দখলে দূষণে বিষময় কর্ণফুলী

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, বীর প্রসবিনী, স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনাকারিণী, চির যৌবনা, চির চঞ্চলা চট্টলার বুক চিরে বয়ে গেছে যে অপরূপ ধারা নাম তার কর্ণফুলী। ভারতের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের বুক চিরে পতেঙ্গার কাছ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে কর্ণফুলী। উৎস থেকে নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২০ কিলেমিটার।

অপ্রিয় হলেও সত্য, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদী কর্ণফুলী এখন দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৫শ’ টন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে কর্ণফুলী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। আর তার প্রাকৃতিক প্রমাণ কর্ণফুলী নদী থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ।

বাংলাদেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নদীকেন্দ্রিক। শিল্প, সাহিত্য, নগর, বন্দর ও গ্রামই মানববসতি নদী তীরবর্তী। ব-দ্বীপ আকৃতির এ ভূখণ্ডে ছোট-বড় ২৩০ নদ-নদী প্রবাহমান। ফলে এই নদীর মোহনাতেই বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর অবস্থিত। এ ছাড়াও গড়ে উঠেছে শত শত ঘরবাড়ি ও শিল্প কারখানা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২শ’টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ভয়াবহভাবে তাদের বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে নিক্ষেপ করে। এগুলোর মধ্যে ১৯টি ট্যানারি, ২৬টি টেক্সটাইল মিল, ২টি রাসায়নিক কারখানা, ৪টি সাবান ফ্যাক্টরি. ২টি তেল শোধনাগার, ৫টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও চন্দ্রঘোনা পেপার মিল অন্যতম।

শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশনই প্রতিদিন ৭৬০ থেকে ৮০০ টন বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে ফেলে। ১৯৫৩ সালে কর্ণফুলী পেপার মিল প্রতিষ্ঠার পর থেকে উৎপাদন চলাকালীন প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১শ’ টন তরল রাসায়নিক বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে ফেলা হচ্ছে।

মিল-কারখানার এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে সায়ানাইড, ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিনসহ নানা ধরনের এসিড, দস্তা, নিকেল, ফসফোজিপসাম, সিসা, ক্যাডমিয়াম, লোহা, অ্যালকালির মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য।

পরিবেশবাদী সংগঠনের মতে, বর্তমানে নদী তীরবর্তী শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর কোনোটিরই বর্জ্য শোধনাগার নেই। আর কর্ণফুলী নদী দূষণের জন্য এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানই দায়ী। সময়ের পরিবর্তনে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে এখন প্রায় ৮০ লাখ মানুষের বসবাস। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নদী তীরবর্তী অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ এরই মধ্যে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

এ ছাড়াও নদী তীরবর্তী ১০-১২টি শিল্পকারখানা ও একটি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত দূষিত রাসায়নিক বর্জ্যে কর্ণফুলী নদীর পানির ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে দূষিত হওয়ার পাশাপাশি এর নাব্য হ্রাস পেয়ে এখন মানুষের জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে। ভূমিদস্যুদর কালো থাবায় ছোট হয়ে আসছে লুসাই কন্যা কর্ণফুলীর আয়তন। বর্তমানে এ নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রাখায় এর নাব্য হ্রাস পাচ্ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতিধারা। কর্ণফুলী নদীর কাপ্তাই থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত দীর্ঘ নদী পথের দু’তীরের ভূমি ও চর দখল হচ্ছে প্রকাশ্য ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে। রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী পশ্চিম পটিয়া, নগরীর মোহরা, পশ্চিম কালুরঘাট, বাংলাবাজার, জলিলগঞ্জ, ফিরিঙ্গী বাজার ও ব্রিজঘাট এলাকায় কর্ণফুলী দখল হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

নদীর ওপর অত্যাচার ও দখলের ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মতো মরে যেতে পারে কর্ণফুলীও। আর তা থেকে মুক্তি পেতে কর্ণফুলীকে দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে এবং সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস