দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা কারো দানে পাওয়া নয়

দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা কারো দানে পাওয়া নয়

কবির সেই বিখ্যাত কথা দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দামে পাওয়া নয়। সেই দাম দিয়ে কেনা বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক দিন আজ। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অভিষিক্ত। একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য নির্ভয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়ার প্রথম ইতিহাস সৃষ্টির দিন। ’৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে আত্মোত্সর্গের নজির সৃষ্টি করে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারেরা। ১৯৫২-২০১৯ ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬৭ বছরে এসেও অহঙ্কারের দিনটিকে নিয়ে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সেই সময়ের ভাষা সৈনিকেরা। তাদের কারো মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ আছে ভাষা আন্দোলনের প্রাপ্তি নিয়ে, আবার কেউ স্বপ্ন দেখছেন তরুণরাই অদূর ভবিষ্যতে একুশের চেতনাকে যথার্থ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক, মোর্তাজা বশির, ভাষাসৈনিক ড. এনামুল হক, ভাষাসৈনিক আব্দুল গফুর।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন সত্ত্বেও আমি হতাশ: আহমদ রফিক
২১ শে ফেব্রুয়ারির ৬৭ বছরে অনুভূতি ব্যক্ত করতে বলায় আহমদ রফিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক কথায় হতাশ। নিঃসন্দেহে বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন ২১ শে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু আমরা যে একুশের চেতনার কথা বলি, তা ৬৭ বছরেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ’৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিটি দিন ৩টি স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছিল ঢাকার রাজপথ। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, সর্বস্তরের বাংলাভাষার প্রচলন চাই। এখন বুঝতে পেরেছেন আমার হতাশার জায়গা কোথায়? আদালতে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দাপটের সঙ্গে ইংরেজির ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। আমাদের ত্রিমুখী শিক্ষা মাধ্যম। প্রথমে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে কিন্ডার গার্টেনে ইংরেজি শিক্ষা মাধ্যমের দাপট খুবই স্পষ্ট। দ্বিতীয় মাধ্যটি হচ্ছে দেশের সব মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরবি ভাষায় শিক্ষার প্রভাব যথেষ্ট। এই দুই মাধ্যম শিক্ষার পাশাপাশি হচ্ছে আমার অবহেলিত বাংলা ভাষা। এখনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি দাফতরিক কাজে বাংলার ব্যবহারকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। যদিও আমাদের ’৭২-এর সংবিধানে রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা। সর্বস্তরের বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য এখনো আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাভাষা নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু ভাষার যত্ন করি না : আব্দুল গফুর
ভাষা আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দুন মজলিশের অন্যতম সদস্য ভাষাসৈনিক আব্দুল গফুর। প্রথমে এ বিষয় নিয়ে কথা বলতেই চাননি। অনেক অনুরোধের পর মন্তব্য করলেন, যে ভাষার জন্য আমার ভাইয়েরা বুকের রক্ত দিয়েছে। আমরা লড়াই-সংগ্রাম করেছি সেই বাংলাভাষা নিয়ে আমরা গর্ব করি কিন্তু যত্ন করি না। তিনি আরো বলেন, ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য আমাদের লড়াই করাটা ভুল ছিল না। কিন্তু ৬৭ বছর পরেও এসেও সেই একই লড়াই করতে হবে ভাবলে মন ভারাক্রান্ত হতে হয়। একবার চিন্তা করে দেখ, শহরের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মা ডাকে অভ্যস্ত না হয়ে মাম্মি বলে ডাকছে। এর দায়ভার কে নেবে? দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের উচিত নিজের মাতৃভাষার বাংলার প্রতি আরো যত্নবান হতে হবে। তাহলেই দেখবে ইংরেজি ভাষায় বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ছাপানোটাকে আর সামাজিক মর্যাদাবান বলে মনে হবে না।

বরকতের রক্তে আমার কাপড় লাল হয়ে গিয়েছিল : মুর্তজা বশির
বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯ বছরের কিশোর মুর্তজা বশীর ৭৯ বেগম বাজারের ‘পিয়ারা হাউস’ থেকে বের হয়েছিলেন পরিবারের মুরব্বিদের নিষেধ অমান্য করে এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া বললেন তিনি। তিনি আরো জানান, ২০ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৪৪ ধারা ভাঙবে, মিছিল করে প্রতিবাদ করবে। একমাত্র দাবি, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে উত্তেজনা, আন্দোলনের সলতে জ্বলতে শুরু করেছে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষার দাবিতে অটল ছাত্র-জনতা কী সিদ্ধান্ত নেবে- কখন কী হয় এমন অস্থির অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বারণ করা হয়েছিল সেদিন বাইরে যেতে। কিন্তু অসুখী সেই তরুণটি মানলেন না, বাড়ির বাইরে বের হলেন। দুপুর হওয়ার খানিকটা আগে দেখা হলো কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তারা দুজনে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাকের পাশে আন্দোলন এবং তাদের আসন্ন চিত্রপ্রদর্শনী নিয়ে আলাপ করছিলেন, তখন পুরো এলাকা থমথমে। একটু আগে ছোড়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাসের শেল। কয়েকটি শেলের খোসা এদিক-সেদিক ঘাসের ওপর শুয়ে আছে। আন্দাজ করা যায় না এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় কাঁটাতারের ওপারে অনেক পুলিশ। একজন অফিসার হাত নেড়ে ছাত্রদের ডাকছেন। কয়েকজন ছাত্র এগিয়ে গেল। হঠাত্ গুলির শব্দ। দৌড়ে পালাতে লাগল সবাই। চারদিকে আতঙ্ক। মুর্তজা বশীরের চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে এসব। আত্মরক্ষার জন্য সবাই খুঁজছে নিরাপদ আশ্রয়। ব্যারাকের দক্ষিণ দিকে চলমান ভিড় দেখে তিনি দৌড়ে এগিয়ে গেলেন। তার ভাষায়, ‘বেশ লম্বা, শ্যামবর্ণ, মুখমণ্ডল পরিষ্কারভাবে কামানো, সারা চেহারায় বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় ভরে যাওয়া ঘাম আর প্যান্টের পেটের নিচ থেকে কলের মতো অঝোরে রক্তের ঢল। সবার সঙ্গে আমিও তাকে ধরেছি। আমার সাদা পায়জামায় কে যেন আবিরের রং পিচকিরি দিয়ে রাঙিয়ে দিল। আমি তাকে ধরেছি বুকের কাছে। আমার মাথা তার মুখের কাছে। সে চোখ তুলে তাকাল।…আমার বাড়িতে খবর দেবেন, আমার নাম আবুল বরকত…।’

পৃথিবীতে ভাষার ইতিহাসের প্রথম শহীদ আবুল বরকত শুকনো জিব বের করে বললেন, ‘পানি, পানি।’ বুলেটবিদ্ধ তাকে সতীর্থরা ধরে নিয়ে যাচ্ছেন মেডিকেলে। বশীরও তাকে বুকের কাছে জাপটে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। দ্বিধান্বিত হয়ে পকেটে রাখা ঘাম মোছার রুমাল বের করে নিংড়িয়ে তার মুখে দিয়ে কিছুটা তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা করলেন।
বাংলাভাষার সঠিক ব্যবহার নিয়ে আমাদের মধ্যে হতাশা আছে, ক্ষোভ আছে।

বরকতের সেই কণ্ঠ আমার নাম ‘আবুল বরকত ’ প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে তাড়া করে। ৬৭ বছর ধরে আমি এই ইতিহাস বলতে কখনো ক্লান্ত হই না। বরং উজ্জীবিত হই। আশান্বিত হই।

ইতিহাসের অংশীদার ছিলাম আমিও : ড. এনামুল হক
আমার মনে হয়নি জিন্নাহ রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন। যদি পড়ে থাকতেন এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আমি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে দশম শ্রেণির ছাত্র। মার্চ মাসে আমাদের মেট্রিক পরীক্ষা। তখন আমি বগুড়ায় থাকি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সারাদেশের মতো বগুড়াতেও ছাত্র জনতারা মিটিং-মিছিলে ব্যস্ত থাকত। পড়াশোনায় মন ছিল না। প্রতিদিন আমিও যেতাম মিছিলে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির ঢাকায় ঘটে যাওয়ার কথা আমরা জেনেছিলাম রাতে। পরের দিন ২২ তারিখ বগুড়ায় মিছিল সমাবেশ হয়। সকাল ১১টায় প্রতিবাদ মিছিল পুরো বগুড়া শহর প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে আন্দোলনকে আরো বেগবান করার জন্য আমাদের বড় ভাইয়েরা একটি আহ্বায়ক কমিটি করে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেই কমিটিতে ৩ নম্বর সদস্য হিসেবে থাকার। কয়েকদিন পর পাকিস্তানি পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। ’৫২-এর ২১ শে ফেব্রুয়ারির জন্যই আজকে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। তরুণরা বুকের রক্ত দিয়ে বাংলাকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তরুণরাই আমাদের স্বাধীনতা এনেছিল।

মানবনণ্ঠ/এসএস