তিল ধারণের ঠাঁই নেই

তিল ধারণের ঠাঁই নেই

গায়ের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে শোকের প্রতীক কালো রঙে অ আ ক খ বর্ণমালার উল্কি আর মুখাবয়বে অঙ্কিত ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’র স্লোগান। এমনি শোকাভয় দৃশ্য ধারণ করে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ অথবা ‘মোদের গৌরব মোদের আশা/আ মরি বাংলা ভাষা’ গাইতে গাইতে চারদিক থেকে স্রোতের মতো মানুষ আসতে থাকে শহীদ মিনারে। আর প্রভাতফেরি শেষ করে প্রায় সবাই ছুটে আসছে বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। বাংলা একাডেমি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত রাস্তা একাকার মানুষের পদচারণায়। ভাষাপ্রেমীদের ভিড়ে ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই।

এমন দৃশ্যপটই লক্ষ্য করা গেছে গতকাল গ্রন্থমেলার ২১তম দিনে। সকাল ৮টায় মেলার প্রবেশদ্বার খোলার পর থেকেই লোকসমাগম বাড়তে থাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সকালের সূর্যটার তেজ যতই বাড়তে থাকে মেলার লোক সমাগমও বাড়তে থাকে। আর বিকেলে সেই ভিড় রূপ নেয় জনসমুদ্রে। এদিন প্রতিটি স্টলের বিক্রয়কর্মীরা বিকিকিনিতে দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছিলেন না। প্রকাশকরা বিক্রি নিয়ে ছিলেন সন্তুষ্ট। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এদিনের মেলায় আগতদের মাঝে ছিল বিষাদের ছায়া। শহীদ মিনারের ফুলের গন্ধের সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসছিল চকবাজারের মানুষ পোড়া গন্ধ। আর সেই বিষাদের কারণে মেলার পরিবেশটাও ভারি হয়ে উঠে।

সরজমিনে মেলা ঘুরে দেখা যায়, একুশের শোক আর শ্রদ্ধায় প্রায় সবার পরনেই ছিল সাদাকালো পোশাক। একুশের দিনে মেলায় আগতদের মার্জিত পরিপাটি পোশাকে আছে একুশের স্পষ্ট ছাপ। বর্ণমালা স্থান পেয়েছে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের পোশাকে। সাদা আর কালো রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি-ফতুয়ায় যেমন ফুটে উঠেছে ভাষাশহীদদের হারানোর ব্যথা, ঠিক তেমনিভাবে বিভিন্ন রঙের বড় বড় অ আ ক খ বর্ণগুলো জানান দিচ্ছে আমাদের মাতৃভাষার গৌরবময় ইতিহাস। অনেকে আবার লাল শাড়িও পরেছেন। আর তরুণীদের মাথায় আছে ফুলের টায়রা। কেউ কেউ রঙ-তুলির আচড়ে হাতে, গালে এঁকেছেন বাংলা বর্ণমালার নানা অক্ষর। কেউবা গালে অঙ্কন করেছেন শুধুই ২১। বাদ যায়নি ছোট ছোট শিশুরাও। তাদের গালে-কপালে আঁকা জাতীয় পতাকা ও শহীদ মিনারের প্রতীক।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামকে বাদ দিলে ভাষা আন্দোলনই বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে অনেকে আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের চেয়ে ভাষা আন্দোলনকেই জাতির ইতিহাসে বড় ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ’৫২ না আসলে ’৭১-এর স্বাধীনতা আসত কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বরং ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনই বাঙালিদের মধ্যে আলাদা জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটেছিল। আর যার চূড়ান্ত রূপ পায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। এ কারণে অনেকেই ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে বর্ণনা করছেন। স্বাধীনতার পর থেকে ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক বাংলা একাডেমির এ বই মেলার আয়োজন শুরু হলেও এখন এটি একটি জাতীয় মেলার রূপ ছাড়িয়ে বিশ্ব মেলায় পরিণত হয়েছে। প্রকাশকরা বলছেন, পৃথিবীর কোথাও এত দীর্ঘস্থায়ী এবং এত লোক সমাগমের বই মেলা আর হয় না। এবার এ মেলার ঠিক আগ মুহূর্তেই দেশে একটি বড় ট্র্যাজেডির ঘটনা ঘটলেও মানুষ ভাষাশহীদদের সম্মান করতে কার্পণ্য করেনি। যদিও লোক সমাগম কিছুটা কম ছিল তবুও লাখো মানুষের উপস্থিতি মেলাকে দিয়েছিল প্রত্যাশিত রূপই।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে এসেছিলেন উন্নয়নকর্মী স্বর্ণালী আক্তার। পরেছিলেন কালো পাড়ের সাদা শাড়ি। শহীদ মিনারে বন্ধুদের সঙ্গে ফুল দিয়ে সরাসরি ঢুকেছেন মেলায়। কিনেছেন কয়েকটি কবিতা আর গল্পের বই। তিনি বলেন, বইমেলা আর ২১ ফেব্রুয়ারি মিশে আছে আমাদের চেতনার সঙ্গে। শহীদ মিনারে আসব আর মেলায় যাব এটা কি হয়।

নতুন বই: গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ৩৯৬টি। আর গত ২১ দিনে মোট বই এসেছে ৩ হাজার ৩৬৩টি। এর মধ্যে গল্প ৫৪৭, উপন্যাস ৫১৩, প্রবন্ধ ১৯০, কাব্যগ্রন্থ ১০৭৫, গবেষণা ৫৩, ছড়া ৮১, জীবনী ১১৭, রচনাবলী ৭, মুক্তিযুদ্ধ ৮৪, নাটক ৩১, বিজ্ঞান ৬১, ভ্রমণ ৬৯, ইতিহাস।

মানবকণ্ঠ/এসএস