলার বিরোধী হিসেবে পরিচিত করেছে। আদি ভাবতে বা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বিমত এর জ্ঞাত্যর্থ যাই থাক আধুনিককালে বাংলাভাষী অঞ্চলে বাংলাদেশ এবং বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য অংশে বিমতবাদীদের বিদ্রোহী হিসেবেই গণ্য এবং গ্রহণ কিংবা বর্জন করা হয়েছে। বাংলার পুনর্জাগরণের দুই অদম্য অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩) এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ( ১৮২০-১৮৯১) আধুনিক লেখক-ঐতিহাসিকগণ বিদ্রোহী বলে অভিহিত করেন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) নিজেকে ‘সাহিত্যিক বিদ্রোহী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং উত্তরসূরিদের দ্বারা তিনি সেই হিসেবে স্বীকৃতও হয়েছেন। অতি অবশ্যই কাজী নজরুল ইসলাম বিমতবাদের ধারক, বাহক, প্রচারক ও প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রামী বলে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে জনমন নন্দিত, বন্দিত, গৃহীত ও প্রতিষ্ঠিত।

আলবার্ট কাম্যুর (১৯১৩-৬০) বর্ণনামতে বিদ্রোহী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি কোনো নিপীড়ক কর্তৃত্বকে মান্য করতে অস্বীকৃত এবং আপন অধিকার রক্ষায় নিপীড়ককে মোকাবিলায় ব্রতী। বিশুদ্ধ ব্যক্তিবাদিতার সংকীর্ণ সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে মুক্তি এবং ন্যায়বিচারের মতো কতগুলো সার্বজনীন মূল্যবোধের পক্ষে তিনি তথা বিদ্রোহী এমনটি করে থাকেন। সামগ্রিকভাবে মানবজাতির অস্তিত্বশীলতার জন্য প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিবর্গের বিদ্রোহ অনিবার্য। কাম্যুর এ সম্পর্কীয় দর্শন হলো ‘আমি বিদ্রোহ করি, তাই আমরা অস্তিত্বশীল থাকি।’ বিদ্রোহ মূলতঃ কতগুলো চিরন্তন এবং সর্বজনীন মূল্যবোধের অন্তর্গত সংহতির কারণেই অস্তিত্ববান।

পাশ্চাত্যসমাজ থেকে বিদ্রোহীর উদাহরণ চয়ন করলে গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউসের দেখা মেলে। বাঙলায় পুনর্জাগরণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘নিঃসঙ্গ প্রমিথিউস’ হিসেবে আধুনিক ঐতিহাসিকগণ সেইদিক থেকে তুলনা করে থাকেন। কবি নজরুল ইসলামও হালে ‘প্রমিথিউস’-এর সঙ্গে তুলনীয় হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা কর্তৃক তাকে নিবেদিত সম্মামনাপত্রের ভাষায়।

সর্ববিবেচনায় নজরুলের খ্যাততম কবিতা ‘বিদ্রোহী’। এটি কোনো ব্যক্তি মানুষের মানবিক সমগ্রতার বা সম্পূর্ণতার আকাক্সক্ষার বিশ্বমানবিক চূড়ান্ত ইশতেহার। নিজের ভূমিকা ব্যাখ্যায় অথবা অন্য সবাইকে যার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার আহ্বান জানিয়েছেন এই কবিতায় তিনি হচ্ছেন ‘বিদ্রোহী ভৃগু’ যিনি একজন পৌরাণিক কবি। ভৃগু ভগবান বিষ্ণুর বুকে পদাঘাত করেছিলেন বিশ্বজগতের সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দরুন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী ’ও দায়িত্বশীলদের দায়িত্বপালনের ব্যর্থতার তেমনি দৃপ্ত প্রতিবাদ। নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বিদ্রোহ ও শিল্প এর মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কের বিষয়ে কাম্যুর ধারণায় প্রায় সমরূপ ব্যাখ্যা পরিবেশন করেছেন। কাম্যু ধারণা করেন, যখন কোন চরম ক্ষুদ্ধ প্রতিবাদ প্রকাশের কোনো অবিচল মাধ্যম খুঁজে তখন বিদ্রোহই হতে পারে তার আকাক্সক্ষার প্রকৃত উম্মোচক, আত্মসততার প্রকাশক এক সৃজনশীল শক্তি। শিল্পকলার প্রকাশ ও ভঙ্গিমার মহত্তম রূপটি হচ্ছে সর্বোত্তমভাবে উদ্দীপিত বিদ্রোহী। স ষ্টার পছন্দক্রমে তার সৃষ্টির চয়ন, গ্রহণ ও লালন হচ্ছে এই শিল্পের রূপায়ণ। মৃত্যু এবং বিস্মৃতির শক্তির বিরুদ্ধে এই বিশ্ব এবং এর অধিবাসীগণের সৌন্দর্যের সঙ্গে বিদ্রোহী সমন্বিত। কাম্যুর এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ বাঙলা সাহিত্যে বিমতবাদী নজরুল বা সামগ্রিক নজরুল প্রপঞ্চ অনুধাবনের জন্য অমূল্য চাবিকাঠি।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুল ইসলামের জন্মের অব্যবহিত পূর্বকালে বাংলার পুনর্জাগরণের এক বুদ্ধিবৃত্তিক উৎক্ষেপ দ্বারা সমৃদ্ধ। প্রায় পুরো সময়কাল পর্যায়ক্রমিক বিমতবাদিতা দ্বারা চর্চিত যা চিন্তাচর্চায় এক নজিরবিহীন গতিশীলতা নিয়ে আসে। ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে বাংলার সঙ্গে সরাসরি ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সংযোগের প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিল এই প্রপঞ্চ (Phenomenon) অর্জন। নতুন সচেতনতা থেকে সৃষ্ট আবেগ দ্বারা ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চিন্তার মতদ্বৈধতা স্পষ্টতা পায়। এই কালের প্রথমাংশে (১৮০০-১৮৬৫) যুক্তিবাদিতায় আরোহণ বাংলার নবজাগরণের ক্ষেত্রে কতিপয় স্রষ্টার যেমন এ রাজা রামমোহন রায় থেকে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের পথ প্রশস্ব করে। এই কালের শেষাংশে দেখা যায় মাইকেল মধুসূদন দত্তকে। তিনি নবজাগরণ এবং যুক্তির যুগের সুজনশীলতার সম্ভাবনার সারবসÍু সংগ্রহ ও সংযোজন করেছেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তৃতীয়াংশ মোটামুটিভাবে ১৮৬৫ সাল থেকে সূচিত ধরে নিলে জাতীয়তাবাদী চেতনার লক্ষণীয় এবং তার বহুমুখী প্রকাশ পরিদৃশ্যমান হয়। স্বাভাবিকভাবে এই সময়ের বিমতবাদীদের প্রায় সবাই জাতীয়তাবাদের অভিনব/ নবীন আবেগ বিনিময় করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এর সঙ্গে যদিও নতুনভাবে ব্যাখ্যায়িত হিন্দুত্ববাদ এবং নব্য হিন্দুত্ববাদী নজরুল চেতনা সমন্বিত হয়ে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিমতবাদী হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিপরীতমুখিতা পরিদৃষ্ট হলো। হিন্দুত্ববাদিতাকে সংশোধিত করেছিল যুক্তিবাদিতা এবং সেক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শিক্ষা-সংস্কৃতি ছিল যুক্তিবাদিতার পরিপোষক আর যখন তা জাতীয়তাবাদিতা বিবেচনায় এলো তখন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংশোধিত নব্য হিন্দুত্ববাদিতা হলো তার সহায়ক। ঊনবিংশ শতকের শেষ তিন দশকে বাংলার ইতিহাস প্রত্যক্ষ করল চিন্তা এবং সংস্কৃতি জগতে প্রবল ব্রিটিশবিরোধী মতদ্বৈধতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস হিসেবে জাতীয়তাবাদের বিকাশ। ফলে, বিংশ শতাব্দীর সূচনা হলো নজিরবিহীন রাজনৈতিক উৎকণ্ঠাপূর্ণ এবং বাংলা দীর্ণ-বিদীর্ণ হলো স্বদেশি আন্দোলন, ব্রিটিশ শাসক কর্তৃক বাংলা বিভক্তি এবং বাঙালিদের কর্তৃক তার পুনরেকত্রীকরণের তোলপাড় সংগ্রাম দ্বারা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা অধিকতর বিস্তৃতভারতীয় জাতীয়তাবাদ একটা ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ (যা আবার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে ঐ সময়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিল) দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এই সমস্ত ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ/ উনèয়ন/ অভিব্যক্তির মধ্যে নজরুল ইসলাম এক কল্পনা শক্তিসম্পন্ন শিশু হিসেবে বিচিত্রবিধ অভিজ্ঞতাপুষ্ট হয়ে গড়ে উঠছিলেন।

বস্তুত জাতীয়তবাদী প্রণোদনার পক্ষে যতটা সম্ভব বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামই সবচাইতে বড় ব্যক্তিবিমতবাদী, যিনি বাংলার দৃশ্যপটে আগমনী বাজান ১৯২০ এর দশকে। তার আমূল সংস্কারকামী ভাবধারা এবং দ্বন্দ্বার্থপূর্ণ উচ্চারণ ভারতীয় সাহিত্য জগৎকে বিহ্বল করে দেয়। বাংলা সাহিত্যের শান্ত সমাহিত জলাশয় গভীর তলদেশ পর্যন্ত তার অগ্নিঝরা লেখনী দ্বারা উন্থান লাভ করে। কবি শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুস্পষ্ট উপস্থিতি সত্ত্বেও ১৯২০-এর দশকের কাব্যজগতে আধিপত্য করেছেন নজরুল। বিদ্রোহী হিসেবে তিনি বিমত পোষণ করেছেন যথেষ্ট সংখ্যক রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাহিত্যিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। সমগ্র ঐতিহ্যের একটি জটিল ক্ষুদ্র জগৎ তথা মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে সব প্রকার গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সামগ্রিক বিদ্রোহের মাধ্যমে নজরুল সর্বোচ্চ জাতীয়তাবাদী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ওই সময় তরুণ সমাজের এবং অনাগত প্রজন্মের ওপর যে তীব্র প্রভাব তিনি অনুশীলন করেছেন কদাচিৎ তাকে অতিরঞ্জিত বলা যাবে। এটা বলা যথেষ্ট যে নজরুল ইসলাম ইসলামী পাকিস্তানে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হয়ে রইলেন আর ১৯২০-এর দশকে তার রচিত কবিতা ও গান ১৯৬২ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয়দের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকল। আবার ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের জন্য তিনি উদ্দীপনা প্রেরণার কেন্দ্র দখল করে থাকলেন ।
বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই বিমতবাদী নজরুল ইসলাম তার অন্যান্য অনেক পরিচয়ের ক্ষেত্রে যেমন অবহেলা, অনুল্লেখ, তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছেন এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি সহভাষী-বিভাষী সবাই প্রায় এক সারিতে দাঁড়িয়েছেন। কেনেথ ম্যাকফারসনের The Muslim Microcosm Calcutta, 1918 to 1935 নামীয় গ্রন্থে কলকাতা নগরীতে ওই সময়ে সর্বমহলে পরিচিত নজরুলের নামোল্লেখ নেই। নেই N. Gerald Barrierএর ‘Banned: Controversial Literature and Political Control in British India, 1907 – 1947’ গ্রন্থেও । যে নজরুলের পাঁচ পাঁচটি গ্রন্থ ১৯২০ সাল থেকে ১৯৪০ দশকের শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধও বাজেয়াপ্ত থেকে তাকে আর্থিক মানসিক নানা বিড়ম্বনা নিপীড়নের মুখোমুখি করলো তার কোন আভাস ইঙ্গিতও মিলল না। তেমনি Communism in India গ্রন্থে নজরুলের কম্যুনিস্ট ভাবনা নিয়ে নয় শুধু বিপ্লবী কবি হিসেবে নামটি উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। Bengal: The Nationalist Movement নামীয় গ্রন্থে নজরুলকে আনুষ্ঠানিক বা গুরুত্বহীনভাবে তিনবার উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। নজরুলকে অনুল্লেখ ভুলক্রমে নয় বরং এটি ঔপনিবেশিক শাসন পদ্ধতির পরোক্ষ প্রভাবাশ্রিত প্রবল প্রবণতা একান্তই ইচ্ছাপ্রণোদিত ও উদ্দেশ্যমূলক। যদি এড়িয়ে যাওয়া যায়, যদি মৌন থাকা যায়, তাহলে কারোর অবদানকে গৌণ করা যায়। নজরুল বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের সর্বপ্লাবী আইকন (Icon) যিনি আজীবন ছিলেন স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামী, সর্বমানবিক ক্রমোন্নতি অর্জনের অভিলাষী, ঔপনিবেশিকতার অনুষঙ্গ শাসনের দ্বারা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বহুমুখী বিমতবাদীকে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব দিয়ে মহত্বের সৌরভ দিলে তার মহিমার স্বীকৃতি প্রদান করা হয় আর ঔপনিবেশিক শাসনের অগৌরব হয়। সুতরাং তার উল্লেখ থাকবে কেন?

বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যিক বিমতবাদিতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে নজরুলকে নিয়ে সম্ভবত প্রথম পদ্ধতিগত অনুসন্ধান বা গবেষণা করেছেন ড. প্রীতিকুমার মিত্র। এই অনুসন্ধান বা গবেষণা গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে ঞযব উরংংবহঃ ড়ভ ঘধুৎঁষ ওংষধস নামে। এটি অংশত অনুসন্ধানকারী সম্পাদিত ডক্টরেট পর্যায়ের গবেষণার ওপর ভিত্তিকৃত। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হনলুলুস্থ হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৭-৮১ সালে জনাব মিত্র পরিচালনা করেছিলেন তখন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ এ অধ্যাপনা করছিলেন। নজরুলের বিমত বিষয়ক একক ও অনন্য গ্রন্থটি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণা গ্রন্থটি মূলত বিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যের ইতিহাসের বিমতবাদিতার এক অতুলনীয় উদাহরণ হিসেবে নকশায়িত অথচ যে বিমতবাদীকে কৌতূহলজনকভাবে বিপুলসংখ্যক ঐতিহাসিক এড়িয়ে গেছেন।

নজরুল ইসলাম তার বসবাসের সমাজস্থিত বহুমুখী গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। এই বিদ্রোহ ছিল প্রধানত পঞ্চমুখী ১। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনপদ্ধতি ২। ১৯২০-এর দশকে ভারতীয় জাতীয় সংগ্রামের মূলধারা রচনা করেছিল গান্ধীজীর যে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন ৩। ইসলামী মৌলবাদ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্ববাদিতা ৪। হিন্দু সমাজের পূর্বসংস্কার এবং সাংস্কৃতিক অন্ধ আনুগত্য এবং ৫। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেন্দ্রিক বাংলার সাহিত্যিক আধিপত্যবাদী গোঁড়ামির বিরুদ্ধে।

সমগ্র জীবনে নজরুল বিমত পোষণ করেছেন কখনো তার স্বমত দ্বারা বিনয় বিনম্রতার সঙ্গে, কখনো প্রচলিত ধারার সঙ্গে বিরোধে অবতীর্ণ কোনো ধর্মভিত্তিক সত্তা পোষিত কোনো মতামতের সঙ্গে সহমতে সম্প্রীতি সৌহার্দ্যরে সঙ্গে আবার কখনো বিস্ফারিত তীব্র ক্ষোভে সংগ্রামী ও বিপ্লবী চেতনাপুষ্ট হয়ে বিদ্রোহের সঙ্গে। বিমতের প্রকাশ ভঙ্গিমা যাই হোক তার ‘অন্বিষ্ট’ ছিল জাতিধর্ম দেশ কাল পাত্রের ঊর্ধ্বে মানুষের সর্বোচ্চ মর্যাদা। মানবতাবাদী মানব দরদি এই মহামানব মানববাদিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই বিমত পোষণ করেছেন নানাবিধ অভেদ অসাম্যের বিরুদ্ধে। তার বিমত এবং অমত সর্বমানবিকতার অন্বেষায় স্বমত রূপে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির ইতিহাসে দার্শনিক স্থিতিলাভ করেছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস