দেশে দেশে বৈচিত্র্যময় ইফতার

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইফতারের আয়োজন করা হয় নানা ধরনের খাবার দিয়ে। ইফতার আয়োজনে উঠে আসে তাদের সংস্কৃতি, তাদের কৃষ্টি-
বাংলাদেশ: বাংলাদেশের ইফতারে যে সব আইটেম প্রায় সবখানেই থাকে, সেগুলো হলো- খেজুর, পেঁয়াজু, বেগুনি, হালিম, আলুর চপ, জিলাপি, মুড়ি ও ছোলা। একটু ব্যতিক্রমী হলে থাকে সমুসা, ফিশ কাবাব, মাংসের কিমা ও মসলা দিয়ে তৈরি কাবাবের সঙ্গে পরোটা, মিষ্টি ও ফল। শরবতসহ এসব খাবার এ দেশের ইফতার আয়োজনকে দেয় পরিপূর্ণ রূপ। কিছু অঞ্চলের ইফতারের আসরে খিচুড়ি, চিড়া ইত্যাদিও শোভা পায়। তবে বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বিবেচনা করলে ছোলা, মুড়ি, চিড়ার শরবত কিংবা লেবুর শরবত এ আইটেমগুলোই সবসময় থাকে।
সৌদি আরব: বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইফতার আয়োজন করা হয় সৌদি আরবে। মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ আয়োজন করা হয়। এখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় লাখো মানুষ একসঙ্গে ইফতার করে থাকেন। এখানকার ইফতারে থাকে নানা ধরনের মুখরোচক খাবার। কোনাফা, ত্রোম্বা, বাছবুচাণ্ডর নামক নানা রকম হালুয়া এ খাবার-দাবারের অংশবিশেষ। এ ছাড়া রয়েছে সাম্বুচা নামক এক ধরনের খাবার, যা দেখতে ঠিক সমুসার মতো, এটি মাংসের কিমা দ্বারা তৈরি। এটির আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে কোনো মরিচ থাকে না। এ ছাড়া থাকে সালাতা, যা হচ্ছে এক প্রকার সালাদ। এ ছাড়া থাকে সরবা, জাবাদি দই, লাবান, খবুজ (ভারী ছোট রুটি) বা তমিজ (বড় রুটি)। তাছাড়া খেজুরের নানা রকম লোভনীয় আইটেম তো রয়েছেই। খেজুরের বিস্কুট, পিঠা ইত্যাদিও থাকে তাদের এ আয়োজনে।
ইন্দোনেশিয়া: ইন্দোনেশিয়ার দেশীয় ভাষায় ইফতারকে বলা হয় ‘বুকা পুয়াসা’। আমাদের দেশে সাইরেন বাজানোর রীতির মতো ওই দেশে বেদুক বাজানোর মাধ্যমে ইফতারের সময় নিশ্চিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তাছাড়া আসরের নামাজের পর বাজারগুলোয় ইফতারসামগ্রী বিক্রি হয়, নানা রকমের পসরা নিয়ে বসেন দোকানিরা ইফতার বিক্রির জন্য।
ইরান: ইরানের ইফতার আয়োজন হয় খুব সাদাসিধা ধরনের, খুব বেশি কিছু থাকে না তাদের ইফতারিতে। চা, লেভাস বা বারবারি নামের এক ধরনের রুটি, মিষ্টি পনির, বিভিন্ন ধরনের তাজা ভেষজ উদ্ভিদ, মিষ্টি, খেজুর ও হালুয়া দিয়েই চলে সেখানকার ইফতার।
ভারত: ভারতেও আমাদের দেশের মতো ইফতারে সাইরেন ও আজান দেয়া হয়। সাইরেন বাজানো হলে ভারতীয় মুসলিমরা খেজুর ও পানি পানের মাধ্যমে রোজা ভাঙেন। হায়াদরাবাদ প্রদেশে হালিম দিয়ে ইফতার শুরু হয়। তামিলনাড়– ও কেরালায় ননবু কাঞ্জি দিয়ে ইফতার করা হয়। এটি চাল, সবজি ও মাংস দিয়ে তৈরি ভাতজাতীয় একটি আইটেম। দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে পরিবার-পরিজনরা একসঙ্গে ফলের রস ও পাকোড়া এবং সমুসার মতো ফ্রাইড ডিশ দিয়ে ইফতার শুরু করেন।
রাশিয়া: রাশিয়ার মুফতি কাউন্সিল কর্তৃক সে দেশে পাবলিক ইফতারের আয়োজন করা হয়। সে দেশের মুসল্লিরাও রোজা ভাঙতে খেজুর খেয়ে থাকেন। এর পর স্যুপ, রুটি ও বিভিন্ন স্থানীয় খাবারের আয়োজন থাকে। সে দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করেন, রাশিয়ান ঐতিহ্যবাহী ‘কাভাস’ তৃষ্ণা মেটাতে সেরা পানীয়।
দুবাই: এ দেশের ইফতারেও থাকে নানা রকম মুখরোচক খাবার ও পানীয়। রুটি, মাংসের চপ (যা ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি; স্থানীয় ভাষায় ওউজি), মসুর ডালের স্যুপ, সালাদ ইত্যাদি থাকে। তাদের এ আয়োজনকে সম্মিলিতভাবে ‘মেজে’ বলা হয়। তারাও ইফতারে নানা ধরনের শরবত তৈরি করে থাকেন।
ফিলিস্তিন: এ দেশের মুসল্লিদের ইফতারির সঙ্গে বাঙালিদের বেশ মিল রয়েছে। নানা ধরনের ভাজাপোড়া দিয়ে তারা ইফতার করে থাকেন। তবে পুরনো জেরুজালেমের বাসিন্দারা চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী তাদের জনপ্রিয় পানীয় তামারিন জুস পান করেন।
মালদ্বীপ: এ দেশের ইফতারকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘রোয়াদা ভিলান’। তাদের ইফতারের মূল উপাদান শুকনো বা ফ্রেশ খেজুর। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ বা হোটেলে ইফতার ও ডিনারের বিশেষ আয়োজন থাকে। অন্যদিকে সেখানকার মসজিদগুলোয় ফ্রি খেজুর ও জুসের ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়া ঘরে ঘরে নানা ধরনের ইফতারের আয়োজন করেন সে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।
মালয়েশিয়া: এখানকার মুসল্লিরা ইফতারে বারবুকা পুয়াসা খেয়ে থাকেন। যাকে তাদের ভাষায় বলা হয়, আখের রস ও সয়াবিন মিল্ক। তাছাড়া অন্যান্য খাবারের মধ্যে রয়েছে লেমাক লাঞ্জা, আয়াম পেরিক, নাসি আয়াম, পপিয়া বানাস ও অন্যান্য খাবার। মালয়েশিয়ায় একটা প্রচলিত রীতি হচ্ছে, এ দেশের বেশির ভাগ মসজিদে রোজায় আসরের নামাজের পর স্থানীয়দের ফ্রি রাইস পরিজ দেয়া হয়।

 

মানবকণ্ঠ/আরএস