দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ করা এখনো চ্যালেঞ্জ

আজ ২৪ মার্চ। আন্তর্জাতিক যক্ষ্মা দিবস। ১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ ডা. রার্বট কক যক্ষ্মা রোগের জীবাণু টিউবারকিউলসিস আবিষ্কার করেন। জীবাণু আবিষ্কারের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার এবং যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব ব্যাপী যক্ষ্মা এখনো অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। সারা বিশ্বে প্রধান ১০টি মৃত্যুর কারণের মধ্যে যক্ষ্মা একটি।

প্রতিবছর বিশ্বে এই রোগে মৃত্যুবরণ করে প্রায় সতের লাখ মানুষ। বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখে ২২১ জন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয় এবং ৩৬ জন মৃত্যুবরণ করেন। দেশে বর্তমানে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জন যযক্ষ্মা রোগী শণাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শিশু যক্ষ্মা রোগী শণাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ জন। শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্তকরণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ২৬ শতাংশ যক্ষ্মা রোগী শণাক্তের বাইরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মার প্রকোপ এবং ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি এমন দেশের তালিকা তৈরি করেছে। দুটি তালিকাতেই বাংলাদেশের নাম আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে এ সময়ে প্রধান চ্যালেঞ্জ ওষুধ প্রতিরোধকারী যক্ষ্মা বা এমডিআর যক্ষ্মা। এমডিআর যক্ষ্মার অন্যতম প্রধান কারণ যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীর অনিয়মিত ওষুধ সেবন। এমডিআর যক্ষ্মার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। এর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি, জটিল ও ব্যয়বহুল। এ ছাড়া যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে শিশু যক্ষ্মা শনাক্তকরণে জটিলতা, নগরে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ও এইচআইভি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া সংক্রমণের ইতিহাস সঠিকভাবে জানা যায় না। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিকল থাকে এক্সরে মেশিন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যক্ষ্মা শনাক্ত যন্ত্র জিন এক্সপার্টের অভাব রয়েছে।

চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকে না। জনসচেতনতারও অনেক অভাব লক্ষ্য করা যায়। এসব কারণে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শিশু যক্ষ্মা রোগীর শনাক্তের হার অনেক কম। তবে অধিক জনসংখ্যা ও বসতির কারণে ঢাকায় শিশু যক্ষ্মা রোগী তুলনামূলক বেশি। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ মানবকণ্ঠকে বলেন, পুষ্টিহীনতা, শহরের বস্তি, ভাসমান এবং নগর ও মহানগরীর জনগোষ্ঠী যক্ষ্মা কর্মসূচির সফলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডায়াবেটিস, তামাক, অবহেলা, অসচেতনতা ও অজ্ঞতা। তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার প্রতিটি উপজেলায় ডিজিটাল এক্সরে মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘জিন এক্সপার্ট’ মেশিন দিতে হবে।

এনটিপির ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কনসালট্যান্ট ডা. মজিবুর রহমান বলেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা। এ ছাড়া আগামী দিনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো হলো কফে জীবাণুযুক্ত ফুসফুসের যক্ষ্মা, ফুসফুস বহিভর্‚ত যক্ষ্মা, শিশু যক্ষ্মা শনাক্তরণে সমস্যা ও দারিদ্র্যের কারণে যক্ষ্মার প্রকোপ বৃদ্ধি।

ব্রঅকের টিবি, ম্যালেরিয়া, ওয়াশ ও ডিইসিসির পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে জাতীয় য²া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। শহর ও গ্রামে জনসংখ্যা অসম অনুপাতে বাড়ছে। শহরের জনসংখ্যা বাড়লেও সেবা প্রদানকারী সংখ্যা বাড়েনি। তিনি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে মোবাইল ফোন ব্যবহার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

ডা. মো. মজিবুর রহমান বলেন, যক্ষ্মা রোগ চিকিৎসায় সফলতার হার দিন দিন বাড়ছে। ১৯৯৩ সাল থেকে ডট্স পদ্ধতির মাধ্যমে এ রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে ব্র্যাকের নেতৃত্বে ৪৩টি এনজিও যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এ রোগ নির্মূলে শুধু বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর না হয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

যক্ষ্মা নিয়ে গবষেণা করছেন ডা. আহমেদ হোসাইন খান। তিনি বলেন, যক্ষ্মার জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। দেহে এ রোগের জীবাণু প্রবেশ, করলেও সবাই আক্রান্ত হয় না। দেশে প্রতিবছর ৫-১০ শতাংশ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। যক্ষ্মাকে অভিশপ্ত মনে না করে এ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে। বৈশ্বিক ও দেশের যক্ষ্মা পরিস্থিতি তুলে ধরেন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির চিকিৎসা কর্মকর্তা নাজিস আরেফিন। তিনি বলেন, দেশে যক্ষ্মা এখনো জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক যক্ষ্মা প্রতিবেদনের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে যক্ষ্মায় ৬৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আর ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নতুন করে যক্ষ্মার জীবাণুতে আক্রান্ত হয়। আর ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মায় (এমডিআর টিবি) আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৩০০। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিষয়ভিত্তিক পরিচালক অধ্যাপক শামিউল ইসলাম বলেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ আছে। এতে দাতা সংস্থার অর্থ ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে শহরগুলোতে যক্ষ্মার প্রকোপ বাড়ছে। দিন দিন ওষুধ প্রতিরোধ যক্ষ্মার প্রকোপ বাড়লেও এই রোগ শনাক্তকরণের আধুনিক যন্ত্র (জিন এক্সপার্ট) আছে মাত্র ১৯৩টি। দরকার প্রতি উপজেলায় একজন করে। যক্ষ্মা বিশেষজ্ঞ আসিফ মোস্তফা বলেন, সাধারণ যক্ষ্মারোগীকে নিয়ম মেনে দৈনিক ওষুধ খেতে হয় টানা ছয় মাস। ছয় মাসের কোর্স শেষ না করলে, নিয়ম মেনে ওষুধ না খেলে, মানসম্পন্ন ওষুধ না খেলে চিকিৎসা কার্যকর হয় না। যক্ষ্মার জীবাণু ওষুধসহনশীল হয়ে পড়ে। ওই ওষুধে জীবাণু ধ্বংস হয় না, রোগী ভালো হয় না। এটাই এমডিআর যক্ষ্মা।