দৃশ্যমান কাজেই এখন ব্যতিব্যস্ত এমপিরা

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৬ মাস বাকি। আক্টোবর/নভেম্বরেই ভোটের তফসিল ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর পরই ভোটযুদ্ধে নামতে হবে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতার স্বাদ নেয়া আওয়ামী লীগকে। রাষ্ট্রের মালিক জনগণের সামনে হাজির হতে হবে কর্মের হিসাব-নিকাশ নিয়ে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জাতীয় সংসদে নেতৃত্বদানকারী দলটি অবশ্য এরই মধ্যে নির্বাচনকে টার্গেট করে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়ানোর উপায় বের করে নিয়েছে। পুরো মেয়াদে উন্নয়নবঞ্চিত থাকা এলাকাগুলোতেও এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধুম শুরু করে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলটির এমপিরা। বরাদ্দের সব টাকাই তারা খরচ করছেন দৃশ্যমান কাজে। বিশেষ করে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনা ও সংস্কার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন ভবন নির্মাণ করার কাজ শুরু করা হচ্ছে। আর এসব কাজ উদ্বোধনের নামে রীতিমতো জনসভা করে জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি। শেষ সময়ে এসে ভোটারদের মন জয় করতে এমপিরা সরকারের দেয়া বরাদ্দের পাশাপাশি নিজেরাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রীদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।

নির্বাচনের বছরে এমন বরাদ্দ বিষয়ে সমালোচনায় পড়েছে সরকার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এসব প্রকল্পে নির্বাচনী প্রকল্প বলেই অভিহিত করছেন। ভোটের রাজনীতি পাকাপোক্ত করা এবং এমপিদের পকেট ভারি করার কাজেই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ বলে মনে করছেন তারা। তারা বলছেন, ২০১০ সালে ৪ হাজার ৬৯১ কোটি টাকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্পে পরের ৫ বছরে ২৭৯ জন এমপি প্রত্যেকে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিলেন। কিন্তু ওই টাকায় নেয়া প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। এখন যেগুলো অনুমোদন পাচ্ছে, সেগুলো আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, এসব প্রকল্প নির্বাচনকে সামনে রেখে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রকল্পগুলো নির্বাচনে এমপিদের সহায়তা করা ছাড়া আর কোনো কাজে দেবে বলে মনে হয় না। প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতাও নেই। কারণ চাহিদামতো নলকূপ ও টয়লেট নির্মাণের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংশ্নিষ্ট বিভাগ আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে এসে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় মসজিদ-মন্দিরসহ সামাজিক, ধর্মীয় ও খেলাধুলা বিষয়ক অবকাঠামোও নির্মাণ করা হবে। এজন্য ৬৬৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পেরও অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

সূত্রমতে, সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে গৃহীত মেগা প্রকল্পে ২৩ হাজার কোটি টাকার কাজ করবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর। ৩ হাজার নতুন ভবন এবং ৩ হাজার ২৫০টি ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ২টি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ইতিমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে।

এ ছাড়াও ৩২৩টি সরকারি স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে ৪ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা এবং ২শ’ সরকারি কলেজ উন্নয়নে ব্যয় করা হবে ১ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা আর সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা, ঈদগাহ ও খেলার মাঠের উন্নয়ন হবে। সিটি কর্পোরেশন ছাড়া দেশের ৪৯১টি উপজেলায় ১ কোটি করে মোট ৪৯১ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এজন্য পরে আরো ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। এ ছাড়া পূর্ত কাজের বরাদ্দ হিসেবে ১০৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক এমপি তার নির্বাচনী এলাকায় ১০টি নতুন ভবন করতে পারবেন। এ প্রকল্পের আওতায় ৭টি ক্যাটাগরিতে ৩ হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ ও আসবাবপত্র দেয়া হবে। প্রতিটি ভবনে টানা বারান্দা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট, সুপেয় পানি, ছাত্রীদের জন্য পৃথক কমন রুম, শিক্ষকদের জন্য একটি কক্ষ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা টয়লেট ও র‌্যাম্পের ব্যবস্থা থাকবে। দেশে চারতলা ভিতবিশিষ্ট চারতলা ভবন হবে ২ হাজার ১৫০টি, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৬ তলা ভিতবিশিষ্ট ৬ তলা ভবন হবে ১শ’টি, পাহাড়ি এলাকায় ৪ তলা ভিতবিশিষ্ট ৪ তলা ভবন হবে ৫০টি, উপকূলীয় এলাকায় নিচতলা ফাঁকা রেখে ৫ তলা ভবন হবে ১৫০টি। এ ছাড়া হাওর এলাকায় ৫ তলা ভবন হবে ৫০টি, লবণাক্ত এলাকায় ৪ তলা ভিতবিশিষ্ট ভবন হবে ১৭৫টি এবং নদী ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থানান্তরযোগ্য সেমিপাকা কাঠামোয় নির্মাণ হবে ২৫টি ভবন। এসব ভবন নির্মাণ করতে ব্যয় হবে ১০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা।

এদিকে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৫টি ক্যাটাগরিতে সারাদেশে আরো ৩ হাজার ২৫০টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যমান একাডেমিক ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও আসবাবপত্র কেনার জন্য ৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ৫টি করে নতুন মাদরাসা ভবন নির্মাণের জন্যও একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। দেশে ৩২৩টি সরকারি স্কুলের জন্য ৪ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা এবং ২শ’টি সরকারি কলেজের ভবনের অবকাঠামো নির্মাণে ১ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

মসজিদ-মন্দিরের উন্নয়নেও বরাদ্দ রয়েছে এমপিদের। এ লক্ষ্যে ৬৬৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রতি উপজেলায় অন্তত ২ কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম হবে, যা পরিচালনা করবেন এমপিরা। ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ ৫ হাজার ১৮০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ১০টি প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে ৪ হাজার ৪৬২ কোটি ২৫ লাখ টাকা, সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ কোটি ৯৩ লাখ এবং প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যাবে ৬৯৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রায় ৯০৩ কোটি টাকায় বাংলাদেশের ৩শ’টি নির্বাচনী আসনে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনের বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে নির্বাচনের আগে। এমপিরা নিজের নির্বাচনী এলাকায় কোথায় কোথায় নলকূপ ও টয়লেট নির্মাণ করতে হবে, তা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরকে জানাবেন। অধিদফতর এমপিদের চাহিদামতো নলকূপ ও টয়লেট তৈরি করবে।

মানবকণ্ঠ/বিএ