তুমিও পারবে

নারী ডেস্ক :
এটা কোনো শোভাযাত্রার দৃশ্য নয়। প্রতিদিনের ঘটনা। তারা দুরন্ত সাইকেল বালিকা। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও চিরিরবন্দর বেলতুলি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বাইসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসা করে। এতে এলাকায় এক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। দিনাজপুর প্রতিনিধি সুলতান মাহমুদের সহযোগিতায় এখানকার সার্বিক চিত্র উঠে এসেছে।
চিরিরবন্দরের প্রায় চার শতাধিক মেয়েরা বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করে। এক সময় এই দৃশ্য ছিল সমালোচনার মূল বিষয়, তাদের চরিত্র নিয়েও উঠত নানা আলোচনা। কিন্তু এখন? এই দৃশ্য যেন ডাল-ভাত। সেসব আলোচনা-সমালোচনাকে জয় করতে পেরেছে তারা। বর্তমানে শুধু স্কুল-কলেজ নয় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জায়গাতেও বাইসাইকেলে যাতায়াত করছে মেয়েরা। দিনদিন বাড়ছে তাদের সংখ্যা। থামছে সমালোচনার ঢেউ!
আগে অভিভাবকরা যাতায়াতের অসুবিধার কথা ভেবে দূরের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের ভর্তি করতে চাইত না। এখন সে ধারণা পাল্টেছে। মেয়েরাও সব প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।
চিরিরবন্দর কারেন্ট হাট এলাকার আবুল হোসেন নামের এক অভিভাবক বলেন, আগে আমার মেয়েকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে পৌঁছে দিতে হতো। যেদিন আমি যেতে পারতাম না সেদিন ওর স্কুল মিস হতো। কোনো দিন ছুটির পর আমি সময়মতো স্কুলে পৌঁছতে না পারলে আমার মেয়ে চিন্তায় পড়ে যেত। আমাদের মতো নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য প্রতিদিন রিকশা ভাড়া করাও সম্ভব হয় না। কিন্তু বাইসাইকেল কিনে দেয়ার পর আমি চিন্তামুক্ত হয়েছি।
সুরভী আক্তার ও শাহনাজ পারভীন নামের দুই শিক্ষার্থী জানায়, ‘আমরা ৬ কিলোমিটার দূর থেকে চিরিরবন্দর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যাতায়াত করি। প্রচুর বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশায় শুধু সমস্যা হয়। এমনিতে স্কুলের পোশাক থাকায় রাস্তাঘাটে কোনো সমস্যা হয় না। প্রধান শিক্ষক স্যার প্রায়ই রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে টহল দেন।’
তানিয়া আক্তার ও বিল্পবী রানীও এই স্কুলে পড়াশোনা করছে তাদের কথাগুলোও ঠিক একরকম তারা জানায়, আমার বাবা অত্যন্ত গরিব। স্কুলে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন ভ্যান ভাড়া দিতে পারত না। আমি উপবৃত্তির টাকা ও টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে একটি বাইসাইকেল কিনেছি। এখন আমি প্রতিদিন সাইকেলে করে স্কুলে যাতায়াত করতে পারছি। এতে আমার লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
চিরিরবন্দর উপজেলাসহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক মেয়ে প্রতিদিন বাইসাইকেলে যাতায়াত করছে। চিরিরবন্দর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী রিমি আকতার ও অনন্যা আফরিন পড়ছে দশম শ্রেণীতে। তারা জানায়, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণে আমরা ৮ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রাজাপুর গ্রামের শেষপ্রান্ত থেকে গত ৫ বছর বাইসাইকেলে করে যাতায়াত করছি। তারা আরও জানায়, পথে প্রতিনিয়ত বখাটে ছেলেরা আমাদের সাইকেলের পিছু নেয় ও বিভিন্ন অশ্লীল কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি করায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। একই অভিযোগ করেন প্রায় প্রতিটি মেয়ে শিক্ষার্থী।
চিরিরবন্দর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহতাব উদ্দিন সরকার জানান, ‘ছাত্রীদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ওই সময়টাতে পুলিশ প্রশাসনের কর্তারা টহল জোরদার করলে বখাটেদের উপদ্রব কমে যেতে পারে।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. গোলাম রব্বানী জানান, ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি বন্ধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আরও জানান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ব্যাপারে নির্দেশনা না থাকায় কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। সরকারি নির্দেশনা পেলে আমরা তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।