দেশের গণমাধ্যমে সংকট

বাংলাদেশের সাংবাদিকগণ তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছেন। একটি দেশের সাংবাদিক, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী যদি সৎ, যোগ্য ও বাস্তববাদী হয়, তবে যে কোনো ধরনের উন্নতি করতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের মফস্বলে মুদ্রণ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। মফস্বল এলাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক, সাপ্তহিক পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদ কর্মীদের সাংবাদিকতা একভাগে চিহ্নিত হতে পারে। আর অন্য ভাগে ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক, সাপ্তহিক পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদ কর্মীদের কার্যক্রমকে দ্বিতীয় ভাগে দেখানো যায়। বাংলাদেশে তীব্র আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে যেমন প্রচুর সংখ্যক জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে, তেমনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও বিপুল সংখ্যক নতুন নতুন স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছে।
অনলাইন পত্রিকার সংখ্যাও দেশে অনেক। এ সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। বিভিন্ন সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় অনেক টিভি চ্যানেল হয়েছে।
এসব পত্রিকা, অনলাইন কিংবা টিভি চ্যানেলের দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সংবাদ কর্মীর প্রয়োজন হয়।
কিন্তু এসব মফস্বল সংবাদ কর্মীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা অনেক। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোতে মফস্বল ডেস্ক নামে একটি ডেস্ক আছে। এটা বার্তা বিভাগেরই অংশ। এ ডেস্কের একজন প্রধান থাকেন, তার সহযোগী থাকেন আরো কয়েকজন। ঢাকার বাইরে থেকে সংবাদদাতা, নিজস্ব প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর এ ডেস্কে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন সাপেক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ঢাকার বাইরে থেকে পাঠানো সংবাদগুলো গুরুত্ব অনুযায়ী সংবাদপত্রের বিভিন্ন পাতায় প্রকাশিত হয়।
এমনো কেউ কেউ আছেন, যারা কেবল মাত্র কোনো দৈনিক, জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাদের সবার পরিচয় সাংবাদিক। কিন্তু বিভেদ কেন? এ বিভেদের একটি গুরুতর কুফল এই যে, যারা উপজেলা, পৌরসভা, জেলা, বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন, তাদের অনেকই কেন্দ্রীয় দফতরে সাংবাদিক হিসেবে যারা কাজ করেন তাদের তুলনায় নিজেদের হীন ভাবেন। আবার কেন্দ্রীয় দফতরে এমন সব সাংবাদিক কাজ করেন, যাদের মধ্যে এমনও অনেকে আছেন যারা নিজেদের মফস্বল সাংবাদিকদের চেয়ে শ্রেয়তর ভাবেন এবং এ নিয়ে অহংকার করে থাকেন। কোনো কোনো সময় তারা মফস্বলের সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানিও করে থাকেন।
একজন সফল সাংবাদিকের যে শিক্ষা, দীক্ষা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, যোগ্যতা, পর্যবেক্ষণ, মেধা ও প্রতিভা থাকা দরকার, তা একজন মফস্বল সাংবাদিকের পুরোপুরি থাকতে পারে, আবার কেন্দ্রীয় পরিদফতরে যারা কাজ করেন তাদের অনেকের মধ্যে সে সব যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, মেধা, প্রতিভা নাও থাকতে পারে। সুযোগ সুবিধা দেয়ার ব্যাপারটি তার পারফরমেন্সের ওপর হওয়া উচিত। সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ এটা কোনো সময় ভেবে দেখেন না।
উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিক, এমনকি জেলা পর্যায়ের কোনো কোনো সাংবাদিককে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা দেন না। তবে তারা কোনো কোনো সময় অস্থায়ী নিয়োগপত্র, নামমাত্র একটি পরিচয়পত্র, পত্রিকার সৌজন্য কপি হাতে ধরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব কর্তব্য শেষ করেন। তারপরও কোনো কোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ না পাঠানো হলে মফস্বলের সাংবাদিকদের ধমক খেতে হয়। সাংবাদিকতা হারানোর ভয় থাকে। হাতে গোনা কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় নিয়োজিত সাংবাদিকরা মাত্র ৫০০ টাকা করে প্রতি মাসে সম্মানী পেয়ে থাকেন। যারা উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতাকে সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাদের করুণ দশা।
তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। আর যারা সাংবাদিকতাকে নেশা বা দ্বিতীয় পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাদের কথা আলাদা। জীবনযাপনের জন্য সার্বক্ষণিক সাংবাদিকদের আরো অনেক কিছু করতে হয়। স্থানীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিকদের অবস্থা আরো করুণ। বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধাবিহীন নিয়োগকৃত সাংবাদিক পরিচয়পত্র বহনকারী ওই সব সাংবাদিকদের অনেকে পরিচয়পত্র ভাঙ্গিয়ে খেতে অভ্যস্ত। – গণমাধ্যম ডেস্ক