দিনশেষে দরকার পারস্পরিক সহযোগিতা

তিনঘণ্টার মিটিং শেষে মাথাটা ধরেছে মলির। কোনো কাজেই মন দিতে পারছে না। ডেস্কে হেলিয়ে পড়েছে। এটা দেখে রুনার বস ছুটি দিয়ে দিলেন। কিন্তু রুনার চোখ ছানাবড়া। কিসের ছুটি? বাড়িতে ঢুকলেই তো রাজ্যের কাজ স্বাগতম জানাবে। মলির ভাবনাই যেন বাস্তবে রূপ নিল। ঘরে ঢুকে দেখল মাসুদ চলে এসেছে। মাসুদ মলির স্বামী। মলির অসুস্থতাকে পাত্তা না দিয়েই মাসুদ একের পর এক অর্ডার করা শুরু করল। কিন্তু কথা হচ্ছে ঘরের কাজ শুধু মলির? আর্থিকভাবেও তো মলি সংসারে কন্ট্রিবিউট করছে! আসলে সমস্যা মাসুদেরও না। সমস্যা সমাজের। সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। বদলে যাক এসব প্রতিকূল দৃষ্টিভঙ্গি। দিনশেষে ফিরে আসুক পারস্পারিক সহযোগিতা।
অনেক পুরুষ আছেন যারা মনে করেন, ঘরের কাজ শুধু নারীদের জন্যই! এই প্রথা সেই আদিকাল থেকেই চলে আসছে। কিছু পুরুষ এই ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছেন ঠিকই। কিন্তু পরিবার, সমাজের অজুহাত দেখিয়ে নারীর কাঁধেই ঘরের সব কাজ চাপিয়ে দেয়া হয়। পুরুষদের মধ্যেও সামাজিকভাবে সমালোচিত হওয়ার ভয় থাকে। ঘরের কাজ করলে মানুষ কী বলবে!
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাকুলিন স্কট ও তার দল ৩৪টি দেশের ৩০ হাজার মানুষের ওপর এ সংক্রান্ত একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইলের অনলাইন সংস্করণে জরিপের ফলাফল নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যেসব পুরুষ ঘরের কাজে তাদের স্ত্রীদের সাহায্য করে তারা অনেক বেশি রোমান্টিক হয় এবং তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়! জরিপে আরো দেখা গেছে, আজকাল ঘরের কাজ করতে চায় না এমন মনমানসিকতার পুরুষদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এর একটা প্রধান কারণ হতে পারে চাকরি!
যেসব ঘরে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করে তারা ঘরে ফিরে একে অন্যের কাজ ভাগাভাগি করে নেয়। বিশেষ করে পুরুষরা সাংসরিক কাজে আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহায্য করছে। পুরুষরা সচরাচর রান্না করা, বাসন পরিষ্কার বা কাপড় ধোয়া একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু তারাই এই ধরনের কাজ করতে আগ্রহী হয় যারা দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে চায়।
শহুরে জীবনে নারী-পুরুষ উভয়কেই কাজ করতে হয়। যদি তারা সচ্ছল জীবনযাপন করতে চায়। এ ক্ষেত্রে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা স্বাবলম্বী হয়ে থাকে। এ কারণে পুরুষরাও তাদের ওপর কাজ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে না বরং তারা নারীদের কাজে অনেক বেশি সাহায্য করতে চায়। ঘরের কাজে সাহায্য করার মাধ্যমেই দাম্পত্য মনোমালিন্য এড়িয়ে চলা যায়। কারণ পুরুষরা যখন ঘরের কাজে সাহায্য করতে ক্রমাগত অনীহা প্রকাশ করে তখন নারীদের মধ্যেও এক ধরনের বিরক্তি চলে আসে।
দিন শেষে সঙ্গীর সঙ্গে যদি ভালো কিছু সময় পার করতে চান এবং সংসারের অশান্তি থেকে দূরে রাখতে চান তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করুন।
একজন সংসারের কর্ত্রী যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন অচল হয়ে পড়ে তার সংসারটিও অথচ তিনি যখন সুস্থ থাকেন দশভুজা হয়ে তাকেই ঘরের কাজ সামাল দিতে হয়। তা তিনি করতে পারেন কিংবা করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠেন। অনেক সময় দেখা যায়, তাকে সাহায্য করার জন্য কেউই থাকে না। এমনকি ছুটির দিনগুলোতে সব কাজ গৃহকর্ত্রীকে একাই করতে হয়। তাকে যে সাহায্য করতে হবে এ ভাবনাটাই অনেকের মধ্যে নেই। স্ত্রীই সব দিন রান্না করবেন, ঘর গোছাবেন-এটি আমরা ধরে নিই। তার স্বামীও তো একদিন তাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে পারেন। দেখবেন তিনি কত খুশি হন আবার সন্তানরাও দেখা গেল ছুটির দিনে মাকে সাহায্য করল বা বাবার সঙ্গে মিলে কোনো কিছু রান্না করে মাকে অবাক করে দিল। শুধু মাঝে মধ্যে ঘরের কাজ করে মাকে কিংবা স্ত্রীকে খুশি করা তো আছেই। সেই সঙ্গে প্রতিদিন যদি ঘরের কাজ ভাগাভাগি করে নেই তাহলে মায়ের এবং স্ত্রীর কষ্ট লাঘব হয় অনেকখানি। এতে একটা সুন্দর পারিবারিক সম্পর্ক বিরাজ করে পরিবারে।
শৈশব-কৈশোর থেকে ঘরের কাজে সন্তানদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়ার বিষয়ে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিশু বর্ধন এবং পারিবারিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফাতেমা সুরাইয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বাসার কাজে সহযোগিতা করা শেখাতে হবে। কারণ এখনকার বেশিরভাগ শিশুই কাজের লোকের ওপর নির্ভরশীল আবার মা-বাবা অনেক বেশি আদর দিয়ে এটা বোঝান যে, তাদের কাজ করার কোনো দরকার নেই। ফলে ছোটবেলা থেকেই তারা কোনো কাজ করা শেখে না। কাজ শিখলে শিশু যে শুধু আনন্দই পাবে তা নয়, এতে মা-বাবার সঙ্গে তার বোঝাপড়াও ভালো হবে। একসঙ্গে সময় কাটাতে পারবে। – নারী ডেস্ক