দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের কৃষকদের

 ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও বাঁধের কাজ ৬০ ভাগও না হওয়ায় দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে সুনামগঞ্জের কৃষকদের। ২৮ ফেব্রুয়ারি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের সময়সীমা পেরিয়ে যায়। ফলে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ফসল রয়েছে অরক্ষিত। এতে হাওর পাড়ের কৃষকরা গত বছরের ফসল হারানোর মতো এবারো শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের দাবি জেলার ৯৬৪টি বাঁধ অর্থাৎ প্রকল্পের মধ্যে ২৫ ভাগ প্রকল্প অপ্রয়োজনীয়। সংগঠনটি ৫ মার্চ সুনামগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করে ফসল রক্ষা বাঁধের যতটুকু কাজ হয়েছে ততটুকু বিল দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষের প্রতি।

শনিবার পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ৭০ থেকে ৮১ ভাগ সম্পন্ন হওয়ার দাবি করলেও কৃষকরা বলছেন ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সুনামগঞ্জে হাওরগুলোর ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ৬০ ভাগও শেষ করতে পারেনি সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও তাদের নিযুক্ত পিআইসি কমিটি। ফলে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে ২ হাজার ৯২৪ কোটি ৬৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকার ফসল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় কৃষকরা বোরো ফসল গোলায় তোলা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদফতর জানায়, জেলায় এবার সম্ভাব্য বোরো উৎপাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৪১৪ মেট্রিক টন ধান। যার আনুমানিক মূল্য ২ হাজার ৯২৪ কোটি ৬৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

সূত্র জানায়, গত বছর প্রতিমণ ধান ৯৬০ টাকা মণ দরে প্রতি মেট্রিক টন ধান সরকার ২৪ হাজার টাকা দরে ক্রয় করে। এ হিসেবে এবার ১২ লাখ ১৯ হাজার ৪১৪ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হওয়ায় এর মূল্য পড়েছে ২ হাজার ৯২৪ কোটি ৬৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। কিন্তু সরকার গত বছরের চেয়ে এবার ধান বেশি মূল্য দিয়ে ক্রয় করলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মোট মূল্য আরো বেশি দাঁড়াবে।

সুনামগঞ্জ পাউবো সূত্র জানায়, এবার পিআইসি বিভিন্ন হাওরে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত আর ঠিকাদাররা নতুন বাঁধ তৈরি ও বাঁধ উঁচুকরণের কাজ করার কথা। কাজের নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি।

সূত্র আরো জানায়, জেলার হাওরগুলোতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য গত কয়েক বছর ধরে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ হয়নি। এবার জেলার ৪০টি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধে কাজ করার জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা। জেলার ১১টি উপজেলায় এবার ৯৪৬টি প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে।

দিরাই উপজেলার কলিয়ার কাপন গ্রামের সৈয়দুর রহমান চৌধুরী ফটিক মিয়া মানবকণ্ঠকে জানান, গত বছরের অক্টোবর থেকে ঢাকঢোল পিটিয়েও পাউবো ও তাদের নিযুক্ত প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। পিআইসি গঠনেও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের দূরভিসন্ধি। কোনো কোনো কমিটিতে নীতিমালা লঙ্ঘন করে একই পরিবারের লোকজন এমনকি হাওরে বা বাঁধ এলাকায় যাদের জমি নেই তাদেরও পিআইসিতে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আরো জানান, চাপতির হাওরের চালত থেকে কলিয়ার কাপন বাজার পর্যন্ত বাঁধের কাজ এখনো ৩৫ ভাগ হয়নি। এ বাঁধের পিআইসি দিল আমিন মানবকণ্ঠকে জানান, কাজের ওয়ার্ক ওয়ার্ডার পেয়েছেন ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে। এরপর হাওরের পানি নামতে দেরি করায় কাজ শুরু করতে দেরি হয়।

একইভাবে একই উপজেলার রাড়ইল গ্রামের ইয়াহিয়া চৌধুরী মানবকণ্ঠকে জানান, উপজেলা ৬৬ নম্বর ও ৬৬(ক) নম্বর পিআইসি কমিটি গঠন করা হয়েছে সম্পূর্ণ নীতিমালা লঙ্ঘন করে পরিবার তন্ত্রের ভিত্তিতে। ওই দু’টি কমিটি বাতিল চেয়ে প্রথমে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এতে কোনো ফল না পাওয়ায় জেলা প্রশাসক ও সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এতেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

জগন্নাথপুর উপজেরার বুরাখালী গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল মানবকণ্ঠকে জানান, গত বছর ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তার সব জমি তলিয়ে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনো রকম দিনযাপন করেছেন। এবার বুকভরা আশা নিয়ে তিনি নলুয়ার হাওরে প্রায় ৮ একর বোরো জমি চাষাবাদ করেছেন। ফসল রক্ষা বাঁধের যে গতি তা দেখে রাতে ঘুম আসে না। চোখে ঘুম এলেই গত বছরের ফসলহানির দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করে। তিনি জানান, আরো তার গ্রামের অর্থাৎ বুরাখালী খেয়াঘাটের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ এখন পর্যন্ত ৬০ ভাগ হয়েছে। একই বক্তব্য একই গ্রামের আলমগীর হোসেনের। তিনি জানান, এবার তিনি একই হাওরে প্রায় ৬ একর জমি চাষাবাদ করেছেন। ওই ফসলের ওপর পরিবারের সবার বছরের খোরাকী ও চিকিৎসা, শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করবেন। একই উপজেলার দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক হারাধন দাস মানবকণ্ঠকে জানান, তিনি এবার উপজেলার নলুয়ার হাওরে ৩ একর জমি চাষাবাদ করেছেন। গত বছর ফসল না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছেন। এবার ধারদেনা করে আবারো চাষাবাদ করেছেন। তিনি আরো জানান, দাসনোয়াগাঁও কুরেরপাড় নামক বাঁধের কাজের সময় সীমা পেরিয়ে গেলেও মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ কাজ হয়েছে। হারাধন জানান, বাঁধের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় গত বছরের ফসল হারানোর কথা মনে পড়ে যায়। রাতে ঘুমাতে পারি না। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ক্ষেতের ফসল ওই বুঝি ডুবতে বসেছে। পরিবার-পরিজনকে বলছেন, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে। তিনি জানান, এখন যেকোনো দিন বৃষ্টি হলে বাঁধের মাটি ধুয়ে-মুছে নিয়ে যেতে পারে।

তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের গোপিনাথনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক নির্মল কান্তি সরকার মানবকণ্ঠকে জানান, তার গ্রামের অর্থাৎ গোপিনাথনোয়াগাঁও সংলগ্ন দক্ষিণে অপ্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প তৈরি করে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বাঁধে প্রথমে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে ব্যয় বাড়িয়ে এ প্রকল্পে ৩২ লাখ টাকা রবাদ্দ করা হয়। এ ব্যাপারে তিনি তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক একে কুদরত পাশা মানবকণ্ঠকে জানান, তিনি দিরাইয়ের বরাম হাওর ও চাপতির হাওর পরিদর্শন করেছেন। বরাম হাওরের কাদিরপুরের বাঁধ, তুফানখালী, ভাটিধল, এবং চাপতি হাওরে বৈশাখীর বাঁধে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কাজ হয়েছে। তিনি আরো জানান, শ্রমিক দিয়ে বাঁধে কাজ করানোর কথা পিআইসিরা সেসব বাঁধেও এক্সেভেটর দিয়ে কাজ করছে। এক্সেভেটর দিয়ে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তুলে বাঁধে দেয়ায় বাঁধ নড়বড়ে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পিআইসিরা এক্সেভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিল তুলছে শ্রমিকের। কারণ এক্সেভেটরের চেয়ে শ্রমিকের মজুরি বেশি। তাই এক্সেভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিল করছে শ্রমিকের।

‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের সিনিয়র সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সফিয়ান মানবকণ্ঠকে জানান, তিনি জেলার প্রায় সব উপজেলার বাঁধগুলো পরিদর্শন করেছেন। এ পর্যন্ত গড়ে ৬৫ ভাগ বাঁধে মাটি কাটা সম্পন্ন হয়েছে। ৩৫ ভাগ বাঁধে এখনো মাটি কাটা চলছে। তিনি আরো জানান, জেলার ৯৬৪ প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ২৫ ভাগ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

এদিকে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার মানবকণ্ঠকে জানান, এ উপজেলার ৯০ ভাগ কাজ মাটিকাটা সম্পন্ন হয়েছে। এখন দুর্মুজ ও দুর্বা ঘাস লাগানোর কাজ শুরু হবে।

একইভাবে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ জানান, এ উপজেলায় ৮০ ভাগ বাঁধে মাটি কাটা সম্পন্ন হয়েছে। দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন ইকবার জানান, দৌড়ের ওপর আছি। এ উপজেলায় ৭০ ভাগ বাঁধে মাটি কাটা শেষ হয়েছে। দু’একদিনের মধ্যে বাকি বাঁধের মাটি কাটা শেষ হয়ে যাবে।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামান কামরুল মানবকণ্ঠকে জানান, এ উপজেলায় ৯৭টি পিআইসির অর্থাৎ ৯৭টি প্রকল্পের মধ্যে ৮০টি প্রকল্পে মাটি কাটা শেষ হয়েছে, ১৭টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া মানবকণ্ঠকে জানান, এবার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১৭৭ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত বরাদ্দ এসেছে ১২২ কোটি টাকা। দুই কিস্তিতে পিআইসিদের বিল দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, এবার জেলার ১১টি উপজেলায় ৯৬৪টি পিআইসি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি জানান, শনিবার পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে বাঁধের কাজ হয়েছে ৮১ ভাগ। এর মধ্যে ৬০ ভাগ বাঁধে মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে এবং ৪০ ভাগ বাঁধে মাটি কাটা শুরু হয়েছে।

তিনি আরো জানান, শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটলে প্রতি ঘনফুট ১৬৮ টাকা এবং এক্সেভেটর দিয়ে (মেশিন) মাটি কাটলে ১১৬ টাকা ঘনফুট হিসেবে বিল প্রদান করা হবে। আবু বকর আরো জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময় শেষ হলেও মন্ত্রণালয় সময়সীমা বাড়িয়ে ১৫ মার্চ পর্যন্ত করেছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাবরিুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে জানান, পিআইসি সংক্রান্ত যতগুলো অভিযোগ পড়েছে সবগুলো অভিযোগ সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে হাওরের পানি এবার দেরিতে নামায় বাঁধের কাজ শেষ করতে কিছুটা দেরি হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ