দেড় বছর বাকি থাকতেই নির্বাচনের পালে হাওয়া

নির্বাচন কমিশনবাংলাদেশে নির্বাচনের পালে লেগেছে হাওয়া। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল নির্বিশেষে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো আবার নির্বাচনী জোট করায়ও তৎপর। ক্ষমতাসীন দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেদের দলের সভা-সমাবেশে ইতিমধ্যেই নৌকায় ভোট চাইতে শুরু করে দিয়েছেন। ২১ জানুয়ারি সিলেটে হযরত শাহজালার (রহ.) মাজার জিয়ারতের পর এক দলীয় সমাবেশে নৌকায় ভোট দেয়ার কথা প্রথম উথাপন করেন। এরপর আরো কয়েকটি সমাবেশেও তিনি ভোট চেয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে এতদিন সহায়ক সরকার ব্যবস্থাসহ ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সকলের সমান সুযোগ) তৈরি করার ‘শর্ত’ দিয়ে আসছে সংসদের বাইরের প্রধানবিরোধী দল বিএনপি। তবে এই শর্তের সুরাহা না করেই ইতিমধ্যেই ধানের শীষে ভোট চাওয়া শুরু করেছেন দলের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া। গত কয়েকদিন আগে দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের এক ইফতার মাহফিলে প্রথমবারের মতো ভোট চাওয়ার কথা বললেন তিনি। আওয়ামী লীগের ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ জাতীয় সংসদের প্রধানবিরোধী দল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা) ৩৪ দলকে নিয়ে ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট’ নামের এক জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। এর বাইরে বামপন্থি দল, ইসলামী দলগুলোও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে এসব দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন হবে ২০১৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে তিন মাসের মধ্যে। আগাম নির্বাচনেরও কোনো ইঙ্গিত নেই। বিরোধী বিএনপিও সেই আশা করছে না। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ মানবকণ্ঠকে বলেছেন, দলগুলো আগামী নির্বাচনের দিকে যেতে ‘গা ঝাড়া’ দিয়ে উঠেছে। বোঝাই যাচ্ছে দলগুলো নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছে… নির্বাচনের আগে আমরা যেসব আগাম আলামতগুলো দেখি, সেগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একমাত্র ‘ভারত’ ছাড়া বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলো স্বীকৃতি দেয়নি। তাই ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ‘বৈধতার সংকটে’ রয়েছে। এজন্য শেখ হাসিনা নির্বাচনের আরো প্রায় এক-দেড় বছর বাকি থাকতেই নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে নির্বাচনী কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে তার সুরাহা এখনো হয়নি। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সহায়ক সরকারসহ নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হলে আগামী নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা বলে আসছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে এসব দাবির সুরাহা ছাড়াই দলের নেত্রী খালেদা জিয়াও ধানের শীষে ভোট চাইলেন। এ থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে যে, রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনে দিকে এগুচ্ছে। এটাকে তিনি ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে মনে করেন।

নাম প্রকাশ না করে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা বলেছেন, এমনকি ভেতরে ভেতরে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থী শনাক্তের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিদের সাবধান করে বলেছেন, আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো সহজ হবে না। তিনি ইঙ্গিত করেছেন বিএনপি সামনের নির্বাচনে যোগ দেবে এবং সেজন্য শক্ত লড়াইয়ের জন্য এমপিদের কাজ শুরু করতে বলেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও চলতি মাসে ছাত্রলীগের এক বর্ধিত সভায় আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একটি করে শক্তিশালী টিম গঠন করার জন্য পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতাদের প্রতি নির্দেশ দেন। আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত তাদের কমিটিগুলোকে চাঙ্গা করতে শুরু করেছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিন বছর কেটে গেছে। বাকি আছে এক বছর কয়েক মাস… আমরা দল গোছাতে শুরু করেছি।

আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কি করছে? দলের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সাক্ষাৎকারে মানবকণ্ঠকে বলেন, বিএনপি সবসময়ই একটি নির্বাচনমুখী দল। যে কোনো সময় দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মতো প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছে। তবে মূল কথা হচ্ছে সেই নির্বাচনের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে কিনা। নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না এ নিয়ে বিএনপি এখনো পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। তবে তারা বলেছেন, সহায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না আবার একদলীয় নির্বাচনও করতে দেবে না। এরই মধ্যে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সংগঠনের এক ইফতার মাহফিলে ধানের শীষে ভোট চাইলেন।

দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে দল গোছানো হচ্ছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূলে দলের ও নেতা কর্মীদের কী অবস্থা তা সরেজমিন দেখার জন্য এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে ৫১টি কমিটি গঠন করা হয়। তারা সারাদেশে সভা-সমাবেশ ও উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে দলীয় ও নেতা কর্মীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ কাজ শেষ করেছেন। বেশ কিছু স্থানে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের বাধার কারণে সমাবেশ করতে না পারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে যেসব জায়গায় সমাবেশ করা গেছে, সেসব স্থানের অধিকাংশ রিপোর্টই জমা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে দলের ও নেতা কর্মীদের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। বিএনপি ইতিমধ্যে ভিশন-২০৩০ উপস্থাপন করেছে। এতে আগামীতে তারা কি করতে চায়, তার একটি স্বচ্ছ ধারণা ওই ভিশনে দেয়া হয়েছে। ঈদের পর সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে দলের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজও চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো ভেতরে ভেতরে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের খসড়া তালিকাও চূড়ান্ত করেছে কয়েকটি দল। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপে এমনটাই জানা গেছে।

জোট নেতারা বলছেন, গতবার জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত হওয়ায় নির্বাচন বর্জন করা হয়। কিন্তু এবার নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারপরও জোটের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিলে প্রতিটি দলের প্রার্থীই বেশি হবে। কিন্তু জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দলের প্রার্থীর জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হবে, এটা স্বাভাবিক। এদিকে ২০ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কথা না হলেও তাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে বলে বিএনপির বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে জামায়াতকে ৩১টি, বিজেপিকে সাতটি এবং ইসলামী ঐক্যজোটকে ছয়টি আসনে ছাড় দেয় বিএনপি। আর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামায়াতকে ৩৫টি, বিজেপিকে দুই, ইসলামী ঐক্যজোটকে দুই এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীকে দুটিসহ শরিকদের মোট ৪১টি আসন ছেড়ে দেয়া হয়।

আওয়ামী লীগেরই ঘনিষ্ঠমিত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করেছে চলতি বছরের ৬ মে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট’ নামের এ জোটে রয়েছে প্রাথমিকভাবে জাতীয় পার্টি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল ইসলামিক ফ্রন্ট, মাসখানেক আগে ৩৪টি ইসলামপন্থি সংগঠনকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা ‘জাতীয় ইসলামী মহাজোট’ এবং ২০১৫ সালে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে পরে তাকেই অব্যাহতি দেয়া ৩১ সংগঠন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়া নতুন জোট নিয়ে রাজনীতিতে নানা ধরনের আলোচনা থাকলেও জাপা মনে করছে, ভবিষ্যতে আসন ভাগাভাগিতে কাজে লাগবে। দলের নেতারা বলছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেকোনো মূল্যে আরেকবার ক্ষমতায় যেতে চান এইচএম এরশাদ। আর যদি তা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে তিনি ক্ষমতার ভাগ কিংবা আমৃত্যু রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে চান। আর এসব চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। তা ছাড়া আগামী নির্বাচনে কোনো কারণে যদি বিএনপি না আসে তখন বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার সুযোগ থাকবে। এ কারণে তিনি জোট গঠন করেছেন বলে জানিয়েছেন এইচএম এরশাদের ঘনিষ্ঠরা।

দীর্ঘ সময় ধরে বাম গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক ঐক্যের চেষ্টা চালালেও তা এতদিন সফল হয়নি। তবে বাম শিবির ও সংশ্লিষ্ট প্রগতিশীলরা এবার আশাবাদী, বছরের পর বছর ধরে চলা এই আকাক্সক্ষা অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে কয়েক নবীন-প্রবীণ বিশিষ্ট নেতার হাত ধরে। গত তিন মাস ধরে চলা এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় তিনটি নাম উঠে এসেছে। এরা হলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ঐক্যের প্রয়োজন সব সময়ই ছিল। ২০০৫ এ উদ্যোগ নিয়েছিলাম, রেজাল্ট এলো ২০০৮ সালে। ২০০৭ সালে নির্বাচনের চেষ্টা করা হলো, কিন্তু হয়নি। ভুয়া ভোটার তালিকা বাতিল হলো। এটা তো আমাদের ঐক্যের কারণেই। সেই ঐক্যের কারণেই তো শেখ হাসিনার সরকার।

তিনি বলেন, আমরা চাই অর্থপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তন। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে বিকল্প শক্তিকে বিকশিত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা সংগ্রাম করছি। প্রয়োজনে ইলেকশনেও একই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি জোটের বাইরের ইসলামী দলগুলোর মধ্যেও জোট করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে আসা ইসলামী ঐক্যজোট চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী মানবকণ্ঠকে বলেন, জোট করার ব্যাপারে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। সবারই মনোভাব ইতিবাচক। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, জোট গঠনের কাজ আরো দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

মানবকণ্ঠ/জেডএইচ