দুই বছরেও অধরা হত্যাকারী

মামলার নেই কোনো অগ্রগতি : সিআইডি একে ওকে জিজ্ঞাসার নামে শুধু শুধু সময় ক্ষেপণ করছে: তনুর মা-

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার ২৪ মাস অর্থাৎ দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২০ মার্চ মঙ্গলবার। দীর্ঘ ২৪ মাসেও তনুর খুনিরা শনাক্ত হয়নি এবং মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতিও নেই। খুনি চিহ্নিত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ তনুর পরিবার এবং কুমিল্লার বিশিষ্টজনরা। তনুর পরিবার সন্দেহভাজন আসামিদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, দফায় দফায় অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসাবাদের পরিসর ছোট করে আনা হচ্ছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে বলেও তিনি জানান। তবে সোহাগী জাহান তনুর মা আনোয়ারা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সিআইডি একে ওকে জিজ্ঞাসার নামে শুধু শুধু সময় ক্ষেপণ করছে।

তনুর পরিবারের সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেনি তনু। পরে তার স্বজনরা খোঁজাখুঁজি করে রাতে বাসার অদূরে সেনানিবাসের ভেতর একটি জঙ্গলে তনুর মরদেহ পায় স্বজনরা। পরদিন তার বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ ও ডিবির পর ২০১৬ সালের পয়লা এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি কুমিল্লা। তনুর দুই দফা ময়নাতদন্তে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফরেনসিক বিভাগ মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি। শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর জামা-কাপড় থেকে নেয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। পরে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ ম্যাচিং করার কথা থাকলেও তা করা হয়েছে কিনা- এ নিয়েও সিআইডি বিস্তারিত কিছু বলছে না। সর্বশেষ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা তনুর মায়ের সন্দেহ করা আসামি বলেও সিআইডি জানায়। তবে তাদের নাম জানানো হয়নি।

এদিকে সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকা সিআইডি কার্যালয়ে বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম, চাচাত বোন লাইজু ও চাচাত ভাই মিনহাজকে দিনভর পুরনো বিষয়গুলো জিজ্ঞেস করেন ঢাকা সিআইডির কর্মকর্তারা।

গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার সংগঠক খায়রুল আনাম রায়হান জানান, তনু হত্যার মামলাটি দীর্ঘদিন সিআইডিতে পড়ে আছে, মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। সিআইডির গা-ছাড়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকারী কে জানা যাবে। সিআইডি একে ওকে জিজ্ঞাসার নামে শুধু শুধু সময় ক্ষেপণ করছে। কারণ সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে যাওয়ার পর জঙ্গলে তনুর মরদেহ পাওয়া যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডি কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, তাদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গত দুই মাস পূর্বে তনুর মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের পরে মামলার স্বার্থে পুনরায় আরো অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসাবাদের পরিসর ছোট করে আনা হচ্ছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

দুই বছরেও দেশব্যাপী আলোচিত তনু হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ নুরুর রহমান বলেন, একটি স্পর্শকাতর জায়গায় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল আর সেই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত দুই বছরেও কোনো অগ্রগতি নেই- এটা সত্যিই পীড়াদায়ক। তিনি অবিলম্বে তনু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে বলেন, তনু হত্যার বিচার না হলে দেশব্যাপী একটি নেতিবাচক বার্তা যাবে যা সত্যিই কাক্সিক্ষত নয়।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাপ্তাহিক অভিবাদন সম্পাদক আবুল হাসানাত বাবুল বলেন, বার বার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও মামলার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়াতে দেশের মানুষ আশাহত হয়েছে। অবিলম্বে তনু হত্যার বিচার শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

মানবকণ্ঠ/এসএস