দৃষ্টি এবার নিজ দলের দুর্নীতিবাজদের দিকে

এবার নিজ দল ও দলের পরিচয় ব্যবহারকারী ‘দুর্নীতিবাজদের’ বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর থেকেই এমন আলোচনা শাসক দলের ভেতরে-বাইরে। বিভিন্ন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের আমলে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগগুলোর বিচার প্রক্রিয়া জোরদার করার মাধ্যমে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করে তুলবে। এ ছাড়া সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এসব দুর্নীতিবাজের অপকর্মের দায় যেন ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলেতে না পারে বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে দলটি। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, দুর্নীতির দায়ে যখন প্রধান প্রতিপক্ষ অভিযুক্ত, তখন নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণেই দলীয় পরিচয়বাহীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে দল ও সরকারের ভাবমূতি আরো উজ্জ্বল হবে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষ্য, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলার রায় হয়েছে, তা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা। বিচারিক প্রক্রিয়ার দিক থেকে অগ্রসরমান থাকায় এই সময়ে মামলার আদেশ দিয়েছেন আদালত। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের বিগত ও চলতি সময়ে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগগুলোর বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আইন অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম শেষে এ বিষয়ে যথাযথ আদেশ আসবে। তখনই দুর্নীতির বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাদের দাবি, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের দেয়া আদেশ সব ধরনের দুর্নীতিবাজদের জন্য অশনী সংকেত। এই ধারা অব্যাহত থাকবে। কোনো দুর্নীতিবাজ বা অপরাধীকেই ছাড় দেয়া হবে না। সে যে দলেরই হোক না কেন।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দুর্নীতি যেই করুক, তিনি যতই প্রভাবশালী হোক- তাকে সাজা পেতেই হবে। দুর্নীতি করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সেটার প্রমাণ একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জেলে যাওয়া। জঙ্গি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে সরকার যেমন সফল হয়েছে। তেমনি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে সোনার বাংলা গড়তে কাজ চলছে।

একই বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম মানবকণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার কখনো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না। দেবেও না। আমাদের দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলেছেন। অতীতে যারা দুর্নীতি করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। আমাদের সরকারের আমলেই কিন্তু এমপি-মন্ত্রীকেও জেলে যেতে হয়েছে। সরকার কাউকে ছাড় দেয়নি। আইন সবার জন্য সমান। সে দলের লোক হোক বা যত প্রভাবশালীই হোক। আওয়ামী লীগ অন্যায়, দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করে না, করবেও না।

এদিকে খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর বিএনপির অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য কিছু দল ও মহলও নানা প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করছে। খালেদা জিয়ার রায়ের পর গত শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে সিপিবি-বাসদ ও বাম মোর্চার নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ যে নিছক দুর্নীতির অপরাধের জন্য, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ নেই, সে কথা প্রমাণ করতে হলে সরকারকে নিজ দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। সেখানে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন- দুই কোটি টাকার দুর্নীতির বিচার হলে হাজার হাজার কোটি টাকার বিচার কেন হচ্ছে না?

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, খালেদা জিয়ার দণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে বিএনপি। ফলে তাদেরকেই প্রমাণ করতে হবে- রায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে আদালতের। এখানে তাদের কিছু করার নেই। জনগণকে বোঝাতে হবে এখানে রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ নেই। এজন্য দলীয় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। সরকার বা দলের পরিচয় বহন করে যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের দায় আওয়ামী লীগের নেয়া উচিত হবে না বলেও মনে করেন তারা। তা না হলে নির্বাচনের বছরে ভোটের আগে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকারের মধ্যে যেসব দুর্নীতিবাদ আছে, খুব বেশি নেই, কিন্তু যারা আছে নির্বাচনের মধ্যে তাদের বাদ দিয়ে দেয়া হবে। সৎ লোক ছাড়া এমপি-মন্ত্রী হলেও তারা নমিনেশন পাবে না। সুতরাং ওই ভাবেও কিন্তু কাজটা হয়ে যাবে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে তাদের সঠিক আইনি পক্রিয়ায় বিচার হোক আমরা সেটাই চাই। দলীয় লোক বলে তাদের জন্য বিচার অন্য রকম হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার অন্তত সেটা করে না, করবেও না।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মানবকণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। দেশ সব দিক দিয়ে এগিয়ে গেছে। অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজও হয়েছে। তেমনি সবাই যে শতভাগ ভালো তা কিন্তু নয়। কিছু লোক দলীয় পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি করেছে। তবে আওয়ামী লীগ কিন্তু কাউকে একেবারে ছাড় দেয়নি। ভবিষ্যতেও দেবে না। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দু’ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক- সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ। দুই- সামনে নির্বাচন যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকবে তাদের দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে না। নির্বাচনের আগে জনগণ আমাদের ভুল বুঝুক, তা আমরা চাই না।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.