দেশজুড়ে প্রিয় লেখককে স্মরণ

মিসির আলী লজিক মেনে চলেন। লজিকের বাইরে কোনো কিছু তিনি বিশ্বাস করেন না। অন্যদিকে হিমুর অবস্থান এন্টি-লজিকের দিকে। প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে নিজের মতো করে ঘটনার জন্ম দিতে হিমু পারঙ্গম। এ রকম ভাইসভার্সা ধরনের দুটো চরিত্রকে যার লেখার মাধ্যমে পাঠক চিনেছে তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ।

মঙ্গলবার ছিল ক্ষণজন্মা এই গুণী মানুষটির ৭০তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করেছেন তার ভক্তরা।

এবার চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে সপ্তমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘হুমায়ূন মেলা’। এদিন সকাল ১১টা ৫ মিনিটে হিমুপ্রেমীরা হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে উপস্থিত থেকে হলুদ বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আই-এর পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ, পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন ও মুকিত মজুমদার বাবু, আনোয়ার গ্রুপের গ্রুপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন, সিএমও একেএম সাদেক, হেড অব মার্কেটিং মোল্লা ওমর, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সৈয়দ হাসান ইমাম, ইমদাদুল হক মিলন, সাংবাদিক রেজানুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম, তানজিনা রহমান, প্রবাসী লেখক শহিদ হোসেন খোকন, প্রকাশক ফরীদ আহমেদ, মনিরুল হক ও সেলিমসহ বিভিন্ন অঙ্গনের হুমায়ূন ভক্ত ও বিশিষ্টজনরা। উন্মুক্ত মঞ্চ থেকে পরিবেশিত হয় হুমায়ূন আহমেদের লেখা গান।

‘হুমায়ূন মেলা’য় সংগীত পরিবেশন করেন ফকীর আলমগীর, রফিকুল আলম, আকরামুল হক, চন্দনা মজুমদার, কিরণ চন্দ্র রায়, আগুন, সেলিম চৌধুরী, সেরাকণ্ঠ, ক্ষুদে গানরাজ ও বাংলার গানের শিল্পীরা। হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে স্মৃতিকথা বলেন স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, চলচ্চিত্র প্রযোজক একেএম জাহাঙ্গীর খান, প্রফেসর নূরজাহান সরকারসহ উপস্থিত বিশিষ্টজরা। অনুষ্ঠানে হিমু ও রূপারা কেক কেটে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উদযাপন করেন। গান ছাড়াও অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় নৃত্য, ছিল হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের স্টলসহ অন্য সামগ্রীর স্টল এবং শিশুদের ছবি আঁকার পর্ব। সাফি ও অপু মাহফুজের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছেন আমীরুল ইসলাম ও শহিদুল আলম সাচ্চু। মেলা সরাসরি সম্প্রচার করে চ্যানেল আই ও রেডিও ভূমি। এর আগে ১২ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে হুমায়ূন আহমেদের বাসায় কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেন পরিবারের সদস্যরা।

মানবকণ্ঠের গাজীপুর প্রতিনিধিকে নুহাশ পল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, হুমায়ূন আহমেদের জম্মবার্ষিকী উপলক্ষে নুহাশ পল্লীতে ১৩ নভেম্বর প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। এ ছাড়া দিবসটি পালনের লক্ষে কেককাটা, শিল্পকর্ম প্রদর্শন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ দিনব্যাপী নানা আয়োজন ছিল।

মঙ্গলবার সকালে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন দুই ছেলে নিশাদ ও নিনিতসহ স্বজন এবং ভক্তদের নিয়ে নুহাশ পল্লীতে কেক কাটেন। এর আগে হুমায়ূন আহমেদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, কবর জিয়ারত ও আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। এদিন সকাল থেকে শীতের কুয়াশা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন হুমায়ূন ভক্তরা। সাইকেল ও বাসে চড়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমু পরিবারের সদস্যরাও এসেছেন। কবরে ফুল দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিকসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তারা।

এ সময় হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, হুমায়ূন আহমেদ আছেন গাজীপুরের এই নুহাশ পল্লীতে। হুমায়ূন আহমেদের আলো গাজীপুর আলোকিত হয়ে আছে। এক অর্থে বাংলাদেশ আলোকিত হয়ে আছে। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত আসেন যারা তারা সব সময় রাস্তার কথাটা বলেন। প্রতিবছর বর্ষায় রাস্তা ভেঙে যায়। চলাচলের খুব অসুবিধা হয়। স্বপ্নের নুহাশ পল্লী পর্যন্ত আসার রাস্তাটার দিকে যদি নজর রাখা হয়। হুমায়ূন ভক্তদের দিকে তাকিয়ে এটুকু করা উচিত। সম্প্রতি একটি বিষয় আমরা জানতে পেরেছি বন বিভাগের কিছু জায়গা নুহাশ পল্লীর ভেতর ঢুকে পড়েছে। হুমায়ূন আহমেদ জীবিত থাকাকালীন এ রকম কোনো ঘটনা আমারা শুনিনি। হুমায়ূন আহমেদ যখন জায়গাটা কিনেছেন তখন হয়তো কাগজপত্রের মধ্যে কোনো ভুল ছিল। জন্মদিন উপলক্ষে গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে তার স্মৃতি আর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষণে নুহাশ পল্লীতে জাদুঘর নির্মাণের কথা বলেন মেহের আফরোজ শাওন।

মানবকণ্ঠের নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, হিমু এবং রূপা ভক্তদের ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধায় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গতকাল নেত্রকোনায় পালিত হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন। নেত্রকোনা হিমু পাঠাগার আড্ডা’র উদ্যোগে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সাতপাই চক্ষু হাসপাতালের সামনে থেকে হলুদ পাঞ্জাবী পরিহিত হিমু আর নীল শাড়ি পরিহিত রূপা ভক্তদের বর্ণাঢ্য আনন্দ র‌্যালির শুভ উদ্বোধন করেন স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার। পরে র‌্যালিটি জেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। র‌্যালি শেষে শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় হুমায়ূন আহমেদের কর্মময় জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন নেত্রকোনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফখরুজ্জামান জুয়েল, নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব সম্পাদক শ্যামলেন্দু পাল, মহিলা পরিষদের সম্পাদক তাহেজা বেগম, শিকড়ের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান খোকন, সাংবাদিক এ কে এম আব্দুল্লাহ, হিমু পাঠাগার আড্ডার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাংবাদিক আলপনা বেগম, সাংবাদিক সুজাদুল ইসলাম ফারাস, সাইফুল্লাহ এমরান ও নাইম সুলতানা লিবন। পরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের গ্রামের বাড়ি কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নের কুতুবপুরে নিজ হাতে গড়া শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের উদ্যোগে হুমায়ূন আহমেদের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বর্ণাঢ্য আনন্দ র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ