তিস্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি নেই

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়, জঙ্গিবাদ দমন ও সন্ত্রাসী হস্তান্তর নিয়ে অগ্রগতি থাকলেও তিস্তা জট সহসাই খুলছে না। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভারতের হস্তক্ষেপের ব্যাপারেও স্পষ্ট কোনো অঙ্গীকার পাওয়া যায়নি এই সফরে। যদিও শান্তিনিকেতনে শুক্রবার এক মঞ্চেই উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তাদের মধ্যে আলাদাভাবে একান্ত বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাটকীয় কিছুই হলো না। একদিকে শেখ হাসিনাও তিস্তা নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলেননি, অন্যদিকে মোদির মুখেও ছিল না রোহিঙ্গা ইস্যু। তবে আলোচনায় ছিল নির্বাচনী হাওয়া।

কূটনীতিকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে তিস্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি আমরা দেখছি না। তেমন অগ্রগতি হলে সেটি কোনো না কোনো পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হতো। এই সফরের নীরবতাই প্রমাণ করে আসলে কোনো অগ্রগিত নেই। কারণ, তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে এখনো নমনীয় হননি মমতা ব্যানার্জি। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতেও ভারত তার আগের অবস্থান পরিবর্তন করেনি বা করতে পারবে না কৌশলগত কারণে। এছাড়া দু’দেশের এ বছর জাতীয় নির্বাচন। তাই নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে এমন সিদ্ধান্ত নেবে না মোদি সরকার। ফলে তিস্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থানে এখনই বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা করা ঠিক হবে না।

দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার তারিক করিম মানবকণ্ঠকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে আলোচনার উল্লেখযোগ্য কোনো এজেন্ডা ছিল না। তবে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তিস্তা চুক্তি এবং রোহিঙ্গা ইস্যুটি আলোচনা হয়নি, এটা ধারণা করা ঠিক হবে না। আমরা মনে করি এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সুস্পষ্ট কোনো অগ্রগতি হয়নি। কারণ, অনেক আলোচনার অন্তরালে কী ঘটে তার জনসমক্ষে বলা হয় না।

তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে সমঝোতা জনসমক্ষে হয় না। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এবং মমতার সঙ্গে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে তা তারাই জানেন। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন না সাবেক এই কূটনীতিক। তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি দেরি হলেও অভিন্ন নদীর বেসিনভিত্তিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত দু’দেশের।

এদিকে এই সফরে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি এবং মমতার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠক নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যু আজও অমীমাংসিত।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশকে এই ইস্যুটি সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি এখন পর্যন্ত ব্যর্থ। শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের পর শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে বহু সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিছু সমস্যা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, তবে আমি সেসব বিষয় তুলে এই সুন্দর অনুষ্ঠানকে ম্লান করতে চাই না। কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই বার্তা দেয়ার একটি দারুণ উদাহরণ এটি। তিস্তা শব্দটি উচ্চারণ না করেও তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুটি তুলেছেন শেখ হাসিনা। তবে রোহিঙ্গা শব্দটি বারবার এসেছে তার মুখে।

তিনি বলেছেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। আমাদের দুই দেশকে অবশ্যই মিয়ানমারকে তাদের ফিরিয়ে নিতে বলতে হবে।

ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, মোদির সঙ্গে বৈঠকে হাসিনা জানিয়েছেন দিয়েছেন অনেক, প্রতিদানে এবার ভারতের সহযোগিতা চান। শুক্রবার শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠকে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের পর সেখানেই মোদির সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা জানান, তার সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জঙ্গিদের দেশছাড়া করেছে, ট্রানজিট দিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বরাবর দিল্লি পাশে থেকেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের বছরে এবার তাই ভারতের সহযোগিতা চায়।

আনন্দবাজার আরো বলেছে, মোদির সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি কী বলবেন, উপদেষ্টাদের সঙ্গে আগেই আলোচনা সেরে এসেছিলেন শেখ হাসিনা। তার দফতরের এক সূত্র জানান, হাসিনার বার্তা মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে সরাতে, বাংলাদেশকে ফের পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত চলছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে পশ্চিমে আর পূর্বে দুই দিকেই পাকিস্তান নিয়ে ঘর করতে হবে ভারতকে। তাই ভারতের উচিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারই যাতে ক্ষমতায় ফেরে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

মানবকণ্ঠ/বিএ