ধর্মভিত্তিক দলগুলো নেই রাজপথে

ধর্মভিত্তিক দলগুলো নেই রাজপথেএকাদশ নির্বাচনের পর রাজপথে সক্রিয় নেই ধর্মভিত্তিক দলগুলো। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়াদ এক মাস ১০ দিন অতিবাহিত হলেও গঠনমূলক কোনো ইস্যু দাঁড় করাতে পারছে না শীর্ষ নেতারা। ফলে থমকে আছে রাজপথ। রাজনীতির বাজারে মন্দা অবস্থা কাটছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর। একই অবস্থা ছিল ৩০ ডিসেম্বর একাদশ নির্বাচনের আগেও।

গত এক মাসে দলগুলোর কোনো নেতাই প্রকাশ্যে রাজপথে আসছেন না, কথা বলছেন না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের শরিক ইসলামি দলগুলোর নেতাদের অবস্থানও একই। এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় কয়েকটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। তারা বলেন, সময় আসলে কথা বলব। একই অবস্থা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ইসলামি দলগুলোরও। এছাড়া স্বতন্ত্র ইসলামি দলগুলোর নেই কোনো কর্মসূচি। তারা একবারেই চুপচাপ।

এদিকে ঝিমিয়ে পড়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম। বিগত দিনগুলোতে ছোটখাটো ইস্যুকে পুঁজি করে মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল ও মিটিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিলেও বর্তমানে বিবৃতি ও বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই বেশির ভাগ দল এবং সংগঠনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। অনেক ইসলামি দলের সাংগঠনিক কোনো ভিত নেই। নানা কারণে কোণঠাসা এসব দল ও সংগঠনের কয়েকটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব, কোন্দল ও বিভক্তির পর্যায়ে চলে গেছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা ইসলামি দল ও সংগঠনগুলো কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। ধর্মীয় ইস্যুতেও রাজপথে জোরালো কর্মসূচি দিতে কোনো দল আগ্রহী হচ্ছে না। ধর্মীয় ইস্যু ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে সরব থাকত ইসলামি দলগুলো। কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যে আলোচিত হলেও হঠাৎ যেন খেই হারিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেছেন দলগুলোর নেতারা।

তারা বলছেন, কোনো কিছু করতে গেলেই অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি নিতে গেলেই বিপত্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুমতি দেয়া হয় না। পাশাপাশি নানা দিক থেকে হুমকি-ধমকি ও হয়রানিও শুরু হয়। চাপ-আতঙ্কের কারণেই ঘরোয়া কর্মসূচিতে বন্দি হয়ে পড়ছে তারা। এছাড়া বিভক্তি বিভাজনের ঘটনাও দলীয় কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার অন্যতম কারণ বলে সূত্র জানায়। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১১টি ইসলামি ধর্মীয় দল। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। রাজনৈতিক দলের বাইরে হেফাজতে ইসলামসহ শত শত সংগঠন রয়েছে। তাদেরও তেমন কোনো কর্মসূচি নেই।

ইসলামি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামী। বলা যায়, বর্তমানে গৃহহীন এই দলটির মগবাজারের কেন্দ্রীয়, পল্টনের ঢাকা মহানগরীসহ সারাদেশের কার্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। সভা-সমাবেশ দূরে থাক, প্রকাশ্যে চলাফেরাও করতে পারে না নেতাকর্মীরা। এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, আমরা আপাতত চুপচাপ রয়েছি। দেখি সরকার কী করে। তার পর সিদ্ধান্ত নেব রাজপথের আন্দোলনে।

অপরদিকে অজ্ঞাত স্থান থেকে গণমাধ্যমে নিয়মিত বিবৃতি ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠাচ্ছে দলটি। তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার জন্য নানা মহলের চাপ রয়েছে। দলের আমির মকবুল আহমাদ স¤প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকার অঘোষিতভাবে জামায়াতের প্রকাশ্য কাজকর্ম নিষিদ্ধ করে রেখেছে।

কেন্দ্রীয় অফিস থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সব অফিস তালাবদ্ধ করে রেখেছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগঠন মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিগত দিনে সরব থাকলেও বর্তমানে এ সংগঠনের কর্মসূচি পালনেও বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন দলের আমির সৈয়দ রেজাউল করিম চরমোনাইপীর। তিনি বলেন, এ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ছাড়া উপায় নেই। দলটির কার্যক্রম চলে পুরানা পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে। কার্যালয় এবং আশপাশে প্রায়ই কর্মসূচি পালন করে দলটি।

ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগরীর সহসভাপতি আলহাজ আবদুর রহমান বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে কর্মসূচি পালন করি।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে থাকা একমাত্র ইসলামি দল বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। ১৪ দলে থাকার কারণে সংগঠনটি সভা-সমাবেশের জন্য প্রশাসনের অনুমতি পেতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয় না। আর এ সুযোগে সারাদেশে সংগঠনকে চাঙ্গা করা হচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকার কারণে ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সভা-সমাবেশের অনুমতি পায় না বলে জানান নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, যেখানে বিএনপির মতো দল সভা-সমাবেশের অনুমতি পায় না, সেখানে আমরা কীভাবে পাই। বিএনপির মতো দল প্রশাসনের অনুমতি না পেলে সভা-সমাবেশ করার মতো সামর্থ্য নেই, সেখানে আমরা কীভাবে করি।

অন্যদিকে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন মাঠের কর্মসূচিতে সক্রিয় না থাকায় দলগুলোর মধ্যে বিরোধ ও দ্ব›দ্ব বেড়েছে। হেফাজতে ইসলামের মধ্যেও কয়েকটি ধারা। কেন্দ্র ও মহানগর কমিটির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও তার ছেলে মাওলানা আনাসের মতামত প্রাধান্য পায়। অন্য নেতাদের মধ্যে ভিন্ন চিন্তা ও মতামত থাকলেও সেটা প্রকাশ করার মতো পরিবেশ না থাকায় অনেকের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ অন্য দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব, মতবিরোধে একাধিক ধারা তৈরি হয়েছে। এসব কারণও দলগুলোর গৃহবন্দিত্বের জন্য দায়ী।

এদিকে দলগুলোর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সুষ্ঠু রাজনীতির পরিবেশ তৈরি হলে যে কোনো সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে।

মানবকণ্ঠ/এএম

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.