দেশ ও সমাজ কি আসলেই তাকে মনে রাখবে?

মুক্তিযুদ্ধ এখন একটা বিপণনের বিষয়। বিশ্বাস না হলে দেশের দিকে তাকান। নিজেই উত্তর খুঁজে পাবেন। এই যে রমা চৌধুরীর বিদায় দেখুন কি কাণ্ড! তার মৃত্যুর পর মিডিয়া খুললে মনে হবে কত আনন্দে আর ভালোবাসায় ছিলেন তিনি। আসলে কি তাই? আমি নিজে দেখেছি তার কষ্ট ও বেদনা কত প্রচণ্ড ছিল। এরা আমাদের দেশের সেই মানুষ যাদের ত্যাগহীন এ দেশের জন্ম হতো না। কিন্তু সব ফাঁকা বুলি। সব লোক দেখানো। তার কষ্টের জীবন আর দুঃখ নিয়ে কথা বাড়াতে চাই না। একদিন যারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল তারাই আজ মায়াকান্না কাঁদছে।

এটাই অপমানের। আমাদের দেশ ও সমাজ কতটা নষ্ট হয়েছে তার একটা বড় চিত্র আছে এতে। রমা চৌধুরীর জীবিত ছেলেটি এখন মিডিয়ায় এসে কান্নাকাটি করছে। কারণ তার জানা আছে, এখন স্পর্শকাতর সময়ে ভালো করে অভিনয় করতে পারলে কিছু নগদ জুটবে। এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা। এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি এমনকি রমাদির বইয়ের টাকা শোধ না করা বি. চৌধুরী- সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে দেখাবেন কে কতটা করতে পারেন। এই ছেলে সে সুযোগ নেয়ার জন্য তৈরি। অথচ জীবদ্দশায় মায়ের খোঁজ নেয়নি।

যে নিয়েছিল সে জন্মসূত্রে মুসলিম। আলাউদ্দিন খোকন নামের এই লোকটি সারাজীবন রমা দিকে সহায়তা করে গেছেন। গাঁটের টাকা বা টাকা জোগাড় করে তার বই বের করে দিয়েছেন। মা ডাকা আর মা মানা দুটি ভিন্ন বিষয়। এই মানুষটি মেনেছিলেন। তাই কখনো রমাদির অমর্যাদা হতে দেননি। আজ তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় নেই। বরং বলে দিয়েছেন কিছু দিলে ছেলেকে দেয়া হোক। কে বলে আমাদের সমাজে সব মন্দ? সব ভেসে গেছে খারাপের বন্যায়? এই মানুষটি প্রমাণ করে দিয়েছেন ধর্ম বর্ণ বা জাত এগুলো বিষয় নয়। বিষয় নয় সাম্প্রদায়িকতা। দেশে যখন ধর্ম আর আচার মিলে সর্বগ্রাসী মানুষ মানুষকে সেভাবে দেখার কারণে বন্ধুত্ব আত্মীয়তা এমনকি সম্পর্ক প্রায় নষ্টের পথে, তখন আলাউদ্দিনের মতো কিছু মানুষই আলোকবর্তিকা।

কই আমরা কেউ তো পারিনি। কেউ তো এগিয়ে এসে দিদির জীবনে দাঁড়াইনি। কারণ সবার একটা হিসাব-নিকাশ আছে। কতটা করলে কতটা লাভ বা লোকসান। সে হিসাবের বাইরে সবাই পা রাখতে পারে না। ফলে মুক্তিযুদ্ধ বা যুদ্ধবিষয়ক গল্প যতটা কাজে ততটাই পিছিয়ে আমরা। একটা দেশে মুক্তিযুদ্ধ বা তার ইতিহাস কখন বেগবান হয়? কখন সত্যিকারের পথ খুঁজে পায়? আসুন প্রকাশিত একটা খবরে চোখ রাখি: ‘বঙ্গভবনের দরবার হল ও কার্নিভাল হলের মাঝখানের করিডর। বাঙালি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকপাল হিসেবে এখানে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ জন বিখ্যাত মণীষীর ছবির পোর্ট্রেট টাঙানো। কিন্তু এ ছবিগুলোয় অনুপস্থিত বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

প্রদর্শিত ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছে শুধুমাত্র ১৯৪৭ সালের আগে ও পরের মণীষীদেরই বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি এ সময়ের বিখ্যাত কাউকেই রাখা হয়নি এখানে।

যেমন ছবির সারিতে নেই অতীশ দীপঙ্কর, নেই বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোস বা জগদীশ চন্দ্র বসুর পোর্ট্রেট। কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, কায়কোবাদ ও জসীমউদ্দীনের পোর্ট্রেট থাকলেও নেই বাংলা ভাষার অন্যতম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা জীবনানন্দ দাশের পোর্ট্রেট। নারীদের মধ্যে বেগম রোকেয়ার পোর্ট্রেট স্থান পেলেও নেই প্রীতিলতার পোর্ট্রেট। তিতুমীরের পোর্ট্রেট থাকলেও নেই মাস্টারদা সূর্য সেনের পোর্ট্রেট।’

এই খবর দেখে আপনার কি মনে হয় যে আসলেই আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক জাতি বা যারা এখন মসনদে তারা আসলেই অসাম্প্রদায়িক? যদি তারা তা হতেন এ খবর কি তাদের অজানা? জানার পরও তারা কোনো অ্যাকশনে যায়নি। কারণ তারা ভালো জানে এদেশের আমজনতাকে খুশি রাখতে হলে মুখে যা বলেন কাজে তা করা যায় না। বা করবেন না। এরপর আপনি কিভাবে নিশ্চিত যে রমা চৌধুরী এদেশের ইতিহাসে জায়গা পাবেন? আমি খেয়াল করে দেখেছি, ইতিহাস গান কবিতায় ঈশা খান বা তিতুমীরকে নিয়ে কথা থাকলেও বাস্তবে সূর্য সেন বা প্রীতিলতা নেই।

কেন নেই? অথচ বাকি দু’জন নন, এরাই আমাদের ভূমির সন্তান। কিন্তু জন্ম বা জন্মভূমির চাইতে সম্প্রদায়গত পরিচয় বড় হয়ে উঠলে তখন তো তারা থাকবেন না এটাই স্বাভাবিক। একই কারণে বরিশালের জীবনানন্দ কিংবা বাংলার অতীশ দীপঙ্কর বা সত্যেন বোস নেই। কারণ মন থেকে হয়তো আমরা তাদের নিজেদের মানুষ মনে করি না। বলবেন তো যে রবীন্দ্রনাথ আছেন কী করে? মূলত তিনি এবং নজরুল দুজনই ওপার বাংলার সন্তান। কেউ আমাদের ভূমিতে জš§াননি। তাতে তাদের গৌরব বা সম্মান কোনোটার কোনো লাভ লোকসান কিছু নেই। কিন্তু তাদের ছাড়া আমাদের চলে না আর তারা এত ব্যাপক আর এত আলোময় না থাকলে আমরাই অন্ধকারের জীবে পরিণত হয়ে পড়ি। তাই হয়তো তারা থাকেন।

এভাবে আর যাই হোক, ইতিহাস বা শুদ্ধতা রাখা যায় না। তাই তা নেইও। আজ বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীকে নিয়ে যারা ফেনা তুলছেন। তারা বাসায় ফিরে হয়তো ঠিক উল্টো কিছু বলছেন। কেউ বলবেন ঠিক হয়েছিল। পাকি সৈন্যরা গনিমতের মাল ভোগ করে অন্যায় কিছু করেনি। আর একদল বলবেন তাদের ভাবলেই গা ঘিন ঘিন করে তবু যেতে হয় বলে যাওয়া। এই হিপোক্রেসি আমাদের জাতিকে দিন দিন ক্লিব আর দুর্বল করে তুলেছে। এখন তা আর রুখে দাঁড়ানোরও শক্তি নেই। যা আছে তার নাম প্রদর্শন। এইভাবে তাই কাউকে না যায় সম্মান জানানো, না করা যায় অসম্মান।

এদেশের ইতিহাসে একাত্তর যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিক ততটাই তাকে টেনে নামাচ্ছি আমরা। দেখুন চোখ খুলে প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে তিনি লাইম লাইটে কিছুটা এসেছিলেন, তারপর? যে কপাল সেই মাথা। দু’লাখ টাকা দেবার পর আর কেউ কোনো খোঁজ নিয়েছিল? দেশে এত মুক্তিযুদ্ধ প্রেমিক, সরকারি দলে এত মহান সব একাত্তরবিদ, চাটগাঁয় এত সুশীল, এত এত বুদ্ধিজীবী কেউ তার খবর রাখেনি। যখন তিনি নেই তখন লাল-সবুজে ঢেকে শোক প্রকাশ। জানি লাল-সবুজ তাকে ভালোবাসে। কেউ পরিয়ে না দিলেও এই জাতীয় পতাকা নিজ থেকেই তাকে জড়িয়ে নিত। প্রকৃতি বা সময় আমাদের মতো বেইমান নয়। তাদের কাছেই এদের আসল আশ্রয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চেতনা ও ইতিহাস ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ছে। এরা একেকজন চলে গেলে আমাদের সে সব মানুষের আর কেউই থাকবেন না যারা এদেশের জন্ম আর ইতিহাস দেখেছিলেন। যারা নিজেরা ইতিহাস হয়েছিলেন সম্ভ্রম বা জীবন হারিয়ে। যারা সম্ভ্রম হারিয়ে আমাদের চরিত্র দিয়ে গেলেন তাদেরও আমরা ঠিকভাবে দেখে রাখি না। রমা চৌধুরী তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত প্রেমিকেরা কি ইতিহাসকে আগলে রাখতে আবারো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবেন এদেশে? – লেখক : সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.