দাম কমে শুধু চামড়ার

দাম কমে শুধু চামড়ার

গত এক দশকে গরু ও খামারির মাংসের দাম বাড়লেও আনুপাতিক হারে চামড়ার দাম বাড়েনি বরং গত ছয় বছরে চামড়ার মূল্য কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০১৩ সালে কোরবানির সময় গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল, প্রতি বর্গফুট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ছিল প্রায় ১ ডলার ৫ সেন্ট, যা ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ ডলার ১৪ সেন্ট। কিন্তু সে বছর দেশে চামড়া কেনা হয়েছে প্রতিবর্গফুটে ১৫ টাকা কমে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। আর ৫ বছর পর এবারের ঈদে লবণযুক্ত প্রতিবর্গফুট গরুর চামড়া ঢাকায় কেনা হবে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়, যা ঢাকার বাইরে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ হয়েছে প্রতিবর্গফুটে ১৮ থেকে ২০ টাকা। আর বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। অর্থাৎ গত ৬ বছরে সরকারিভাবে চামড়ার দাম কমানো হয়েছে প্রায় অর্ধেকে। সবকিছুরই দাম বাড়ে, বাড়ে না শুধু পশুর চামড়ার দাম। কোরবানির ঈদের চামড়া বিক্রির টাকা পায় মূলত গরিব দুঃখী মানুষ। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে প্রতিবছরই চামড়ার দাম কমানো হচ্ছে। চামড়ার দাম যে হারে কমছে, সে হারে চামড়াজাত পণ্যের দাম কমা উচিৎ ছিল। বাস্তবতা কিন্তু পুরো উল্টো। যদিও ট্যানারি মালিকদের দাবি, শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের কারণেই দেশে চামড়ার দাম কমেনি। এর পিছনে অন্যতম কারণটি হচ্ছে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প পার্কে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে গোটা চামড়া শিল্প একটা সংকটের মধ্যে পড়েছে। গত বছর কোরবানিতে যে চামড়া কেনা হয়েছে, তার ৪০ শতাংশ এখনো ট্যানারিতে মজুদ আছে। এছাড়াও নতুন শিল্পপার্কে এখনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি চালু না হওয়ার পরও সাভার ট্যানারি শিল্প চালু করায় ক্রেতাগোষ্ঠী ইউরোপীয় ইউনিয়ন অসন্তুষ্ট। অসন্তুষ্টের কারণে পণ্য কেনা বন্ধ হয়নি। বিদেশি বায়াররা চাপ অব্যাহত রেখেছেন, যেন অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে বর্জ্য শোধনাগার চালু করা হয়। এ কারণে ১৫৫টি ট্যানারি শিল্প কিন্তু বন্ধ হয়নি বরং জোরেসোরেই চালু করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে কম দামে কাঁচামাল কিনতে পারলে বেশি মুনাফা করতে পারবে, এটাই বাস্তবতা।

আমরাও আশাবাদী, হাজারীবাগের সংকুচিত স্থানে সনাতন পদ্ধতির শিল্প নিয়ে ট্যানারি মালিকদের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকাও কঠিন ছিল। এখন সাভার শিল্প নগরীতে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা বেড়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অনাগ্রহও ছিল প্রবল। এখন বিদেশি ক্রেতারাও সন্তুষ্ট। সব মিলে চামড়া খাতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উšে§াচিত হয়েছে। আমরা আশাবাদী, পোশাক খাত, প্রবাসী আয়ের খাতের মতো চামড়া খাতও বড় ধরনের অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এখন দেশের অর্থনীতি অনেকটাই সমৃদ্ধ। প্রবৃদ্ধির উচ্চ ধারাও অব্যাহত রয়েছে। আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের চামড়ার মানও উন্নত। চামড়াজাত পণ্যের মানও ভালো। আমরা আশাবাদি, ট্যানারি শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল চামড়ার যোগান দেশীয় ভাবেই মেটানো সম্ভব হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ পশু জবাই হয়। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি জবাই হয় কোরবানির ঈদে। কিছুদিন আগেও প্রতিবেশি দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে পশু না আসলে মাংস ও চামড়ার জোগান দেশীয় ভাবে দেয়া সম্ভব ছিল না। আজ কিন্তু সে দিন অতীত হয়েছে। এখন দেশেই কর্মক্ষম শিক্ষিত অনেক যুবক গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। এই খামারগুলোতে যে পরিমাণ গরু লালন পালন করা হয়, যা দিয়ে কোরবানির চাহিদার পুরো গরু দেশীয়ভাবে পাওয়া সম্ভব। এক তথ্যে জানা গেছে, এ বছর দেশের বাইরে থেকে গরু এসেছে মাত্র ৪ হাজার। অথচ আগের বছরও বর্তমান সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি গরু এসেছিল। সেহেতু দেশীয় খামারিদের গরুর উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং সেহেতু বিদেশ থেকে গরু আসার সব ধরনের সুযোগ বন্ধ করে দিতে হবে। যদি খামারিরা গরুর চাষ করে মুনাফা করতে পারে, তাহলে এ ব্যবসায় অনেকেই ঢুকে পড়বে। আর যদি উপযুক্ত মূল্যের অভাবে খামারিরা লোকসান গোনে, তাহলে অনেক খামার সংকুচিত হয়ে যাবে এবং নতুন করে খামারের ব্যবসায় কেউ এগিয়ে আসবে না। বাধ্য হয়েই আমিষের যোগান ও চামড়ার যোগানের স্বার্থে গরু ও চামড়া আমদানি বেড়ে যাবে। কারণ চাহিদার পণ্য ভোক্তাদের স্বার্থে আমদানি করা ছাড়া গতন্তর থাকবে না। বিশেষ করে দেশীয় ট্যানারি শিল্পের জন্য যে পরিমাণ চামড়ার প্রয়োজন হয়, তা দেশীয়ভাবে মেটানো সম্ভব না হলে আমদানির কোনো বিকল্প থাকবে না। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ট্যানারি এ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হচ্ছে। সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে সব ট্যানারি স্থানান্তর হলে উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে চার গুণেরও বেশি হবে। এখন চামড়া শিল্পনগরীতে আধুনিক ক্যাপিটাল মেশিনারিজ স্থাপন করা হচ্ছে এ জন্য যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া প্রয়োজন হবে, তা দেশীয় গবাদিপশু থেকে পাওয়া সহজ হবে না। আশংকা করা হচ্ছে, এ অবস্থায় কাঁচা চামড়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে।

প্রকৃত অর্থে বাস্তবতা হচ্ছে, দেশীয় বাজারে কোরবানীর চামড়ার মূল্য টানা ৬ বছর ধরেই কমে আসছে। গত বছর যেখানে গরুর প্রতিবর্গফুট চামড়ার মূল্যছিল ঢাকায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪৫ থেকে ৪০ টাকা। আর খাসির চামড়ার মূল্য ছিল ২২ টাকা থেকে ২০ টাকা ঢাকার অভ্যন্তরে। আর ঢাকার বাইরে ১৭ টাকা থেকে ১৫ টাকা। সেখানে এ বছর গরুর চামড়ায় কমানো হয়েছে প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা, আর খাসির চামড়ায় ২ টাকা। এটা কোন ভাবেই ভাল আলামত নয়। যা গত ৬ বছর আগেও ছিল ৮৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা। সমীক্ষা করলে দেখা যায়, পশুর চামড়ার দাম অব্যাবত ভাবেই কমে আসছে। যা আগেই বলেছি। তাহলে দেশীয় ভাবে চামড়া উৎপাদন বাড়বে কি ভাবে? অব্যাহত ভাবে দাম কমার কারণে প্রতিবছরই কোরবানির চামড়ার একটি অংশ নানা কৌশলে প্রতিবেশি দেশ ভারতে পাচার হয়। কারণ যখন দেশীয়ভাবে চামড়ার দাম কমে আসে, তখন বেশি দামের আশায় ফাঁক ফোকর গলে ভারতে চামড়া পাচার হয়ে থাকে। বিশেষ করে কোরবানির সময় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানির চামড়ার ব্যবসা করে থাকে। অনেক সময়ই সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের টাকায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে লবণ মিশ্রিত করে মজুদ করে। যা পরে সুবিধাজনক সময়ে প্রতিবেশি দেশে পাচার করে দেয়। যদিও পাচার ঠেকাতে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা ভাবে উদ্যোগ নিয়ে থাকে। তারপরও সময় সুযোগের সদব্যবহার করে দেশীয় চামড়া বিদেশে পাচার হয়ে থাকে। এই পাচার রোধ করতে না পারলে তিনগুণ উৎপাদন ক্ষমতার ট্যানারি শিল্পনগরী সাভারের চাহিদার পুরো কাঁচামাল পাওয়া সম্ভব হবে না। তখন সরকারকে দেশীয় শিল্পের উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার স্বার্থে সহজ শর্তেই কাঁচা চামড়া আমদানির সুযোগ দিতে হবে, এটাই বাস্তবতা। অথচ যৌক্তিক পর্যায়ে চামড়ার মূল্য নির্ধারিত হলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চামড়া দিয়েই নিজস্ব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ জন্য সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ট্যানারিমালিকদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। কিন্তু দেখা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মূল্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও বাদ সাধে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। ফলে উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খামারি ও সাধারণ গরুর মালিকরা। আমাদের বিশ্বাস, সরকার ও ট্যানারিমালিকরা সমঝোতার ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে নিকট ভবিষ্যতে চামড়া খাতও রফতানি আয়ে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
লেখক: কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস