দ্রুত ডাকসু নির্বাচন ও ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দ্রুত আয়োজন ও ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। ‘পরিবেশ পরিষদে’র ব্যানারে ক্রীয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়নসহ মোট ১৩টি সংগঠন এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করে।

ছাত্রলীগ আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে যেকোনো সময় ডাকসু নির্বাচন দেয়ার দাবি জানায়। অন্যদিকে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্য বামসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক সহবাস্থান তৈরি করে দ্রুত ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করার আহ্বান জানায়। রোববার বেলা ১২টায় উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুযাল ক্লাসরুমে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল সাড়ে এগারোটা থেকে ছাত্রসংগঠনের নেতারা সভাস্থলে উপস্থিত হতে শুরু করেন। জাসদ ছাত্রলীগের নেতারা সবার আগে সভাস্থলে উপস্থিত হন। এরপর রিকশায় চড়ে সভা স্থলে উপস্থিত হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগ উপস্থিত হওয়ার কিছু সময় পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের গাড়িতে করে দু’জন সহকারী প্রক্টর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকীকে নিয়ে সভাস্থলে উপস্থিত হন। তবে ডাকসু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে সবর বামসংগঠনগুলো নেতার সভা শুরু হওয়ার বেশ কিছু সময় পর উপস্থিত হন। এই সভা উপস্থিত ছিলেন দুইজন প্রো-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর ও বিভিন্ন হলের প্রাধ্যাক্ষরা।

আলোচনা সভা শেষে ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনকে আমরা রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি। আমরা ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করে তাহলে ডাকসু নির্বাচন সহায়ক হবে এবং ছাত্রদল অংশ নেবে।

ক্যাম্পাসে আজ অনিরাপদবোধ করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আজ তো প্রশাসন আমাদের ডেকে নিয়ে এসেছে। স্বাভাবিক সময়েও আমরা এমনটি চাই।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, কেউ পকেটে পেট্রলবোমা না রাখলে সহাবস্থানে ছাত্রলীগের আপত্তি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনকে আমরা সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি। ঢাবির হলগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী আছে ৩০ শতাংশ। বাকিগুলো সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। ছাত্রদলের ক্যাম্পাসে সহাবস্থানে কোনো আপত্তি নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস বলেন, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আমরা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পরে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এর আগে নির্বাচনের আয়োজন করে তাহলে ছাত্রলীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। যারা নিয়মিত ছাত্র যারা মাদকসেবী নয়, যাদের নামে কোনো মামলা নেই তারাই এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। কেউ যদি ইচ্ছা করে হলে না থেকে বাইরে বিলাসী জীবন যাপন করে তাকে আমরা হলে থাকতে পারি না।

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, সভায় আমরা বলেছি সবার পূর্বে ক্যাম্পাসে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এটা না করা হলে এ উদ্দেশ্য সফল হবে না। কারণ এর আগেও আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েও তা আলোর মুখ দেখেনি। যে কারণে পূর্বে তফসিল ঘোষণা করে আর নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থা বজায় রেখে যদি ডাকসু নির্বাচনের দিকে যাওয়া হয় তাহলে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে না।

তিনি আরো বলেন, ডাকসু ৭৩ এর আইন অনুয়ায়ী পরিচালিত হয়। আমরা যদি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় ডাকসু নির্বাচন করতে পারি তাহলে এখন কেন পারব না। আমরা চাই জাতীয় নির্বাচনের আগেই ডাকসু নির্বাচন হোক। আমরা প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট একটি তারিখ চেয়েছিলাম।

উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদের আয়োজনে আজকের এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন ক্রীয়াশীল ছাত্র সংগঠন গণতান্ত্রিক রীতি নীতি মেনে তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। তাদের কথাগুলো আমরা লিখে নিয়েছি। তারা যে ভাষায় কথা বলেছে তা আমাদের কাছে অত্যন্ত ভাল লেগেছে। তারা হটকারি কোনো কথা বলেনি। কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনের আগেই ডাকসু নির্বাচন চেয়েছে আবার কেউ নির্বাচনের পরে চেয়েছে। তবে তারা সবাই বলেছে যে কোনোভাবেই যেন ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়।

তিনি আরো বলেন, এটা আমাদের প্রথম সভা। ডাকসু নির্বাচন বিশাল বড় একটা প্রক্রিয়া। এখানে ভোটার তালিকা হালনাগাদের মতো ব্যাপার জড়িত। তারপর ডাকসুর কোনো ধারা পরিবর্তন করতে হবে কি না? তা দেখতে হবে। সেগুলো অনুসরণ করে আমরা এগুবো। ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আবার বসব। আমারা আগামী অক্টোবরের মধ্যে একটা খসড়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন করব।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শেষে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসানকে জড়িয়ে ধরেন এবং কিছু সময় কুশল বিনিময় করেন। পরে তাদের একই গাড়িতে করে পৌঁছে দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র সাত বার। সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৬ জুন। সেই নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে আমানউল্লাহ আমান ভিপি ও খাইরুল কবির খোকন জিএস নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে তিন দফায় তফসিল ঘোষণা করলেও হয়নি নির্বাচন। ২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার উপাচার্য এস এম এ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে তা গতি পায়নি। ২০০৯ সালে তখনকার উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দায়িত্ব নেয়ার পরই নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও ঘোষণা অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হন।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.