ত্রাণ বিতরণ ও ফটোসেশন

ত্রাণ বিতরণ ও ফটোসেশন

বন্যায় কিংবা বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া ও তাদের তরে ত্রাণ বিতরণ- ভালো কাজ। বানভাসি মানুষের কাছে যখন অনেককে দাঁড়ানোর ছবি দেখি ফেসবুকে কিংবা পত্রিকার পাতায়- ভালোই লাগে। জাকাতের টাকা বা দ্রব্য বিতরণ উপলক্ষে কিংবা সাধারণভাবে মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া- অন্য কথায় দান-খয়রাত করা খুবই ভালো কাজ। সেই ত্রাণ বিতরণ, সহযোগিতা বা দান-খয়রাতের ছবি উঠানো, সেই ছবি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করায় হয়তো আরো অনেকে উৎসাহিত হয় ভালো ও কল্যাণকর কাজে। এদিক থেকে এটা অবশ্যই ভালো। কিন্তু তার চাইতেও ভালো হচ্ছে ছবি না উঠানো কিংবা কোথাও প্রকাশ বা আপলোড না করা। ছবি দিলে যেসব সমস্যা হয়। যারা সহযোগিতা পাচ্ছে সেই গ্রহীতা বা মুখাপেক্ষী মানুষগুলোর চেহারা প্রকাশ করে প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে খাটো করা হয়। তাদের অসহায় চেহারা ফুটিয়ে তুলে তাদেরকে এক ধরনের অপমান করা হয়। অনেক দানগ্রহীতা ব্যক্তিকে মানসিকভাবে বিব্রত হতে হয়। অনেক গরিব-অসহায় মানুষ আছে, যারা চরম অভাবের মধ্যেও আত্মসম্মানবোধ নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়। কিছু সহযোগিতা বা ত্রাণ সামগ্রী গ্রহণ করতে গিয়ে সমাজের কাছে তাদের চেহারা উন্মোচন করতে চায় না। ফলে সম্মান রক্ষা করার ভয়ে তারা ত্রাণ-সহযোগিতা গ্রহণ না করে আরো বেশি কষ্ট সহ্য করাকে মেনে নেয়। ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ বা দান-খয়রাত গোপনে করা অনেক ভালো। ঢাক-ডোল পিটিয়ে না করাই উত্তম। প্রকাশ্য সহযোগিতা প্রদানে কখনো কখনো আত্মঅহমিকা প্রকাশ হতে পারে। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে অনেকের ক্ষেত্রে হচ্ছেও। এতে পাপও হয়। ইসলামে প্রকাশ্য ও গোপন উভয় দান বা সদকাকে উৎসাহিত করা হলেও গোপনে দেয়াকে উত্তম বলা হয়েছে। আর প্রকাশ্যে দিলেও সেটা যাতে প্রদর্শনের ইচ্ছা বা আত্মপ্রচারের নিমিত্তে না হয়।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়- ত্রাণ সামগ্রী, সহযোগিতা বা জাকাতের দ্রব্য বিতরণ করতে দরিদ্র লোকগুলোর সঙ্গে যেন এক ধরনের তামাশায় লিপ্ত হন সাহায্যকারীরা। আত্মপ্রচারের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন কেউ কেউ। ত্রাণ দেয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে বানভাসি কিংবা দুর্যোগে-দুর্দিনে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষগুলোকে। কখন যে নেতা আসবেন আর মিডিয়ায় হাইলাইট করে প্রচার করা হবে। এই যে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে যে পরিমাণ সাহায্য করা হয়; তা ঐ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার মজুরিও হয় না কোনো কোনো সময়। লোক দেখানো সাহায্য-সহযোগিতা অনুচিত। সমাজে এখন এই অনুচিত কাজের উদাহরণ কি কম? এই সমাজে আজ আয়োজন করেই সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রবণতা বেশি। আচ্ছা! আয়োজন ছাড়া কি সহযোগিতার হাত বাড়ানো যায় না? হƒদয়-মন দিয়ে কি নিদারুণ কষ্টে থাকা মানুষগুলোকে ভালোবাসা যায় না? এতে দানের মহিমা ছড়িয়ে আত্মপ্রচারই মুখ্য হয়ে ওঠে অনেক সময়। এমনকি আয়োজনগুলোতে বিশৃঙ্খলার কারণে মাঝে মাঝে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। প্রাণ পর্যন্ত দিতে হয় ত্রাণ বা সাহায্য গ্রহীতা অসহায় লোকজনকে। জাকাত বা জাকাতের দ্রব্য বিতরণের সময় পদদলনে নিহত হওয়ার ঘটনা, এমনকি ৩৫/৪০ পর্যন্ত, বাংলাদেশে প্রায়ই ঘটে। এ বছরও বাদ যায়নি। পদদলনের মৃত্যুর ঘটনা ইতোমধ্যে একাধিকবার প্রত্যক্ষ করা হয়ে গেছে।

১৯৮০ সাল থেকে গত ৩৮ বছরে এ রকম ঘটনার শিকার হয়ে ইতোমধ্যে দুইশ’র মতো অসহায় গরিব মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অসহায় মানুষগুলোর মৃত্যুর কোনোই মূল্য নেই। যেহেতু ফেসবুকে ছবি আপলোড করা বর্তমান সময়ে একটা ট্রাডিশনে পরিণত হয়ে গেছে, আরো বিভিন্ন কারণে ছবি উঠাতে হয় অথবা পত্রিকায় ছাপাতে হয়; সেক্ষেত্রে এক কাজ করা যায়- ছবিতে ত্রাণগ্রহীতা বা ঐ গরিব মানুষগুলোর ছবি না দিয়ে গ্রহীতা ছাড়া শুধু ত্রাণ বিতরণকারীদের ছবি দেয়া যেতে পারে। ত্রাণ সামগ্রীর ছবি কিংবা ত্রাণ সামগ্রী সামনে রেখে ত্রাণ গ্রহীতা ছাড়া অন্যদের ছবি দেয়া যেতে পারে। বন্যায় বা অন্য কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের ছবি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু ত্রাণ বা সহযোগিতা গ্রহীতার ছবি না দেয়াই উত্তম। এনজিওগুলোর ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে বিভিন্ন দৃশ্যের ছবি উঠানো কোনো কোনো এনজিও বাধ্যতামূলক করে দেয়। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাও বিভিন্ন সময় ত্রাণ পাঠায়। এসব ত্রাণ জনপ্রতিনিধি বা অন্য কারো মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এক্ষেত্রেও ছবি উঠানো ওদের কারো কারো পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়ে থাকে। এই বাধ্যতামূলক করা আমাদের জন্যই লজ্জাস্কর। কারণ, আস্থার জায়গাটি আমরা হারিয়ে ফেলেছি বহু আগে। ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাতে আমাদের জুড়ি নেই। গরিবের জন্য প্রেরিত সাহায্যতে আমরা বড় অঙ্কের ভাগই বসিয়ে থাকি। যাহোক, এমন পরিস্থিতিতে না হয় কিছু ছবি উঠানোই হলো। এই ছবি ওদের কাছে জমাও দেয়া হলো। কিন্তু এগুলো ব্যাপকহারে ফেসবুকে বা অন্য কোনো সামাজিক নেটওয়ার্কে আপলোড করে দরিদ্র মানুষগুলোকে আরেকটু খাটো না করাই ভালো।

মূলধারার পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়া অনেক ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করলেও কোনো কোনো ছবি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। এমনকি নাম-পরিচয় প্রকাশ করা থেকেও। যেমন ধর্ষণের শিকার ধর্ষিতার ছবি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করা হয় না। নাম-পরিচয় দেয়া হয় না। দুর্ঘটনায় নিহত বিকৃত লাশ প্রকাশ করা হয় না। অন্য কোনো দুর্যোগের ভয়াবহতা প্রকাশ করা হলেও বিকৃত, বিধ্বস্ত কিংবা অমানবিক কোনো ছবি প্রকাশ করা হয় না। বন্যায় বা অন্য কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষগুলোর ত্রাণ গ্রহণের ছবিও প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে পারে পত্র-পত্রিকা। ত্রাণ বিতরণের সংবাদের পাশাপাশি ত্রাণ সামগ্রী বা এসব সামগ্রী বিতরণকারীদের ছবি প্রকাশ করতে পারে পত্র-পত্রিকা; কিন্তু গ্রহীতার চেহারা নয়।
লেখক : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এসএস