তীর্থস্থানের শহর আজমির-পুশকার

সালেহ আফজাল :
আজমির আর পুশকার। ভারতের রাজস্থানের দুটি পবিত্র শহর। ভারতের প্রধান দুটি ধর্মের পবিত্রস্থান। আজমির মুসলমানদের জন্য আর পুশকার হিন্দুদের জন্য। ইতিহাস-ঐতিহ্যের শহর আজমির আর পুশকারের বাড়তি পাওনা স্বাস্থ্যকর স্থান। রাজস্থানের দার্জিলিং বলা যায় পুশকারকে। জলাধার আর পাহাড়ে-ঘেরা এ তীর্থস্থান দুটিটে ঘুরতে ভালোই লাগবে। একঘেয়ে জীবনযাত্রায় মানুষ যখন হাঁপিয়ে ওঠেন, তখন তার অন্তত কিছু সময়ের জন্য একটু আরাম, একটু বিরাম, একটু শান্তির খোঁজে বেরিয়ে পড়েন সৃষ্টিকর্তার অপরূপময় সৃষ্টির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য। যাওয়া যায় রাজস্থানের আজমিরে। একদিকে মরুভূমি, অন্যদিকে প্রায় ন্যাড়া পাহাড়-পর্বত, জঙ্গল, স্থাপত্য, পুরাকৃর্তি ইত্যাদি। পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য রয়েছে সব ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত সম্ভার। আজমিরের কোনো স্থানেই কখনই একঘেয়ে লাগে না। আজমির থেকে পুশকারে যেতে ১১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।
চারিদিকে পাহাড় আর পাহাড়। ভ্যালির ওই পাশে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। স্বর্গীয় দৃশ্যের দেখা মেলে অতি পরিচিত এক শহর, যার নাম আজমির। ভারতের রাজস্থানের এক পবিত্র শহর। সেখানে আরো আছে আজমির শরিফ। এই শহরটি নানা দিক থেকে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হয়। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগার কারণে এমনিতেই বিখ্যাত এই শহর। অনেকেই এ শহরের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়টা জানেন না। এর চারপাশে আপনি কেবল প্রকৃতির অপূর্ব রূপ দেখতে পারবেন। আপনি দেখতে পারেন ‘তারাগর ফোর্ট’। বিস্ময়ে মুগ্ধ হতে হয় তারাগর ফোর্ট দেখে। পাহাড়ের ওপর নির্মিত প্রাচীন এই ফোর্টটি দেখে অনেকটা গ্রিক সভ্যতার
কথা মনে পড়ে যায়। এই ফোর্টটির কারুকার্য সত্যিই বিস্ময়কর।
এছাড়া দেখতে পারেন ‘আকবর ফোর্ট’। আজমির শহরে অবস্থিত এই ফোর্টটি মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে। এটি বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে রয়েছে বেশকিছু নিদর্শন। প্রবেশমূল্য বিদেশিদের জন্য ৫০ রুপি।
রাজ চৌহানের দাদা রাজা আনাজি চৌহান আনা সাগর লেকটি নির্মাণ করেন যা আজমিরের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। একবেলায় ঘুরে দেখা যাবে আজমির থেকে অল্পদূরের পুশকার। ঐতিহাসিক থর মরুভূমি দেখা যায় এখান থেকে। এটি ভারতের প্রাচীন শহরের একটি। আজমির থেকে পুশকারকে পৃথক করেছে নাগ পাহাড়। থর মরুভূমির একেবারে ধারে অবস্থিত পুশকার। আজমির বাস স্টেশন থেকে এ স্বল্পপথ যেতে দারুণ রোমাঞ্চ জাগাবে। পাহাড়-কাটা সুড়ঙ্গপথ দিয়ে আর নাগ পাহাড়শ্রেণি, একটু দূরের থর মরুভূমির দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন এ ছোট্ট ও স্বাস্থ্যকর স্থানে। সেখানকার ঘাট থেকে কোনো একটা ক্যাফেতে গেলেও দারুণ অনুভূতি হবে। মিথ অনুযায়ী, সতীর মৃত্যুর পর শোকাতুর মহাদেবের চোখ নিঃসৃত জল থেকে এই হ্রদের সৃষ্টি। মহাভারত আর রামায়ণেও তীর্থ স্থান হিসেবে উল্লেখ আছে পুশকারের নাম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এখানকার প্রধান আকর্ষণ বিরল ব্রহ্মা মন্দির। জানা যায়, এটি তৈরি করা হয়েছিল সেই ১৪শ’ শতকে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মন্দিরটি ২ হাজার বছরের পুরনো। শুধু পুরনো বলেই যে এটা মানুষ দেখতে যায় তা নয়, প্রাচীন সভ্যতার রোমাঞ্চকর অনুভূতি, সৌন্দর্য আর স্থাপত্যকলার দেখা মেলে। আরো দেখা যাবে সাবিত্রি মন্দির। এটা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। সেখান থেকে ভ্যালির অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার বিষয়টিও আপনাকে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেবে। সেখানে যাওয়ার রোপওয়ে আছে। ওটা দিয়ে মাত্র ৬ মিনিটেই পৌঁছানো যায়।
আরো দেখতে পারবেন পুশকার লেক। এই লেকে ৫২টি ঘাট রয়েছে। কার্তিক পূর্ণিমাতে মোহনীয় রূপ ধারণ করে। রাজস্থানের থর মরুভূমিতে তিন দিকে পাহাড় ঘেরা পুশকার শহরটা অনেকটা মরুময় প্রান্তরে মরুদ্যানের মতো। মাঝখানে বিশাল এক হ্রদ। মূলত এই হ্রদটার নামই পুশকার।
প্রতি বছর অক্টোবর থেকে বিশ্বের বৃহত্তম উটের মেলা বসে পুশকারে। অন্তত ৪০০ মন্দির আছে হ্রদটিকে ঘিরে।
কীভাবে যাওয়া যাবে: ঢাকা থেকে বাস অথবা বিমান যোগে কলকাতা। কলকাতা থেকে বিমান অথবা ট্রেন যোগে আজমির। শিয়ালদহ থেকে প্রতিদিন রাত ১১টা ০৫ মিনিটে শিয়ালদহ-আজমির সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস (১২৯৮৭) ছাড়ে। আমি এটাতেই গেছি দু’বার। ভারতের সুফারফাস্ট ট্রেনের সার্ভিস ভালো। ১৬৪৭ কিমি. পথে এ ট্রেনের স্টপেজ-সংখ্যা মাত্র ১৯টি। সিডিউল মোতাবেক মোট সময় লাগে ২৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। ক্লাস/অনলাইন ভেদে ভাড়া শুরু ১১০০ টাকা থেকে ৩৮০০ টাকা। মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র এই ট্রেন সপ্তাহে প্রতিদিন যাতায়াত করে। তাছাড়া সময় কম এবং অন্যান্য ট্রেনের তুলনায় ভাড়া কম লাগে বলে এই ট্রেনের টিকিটের চাহিদা প্রচুর।
এছাড়া কলকাতা-আজমির সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস (১৯৬০৭) প্রতি সপ্তাহে শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার চিতপুর স্টেশন থেকে সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে, সাঁতরাগাছি-আজমির সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস (১৮০০৯) সপ্তাহে শুক্রবার সাঁতরাগাছি স্টেশন থেকে দুপুর ০১টায়, সারে জাঁহা সে আচ্ছা এক্সপ্রেস (১৯৪১৪) সপ্তাহে শনিবার চিতপুর স্টেশন থেকে দুপুর ০১টা ১০ মিনিটে, অনন্যা এক্সপ্রেস (১২৩১৫) সপ্তাহে শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার চিতপুর স্টেশন থেকে দুপুর ০১টা ১০ মিনিটে আজমিরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এসব ট্রেনই সরাসরি আজমির যায়। হাওড়া থেকে বা অন্য গাড়িতে আগ্রা/জয়পুর নেমে ট্রেন বদল করতে হয়।
কোথায় থাকবেন : আজমির শরীফ মাজারের আশপাশে আপনার পছন্দমতো যে কোনো এলাকায় বিভিন্ন মূল্যমানের হোটেলে থাকা ও খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন। অথবা খাদেমদের বাড়িতে বিনামূল্যে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে প্রচুর বাঙালি আছে।
ঐ দেখা যায় নাগ পাহাড় (পুশকার থেকে)
ন্যাড়া পাহাড় পুষ্কর-আজমিরের পথে পথে
রাজস্থানি নৃত্য ও উট (পথে পথে)

Leave a Reply

Your email address will not be published.