দখলমুক্ত হচ্ছে না রাজধানীর ফুটপাত

কোনোভাবেই দখলমুক্ত হচ্ছে না রাজধানীর ফুটপাত। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হলেও দু’-এক দিনের মধ্যেই আবার ফিরে যাচ্ছে পুরনো চিত্রে। অথচ নগরবাসীর নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের সুবিধার্থে ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল এই ফুটপাত। রাস্তার বেহালদশা আর দীর্ঘ যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই। নগরীর ফুটপাতগুলো দখল করে চলছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আবার সেই রাস্তার অধিকাংশ দখল করে বসানো হচ্ছে গাড়ির গ্যারেজ ও টার্মিনাল। এ অবস্থায় নগরবিদরা বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নগরপিতাদেরই বের করতে হবে স্থায়ী সমাধান।

আবু ইউসুফ নামে পুলিশের এক কর্মকর্তার মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে কোনো দিনই ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব হবে না। সব সময়ই সরকারদলীয় প্রভাবশালীরা টাকার বিনিময়ে ফুটপাত দখল করে ভাড়া দিচ্ছে। মূলত তাদের পকেটেই যাচ্ছে ফুটপাতের চাঁদাবাজির টাকা। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এসব টাকার ভাগ পায় না বলে তিনি দাবি করেন।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নগরীর ২১৮ কিলোমিটার ফুটপাতের মধ্যে ১০৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ফুটপাতই প্রভাবশালীদের দখলে। এ ছাড়া নগরীর ২ হাজার ২৮৯ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৫৭২ দশমিক ৪২ কিলোমিটারে বসানো হয় পণ্যের পসরা।

অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাত থেকে কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। পুলিশ থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা এই চাঁদার ভাগ পেয়ে থাকেন।সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালায় তেজগাঁও থানা পুলিশ। এরপর পুলিশের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আপস করে কিছু কিছু দোকানি পুনরায় তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা টাকা দিতে পারছেন না, তাদেরকে এখনো বসতে দেয়া হয়নি।

টাকা দিয়ে ফুটপাতে দোকান বসিয়ে ব্যবসা করেন- এমন বেশ কয়েক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানভেদে ফুটপাতের পজিশন বিক্রি হয়েছে ৮-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বেশিরভাগ পজিশন বিক্রি হয় ১০ হাজারে। টাকা দিতে হয় ভ্যানগাড়ি বা ভ্রাম্যমাণ দোকানিদেরও। ফুটপাতের এক দোকানি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রসাশনের লোকদেরকেও টাকা দিতে হয়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কেবল ফুটপাত নয়, নগরীর রাস্তার প্রায় পুরোটাই হকারদের দখলে। ফলমূল, শাক-সবজি শাড়ি-চুড়ি কি নেই! ধাক্কা খেতে খেতে এর মধ্যেই চলতে হচ্ছে পথচারীদের। বুধবার গুলিস্তান এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্টেডিয়ামপ্রান্ত থেকে ফুলবাড়িয়া এলাকার সংযোগ সড়কগুলো হকারদের দখলে চলে গেছে। কয়েকটি সড়কে দখল দারিত্বের মাত্রা এমনই যে, সেখানে রিকশা বা গাড়ি চলা তো দূরের কথা, হেঁটে পার হতেও হিমশিম খেতে হয়।

যাত্রীবাহী ও মালবাহী যানবাহনের অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গুলিস্তান অংশের সড়কে এখন আর অন্য বাহন চলাচলের উপায় নেই। সংযোগ সড়কগুলোর এই দশার কারণে গুলিস্তানে অস্বস্তিকর যানজট লেগেই থাকে। অথচ এই গুলিস্তানেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কার্যালয়, ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতর রয়েছে। সেই সঙ্গে তৈরি পোশাক, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি বাজার থাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষকে গুলিস্তানে আসতে হয় এবং পোহাতে হয় ভোগান্তি। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দিনভর যানজট লাঘবের চেষ্টা করতে দেখা গেলেও বেদখল রাস্তা নিয়ে তারা নির্বিকার। হকারদের দাপটে যান চলাচলের জায়গা নেই রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চ থেকে গোলাপশাহ মাজারমুখী সংযোগ সড়কে। একই পরিস্থিতি দেখা গেল একটু দক্ষিণে নবাবপুর রোড থেকে ফুলবাড়িয়া যাওয়ার সংযোগ সড়কটিতে। ওপরে ফ্লাইওভার, নিচে হকারদের দখলে পুরোরাস্তা।

ফুলবাড়িয়া থেকে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে বঙ্গবাজারে যাওয়ার সড়কটি পরিণত হয়েছে মহানগর ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলাচলকারী বাসের ‘গ্যারেজে’। সেখানে গাড়ি রেখে কলকব্জা খুলে মেরামত চলে। চালক ও তাদের সহকারীরা বাস থামিয়ে বিশ্রাম নেন। গতকাল ওই সড়কে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-ধামরাই রুটের ঢাকা পরিবহন, শুভযাত্রা পরিবহন, গ্রামীণ সেবা, গাজীপুর রুটে গাজীপুর পরিবহন, প্রভাতী বনশ্রী পরিবহন, গোপালগঞ্জ রুটের মধুমতি পরিবহন, ইমাদ পরিবহনের অর্ধশতাধিক বাস সড়ক আটকে দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে অনেকগুলোরই চলছে মেরামতের কাজ। পুরানা পল্টন মোড় থেকে দৈনিক বাংলার মোড় হয়ে একেবারে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত পথের দক্ষিণ পাশের ফুটপাত জুড়ে পোশাক, ফল, জুতা, ব্যাগের পসরা। আর উত্তরপাশের পসরা শুরু হয়েছে পুরনো বই দিয়ে। তারপর ফলের দোকান। নাম প্রকাশন করে এখানকার আরেক বিক্রেতা জানান, প্রায় ২৫-৩০ বছর থেকে তিনি ব্যবসা করছেন এখানে। পুরনো ব্যবসায়ী বলে তাকে কোনো লাইন ফি দিতে হয় না। মাসে শুধু বিদ্যুতের খরচ দিতে হয় ৫০০ টাকা। কিছু দূরের এক ফল বিক্রেতা জানান, তার লাইন ফি দৈনিক ৫০ টাকা।

মিরপুরের ১ নম্বর থেকে শুরু করে ১০ নম্বর গোল চক্কর থেকে পল্লবী পর্যন্ত এলাকার পুরো সড়কের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন দোকানিরা। আজিজ সুপার মার্কেট থেকে এলিফ্যান্ট রোডের সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পর্যন্ত সড়কের দু’ধারই এখন ফুটপাত বাণিজ্যের দখলে। সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড় থেকে দক্ষিণে ঢাকা কলেজ হয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত সড়কটির ফুটপাতে আছে এক সারি দোকান, আবার ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়ক দখল করে আছে আরেক সারি দোকান। গাউছিয়া থেকে এলিফ্যান্ট রোডের ভেতরের সড়কটিতে গেলে বোঝাই যায় না ফুটপাত বাদে এখানে কোনো সড়ক আছে। অবৈধ গাড়ি পার্কিং ও ফুটপাত দখলের কারণে রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। মালিবাগ সুপার মার্কেট থেকে খিলগাঁও খিদমা হাসপাতাল পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে প্রতিদিন সারিবদ্ধভাবে পার্ক করে রাখা হচ্ছে প্রায় অর্ধশতাধিক বাস। এ ছাড়া রাস্তার ফুটপাতে অবৈধভাবে দোকানপাট বসায় পথচারীদেরও পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়।

সরেজমিনে মালিবাগ এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মালিবাগ এলাকায় সোহাগ পরিবহনের দুই বাস কাউন্টার ও একটি বাস ডিপো রয়েছে। এ ছাড়া ঈগল ও শ্যামলী পরিবহনের রয়েছে একটি করে কাউন্টার। খিলগাঁও খিদমা হাসপাতালের সামনে রয়েছে বাহন ও হিমাচল পরিবহনের দুটি কাউন্টার। যেখান থেকে মিরপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বাস দুটি। সোহাগ পরিবহনের বাসগুলো ডিপোতে থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ বাসই রাস্তায় পার্ক করা হয়েছে। রাস্তায়ই বাসগুলো ধোয়া-মোছা ও মেরামত করা হচ্ছে। রাস্তার অধিকাংশ দখল করে পার্কিংয়ের ফলে ওই রাস্তায় একটি করে যাত্রীবাহী বাসই চলাচল করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে বিভিন্ন দোকানপাট। এ ছাড়া শত শত রিকশা-ভ্যানও পার্ক করে রাখা হয়েছে ফুটপাতে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজটের। স্থানীয় প্রশাসন যেন দেখেও না দেখার ভান করে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই রাস্তা দখল করে পার্কিং করা হচ্ছে বাসগুলো।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। আমরা আদালতের নির্দেশ মতো ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কাজ করছি। বিভিন্ন সময়ের উচ্ছেদ অভিযানের পরক্ষণেই তা আবার দখল হয়ে যাচ্ছে কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সাঈদ খোকন বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর আবার দখল হয়ে যাচ্ছে এটা ঠিক। এ জন্য দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ। আমরা অবশ্যই চেষ্টা করছি এর সমাধান কীভাবে করা যায়।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.