দেব খোঁপায় তারার ফুল

‘ফুল’ মাত্র দু’অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর ব্যাপকতা বা বিশালতা পরিমাপ করা পারতপক্ষে কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। ফুল ভালোবাসে না কিংবা ফুলের গন্ধে-মুগ্ধতায় বিভোর হয় না, বোধকরি এমন মানুষের সংখ্যাও পৃথিবীতে নেই। সঙ্গত কারণে বৈচিত্র্যময় মাতোয়ারা ফুলের বর্ণিল রূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষের রয়েছে আদি ও অকৃত্রিম সম্পর্ক। ফুলের মাঝে আছে প্রেম আনন্দ বেদনার নানা ছবি। মমতা ও ভালোবাসার রঙে কাছে টানার জাদুও আছে ফুলে। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মের সব বর্ণের মানুষের কাছে ফুল মুগ্ধতা সৌন্দর্য, স্নিগ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক। এর পাপড়ির বিন্যাস, রঙের বৈচিত্র্য ও গন্ধের মাধুর্যে আমাদের মন এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠে। জন্মদিন পালন, বিবাহ, মৃতের আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, গৃহসজ্জা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও শহীদ দিবসসহ সব অনুষ্ঠানেই ফুলের প্রয়োজন হয়। ফুলের সৌরভ এক দিকে যেমন মানুষকে বিমোহিত করে তেমনি এর সৌন্দর্য প্রাকৃতিক পরিবেশকে করে তোলে আকর্ষণীয়। এ ছাড়া ফুলের স্বর্গীয় সৌন্দর্য প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে শ্রান্ত ও ক্লান্ত মানুষের মনে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরম তৃপ্তি ও অনাবিল শান্তি দেয়। দুনিয়া জোড়া মানব-মানবীর ভালোবাসার অনুষঙ্গ হিসেবে ফুল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রেম-ভালোবাসার আরেক নাম ‘ফুল’ বললেও খুব একটা অতুক্তি হবে না। প্রেমিক-প্রেমিকারা ফুল নিয়ে কত রোমান্টিকতা যে দেখিয়ে যাচ্ছে তার কোনো শেষ নেই। তারা প্রেমে বিভোর হয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা গান, কবিতা ও সুন্দর সুন্দর নান্দনিকতায় ঠাসা বাণী রচনা করে যাচ্ছে। ‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন আকাশের তারা’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল’ ইত্যাদি চিত্তকে দোলা দেয়া জনপ্রিয় গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, প্রেমিক হৃদয়ে ঝড় তোলে। এছাড়া পৃথিবীর সব ধর্মেও ফুল নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। ফুলের সৌন্দর্য ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে খুব সুন্দর ও যথার্থ একটা কথা বলেছেন পবিত্র ইসলাম ধর্মের নবী ও বিশ্ব মানবতার অগ্রদূত হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)। তিনি বলেছেন, আমার খুব আশঙ্কা হচ্ছে আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য জমিনের বরকত বন্ধ করে দেবেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন হুজুর জমিনের বরকত কী? হুজুর (সা.) বললেন, জমিনের ফুল। বাগানের কলি। উত্তপ্ত মরুর পাহাড়-পর্বত আর ধু-ধু বালির জমিনে জন্ম নেয়া নবীজীর হৃদয়ে ফুলের প্রতি ভালোবাসা আমাদের প্রতি কি ফুলের মতো মানুষ হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে না? ফুলের সৌন্দর্য মানুষকে পবিত্র হতে প্রেরণা জোগায়। তাই প্রেমময় কবির ভাষায় বলতে চাই, ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি জোটে যদি মোটে দুইটি পয়সা ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী।’
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ফুল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘরে ও ঘরের বাহিরে প্রতি মুহূর্তে ফুল আমাদের বিমোহিত করে রাখে। ঘরের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফুল অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। সৌন্দর্য পিপাসুদের হৃদয়ে যখন শিল্পীর প্রত্যাশা স্থান করে নেয়, তখন তার গৃহকোণে ছোঁয়া লাগে নান্দনিকতার। রঙে, বিন্যাসে, আসবাবে আর হোম অ্যাকসেসরিজে আসে ভিন্নতা। কখনো কখনো ঋতুর পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজ অঙ্গনে সবুজ প্রকৃতিকেও হাজির করতে চায় সে হৃদয়। ঘরের সৌন্দর্য বর্ধণে ফুল কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। ঘরে ঢোকার প্রবেশমুখে মাটির পাত্রে ভাসিয়ে দিন শাপলার কলি। সন্ধ্যে নাগাদ সবুজের পটভূমিতে পূর্ণ যৌবনা শাপলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে জুড়িয়ে যাবে চোখজোড়া। পাত্রটির চারপাশে পছন্দের আরো কিছু ইনডোর প্লান্ট ছড়িয়ে দিন। আর সেগুলোকে হাইলাইট করুন নানা রঙের আলোয়। খুব জাঁকজমক কিছু নয়, তবে এর স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে যোগ হবে বৃষ্টিভেজা আনন্দ। শুধু এন্ট্রান্সে নয়, বসার ঘরের যে কোনো কোণেও মানিয়ে যাবে শাপলা ফুলের এ সাজ। রজনীগন্ধা ফুলদানিতে সাজিয়ে নেয়া ফুলগুলোর মধ্যে বরাবরই প্রথম সারিতে। অন্দরে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে এর আবেদন আজো অটুট। রজনীগন্ধার লম্বা স্টিকগুলো সাজিয়ে রাখতে বসার ঘরের কোণই হচ্ছে আদর্শ জায়গা। একগুচ্ছ নয়, ঘরের প্রতিটি কোণে সাজিয়ে নিন সতেজ ফুলে ফুলে। দিন শেষে ক্লান্ত দেহে যে ঘরে শান্তির খোঁজ করা, সেই শোয়ার ঘরের শোভা বাড়িয়ে নিন শুভ্র সাদা পাপড়ির দোলনচাঁপায়। ফুলের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে যাবে, যদি তা সাজিয়ে রাখা হয় লম্বা বা ওভাল শেপের ক্রিস্টাল কোনো ফ্লাওয়ার ভাসে। দেখবেন এর রূপ, রং মন বুলিয়ে দেবে শান্তির পরশ; ঘরকে করবে সুবাসিত। চাইলে অর্কিডও ঝুলিয়ে দেয়া যেতে পারে শোয়ার ঘরের জানালায় কিংবা দেয়ালে। এটার একটি বাড়তি সুবিধাও আছে, অর্কিড অনেক দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। খাবার টেবিলের ঠিক মধ্যখানে একটু ইকেবানা স্টাইলে সাজানো রঙ্গন অনেক বেশি মানানসই। ফুলের সৌন্দর্য আরো জীবন্তভাবে উপস্থাপনের এ কৌশলের অংশ হিসেবে রঙ্গনের সঙ্গে যোগ করুন কয়েকটা সবুজ পাতা কিংবা ডাল। একইভাবে বসার ঘরের কোনো একটি কোণ কিংবা শোয়ার ঘরের সাইড টেবিলও সাজিয়ে নেয়া যেতে পারে রঙ্গন ফুলে।
গোলাপ, বছরজুড়ে এর প্রাচুর্য থাকলেও বৃষ্টিস্নাত গোলাপের সৌন্দর্য যেন মানুষকে আরো বেশি আবেগি করে তোলে। স্বচ্ছ কাচের ফ্লাওয়ার ভাজে একগুচ্ছ গোলাপের সৌন্দর্যের কাছে হার মানে অনেক কিছুই। তবে অন্দরসাজে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে মাটির পাত্রে ভাসিয়ে দিন অনেকগুলো গোলাপ ফুলের পাপড়ি। স্নিগ্ধ ধারার মনোরম প্রকৃতির সঙ্গে গোলাপের সুশীতল সুবাস আর নান্দনিক উপস্থাপন ঘরে নিয়ে আসবে সতেজ আমেজ। অনেকেরই আবার অভিযোগ, ফুলদানিতে ফুল খুব বেশি দিন রাখা যায় না, নষ্ট হয়ে যায়। ফুলের সুবাস দীর্ঘসময় ধরে রাখতে ফুল সাজানোর আগে পানিতে লবণ ও সিরকা মিশিয়ে নিন। বেশিক্ষণ ফুল সতেজ রাখতে এর বিকল্প এখনো যে খুঁজে পাওয়া ভার। তবে কাটার ধরনের ওপরও ফুলের স্থায়িত্ব নির্ভর করে অনেকখানি। ফুলের ডগা কাটার সময় একটু তেরছা করে কাটুন। এতে ডগার মধ্যে পানি প্রবেশ করে এবং বাতাস চলাচল করতে পারে অনায়াসেই। ফুলদানিতে ফুলের আকর্ষণীয় উপস্থাপনে এর রঙ, আকারেও ভিন্নতা থাকা চাই।
নানাবিধ বৈচিত্র্য আনতে লাল, কমলা কিংবা সাদার ওপর টানা মনোযোগ না দিয়ে একটু ব্যতিক্রমী রং যেমনÑ বেগুনি, হলুদ, হালকা গোলাপি রঙের ফুলে দৃষ্টি রাখুন। এতে বৈচিত্র্য তো আসবেই, সে সঙ্গে ঘরে ঢুকতেই ফুলের মিষ্টি সুবাসে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাবে।
আধুনিক যুগে নগরায়ন ও সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তালমিলিয়ে দেশ-বিদেশে ফুলের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফুল এখন আর শুধু সৌন্দর্য ও সৌখিনতার সামগ্রীই নয়, বরং ফুল এখন দেশের জাতীয় অর্থনীতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ, বিপণন ও ব্যবহার করছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হল্যান্ড প্রভৃতি দেশ অর্কিড রফতানি করে এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ফুল রফতানিকারক দেশ নেদারল্যান্ড টিউলিপ ফুল বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও বাণিজ্যিকভাবে অর্থকরী ফসল হিসেবে ফুল বিশেষ করে রজনীগন্ধা ও গোলাপ উৎপাদন ও বিদেশে রফতানি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ফুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গোলাপ, রজনীগন্ধা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা ও গাঁদা এ দেশের কয়েকটি জনপ্রিয় ফুল। এ দেশে নানা প্রকার মৌসুমি ফুল জন্মে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফুলের চাহিদা ব্যাপক এবং প্রতি বছর ফুলের চাহিদা বাড়ছে। সে তুলনায় সরবরাহ কম। এক তথ্যে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে আড়াই হাজার কোটি ডলার মূল্যের ফুল বেচাকেনা হয়। ফুল রফতানির দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের চেয়ে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইসরাইল ফুল রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় যে পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর আয় করে থাকে, তা বহু উন্নয়নশীল দেশের রফতানি বাণিজ্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি বছর ফুল রফতানি করে কোটি কোটি রূপী আয় করছে। তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারও বিশাল। আমাদের দেশে উৎপাদিত ফুলের আকার, রং, গন্ধ স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য আপেক্ষাকৃত উন্নত। তাই বিদেশে বাংলাদেশের ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একটু চেষ্টা করলেই বিশ্ববাজারে এ দেশের উৎপাদিত ফুল স্থান করে নিতে পারে। এ জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই প্রয়োজন। ফুলের বাণিজ্যিক চাষ ও ফুল রফতানি বাংলাদেশের রফতানি আয়কে উজ্জীবিত করতে পারে। কাজেই আমাদের দেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে ফুল উৎপাদন করে তা বিদেশে রফতানির ব্যবস্থা আরো জোরদার করা আবশ্যক। এতে এক দিকে যেমন দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে, অপর দিকে বিপুল বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আয়ের পথ সুগম হবে। যা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনেও এক বিরাট অবদান রাখবে। ম মুহাম্মদ কামাল হোসেন