দেশীয় সম্পদ ব্যবহার ও বাপেক্সকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন

বাংলাদেশের ভেতরের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা না গেলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়তেই থাকবে। এজন্য আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি বড় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশীয় কয়লার ব্যবহার করার বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে বাপেক্সকেও করা দরকার শক্তিশালী।

চলতি মাসেই পিডিবিসহ সবগুলো বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানিতে বিদ্যুতের দামের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে এর উৎপাদন খরচও। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, আমদানির নির্ভরতার কারণেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। নিজেদের দেশের গ্যাস অনুসন্ধান কমিয়ে দিয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করেছে সরকার। এতে সাময়িকভাবে জ্বালানি সংকট কিছুটা কমলেও দাম হবে অনেক বেশি। এই বেশি দামের গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে তখন উপায় নেই সরকারের। সরকারের এই অদূরদর্শী পরিকল্পনার খেসারত দেবে সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কথা সরকার মুখে বললেও বাস্তবে বাপেক্সের হাতে কাজ না দিয়ে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাসপ্রমকে দিয়ে বাপেক্সের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ খরচ করে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যেমন অপচয় হচ্ছে তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বাপেক্সের মাধ্যমে দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান করা যেমন জরুরি তেমনি সাগরের গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও সরকারের উদ্যোগ আরো দ্রুত করা দরকার। তিনি বলেন, সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ যত দেরি করবে ততই গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকবে। তাই দ্রুত উদ্যোগ নেয়া দরকার।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, আমদানি করা তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সেই বিদ্যুতের দাম বেশি হবেই। নিজেদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তা তুলনায় অনেক কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তিনি বলেন, একদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুতের দাম বেশি তার ওপর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছ থেকেই বেশি করে বিদ্যুৎ নিচ্ছে পিডিবি। ফলে বেশি দামের বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে লোকসানে পড়ছে পিডিবি। অথচ গ্যাসভিত্তিক একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো গেলে খরচ অনেক কম পড়তো পিডিবির। ড. ইজাজ বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সরকার নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে কাজের গতি অনেক কম। স্থলভাগের অনুসন্ধান হচ্ছে না বলতে গেলে। আর সাগরের অনুসন্ধানের বিষয়ে সরকার নানা পরিকল্পনার কথা বললেও গত দুই বছরের কোনো কাজই করা হয়নি এজন্য।
তিনি বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি দেশীয় কয়লার বিষয়ে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা না গেলে অন্য অনেক পদ্ধতিতে এই কয়লা ব্যবহার করা যায়। সেগুলোর যেকোনো একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে সে ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। সরকার শুধু আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে দেশ চালানোর পরিকল্পনা করছে। এতে করে জ্বালানি তথা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়বেই।

পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ আবদুল মায়িদ বলেন, শুধু সাগরে নয় পাবর্ত্য অঞ্চলেও আমাদের গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে এখন পর্যন্ত সেখানে অনুসন্ধানের কোনো কাজই শুরু করা যায়নি। বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সাগর ও পার্বত্য এলাকায় যদি গ্যাস অনুসন্ধান করা যায় তাহলে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। তাই সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগ নেয়া। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়াসহ অন্য কয়লা খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া দরকার। শুধুমাত্র তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলে বিদ্যুতের দাম বেশি হবেই। উৎপাদন খরচ বেশি হলে বিক্রিও করতে হবে বেশি দামে। তাই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি কয়লা ও গ্যাস দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে আমদানি করা কয়লা বা গ্যাস নয় দেশীয় সম্পদের ব্যবহার জরুরি।

এদিকে বর্তমানে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা বলা হলেও তা শুধু মুখে মুখে। দীর্ঘদিনে না বেড়েছে কোনো সুযোগ-সুবিধা, না বেড়েছে গ্যাসের দাম। ফলে কাজের গতি ধরে রাখা যাচ্ছে না বাপেক্সের। অভিজ্ঞ লোকবল একের পর এক অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় যেমন অভিজ্ঞ ভূ-তত্ত্ববিদরা চলে যাচ্ছেন তেমনি গ্যাসের দাম না বাড়াতে অর্থনৈতিকভাবে লোকসানের দিকে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমান সরকারের আমলে চারটি খননযন্ত্র কেনা হলেও বর্তমানে লোকবল আর কাজ না থাকায় পড়ে আছে যন্ত্রগুলো।

জানা যায়, স্থলভাগের নতুন করে আরো ১২টি কূপ চার বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এদিকে দুই মাস ধরে বাপেক্সের খনন (ড্রিলিং) বিভাগের কোনো কাজ নেই। জনবল ও খননযন্ত্র অলস বসে আছে। সূত্র জানায়, সরকার ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের স্থলভাগে ২৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ওয়ার্কওভার ও ২৩টি অনুসন্ধান কূপ। পরবর্তী সময়ে তিনটি অনুসন্ধান কূপ পরিকল্পনা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাকি ২০টি কূপের মধ্যে ১৪টির খনন পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত। এর মধ্যে ১২টি খনন করবে চার বিদেশি কোম্পানি, বাপেক্স করবে মাত্র দুটি। বিদেশি চার কোম্পানি হলো রাশিয়ার গ্যাসপ্রম, আজারবাইজানের সকার এক্সেল, চীনের সিনোপ্যাক ও হুয়াংহুয়া অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ইঞ্জিনিয়ারিং।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, বাপেক্সকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে যদি মনে হয় বিদেশি কোম্পানির সহায়তা নেয়া প্রয়োজন, তখন চুক্তি করা যেতে পারে। কিন্তু যেখানে বাপেক্সই বসে রয়েছে, সেখানে বহুজাতিক কোম্পানিকে কাজ দেয়াটা যৌক্তিক নয়।

সর্বশেষ ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, সরকারের ভুল পরিকল্পনার কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। এর দায় জনগণের ঘাড়ে দেয়াটা অন্যায়। বরং সঠিক পরিকল্পনা করা হলে জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি স্বস্তিতে থাকবে সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তেলের দাম কমানো হয়নি। পাশাপাশি আগের চেয়ে কম দামে তেল কিনে আগের দামেই বিদ্যুৎ বিক্রি করে যাচ্ছে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। ফলে কোনো কিছুরই সমন্বয় হচ্ছে না এই খাতে। দামের এই সমন্বয় করা খুবই জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস