তিন হেভিওয়েট প্রার্থী

নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে এবার অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের কৃষকদের মধ্যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এক্ষেত্রে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা দল বিএনপিও পিছিয়ে নেই। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে ছুটে গিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে।

হবিগঞ্জ-৩, সংসদীয় আসন ২৪১। হবিগঞ্জ সদর, লাখাই ও প্রস্তাবিত শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-৩ আসন। ঈদের পর থেকেই এ আসনে ভোটের উৎসব শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের ঈদ শুভেচ্ছার পাশাপাশি স্বশরীরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে নিজেদের তুলে ধরছেন। পূজামণ্ডপসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সরব উপস্থিতিতে জানান দিচ্ছেন নিজেদের প্রার্থিতা। এ আসনের বর্তমান এমপি আলহাজ অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের মাঝে। তবে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত বিএনপিও। পরিবর্তনের আওয়াজ তুলে বিজয়ী হতে চায় বিএনপি। দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের জনমত বাগিয়ে নিতে মাঠে সরব অবস্থান করছেন বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী বর্তমান পৌর মেয়র আলহাজ জি কে গউছ। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। টানা তিনটি পৌর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে হ্যাটট্রিক করেন হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সমবায়বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ জি কে গউছ। নির্বাচনী এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও তার রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা।

এদিকে কোন্দলহীন মহাজোটের বিশাল বলয় নিয়ে কাজ করে যাওয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজনীতির মাঠ। তৃণমূল রাজনীতির পরীক্ষিত নেতা হিসেবেও পরিচিত তিনি। তবে এখানে মহাজোটের বা জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে সরব রয়েছেন শিল্পপতি ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলহাজ আতিকুর রহমান। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সর্বশেষ ক্যারিশমা দেখার প্রতীক্ষায় তিনি। রাজনীতির গতিপথ নিয়েও সরব ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান। বর্তমানে তার নেতৃত্বেই নিস্তেজ জাপা অনেকটা সতেজ। হবিগঞ্জ জেলা জাপার সভাপতি হিসেবে ইতিমধ্যে দলকে তৃণমূলে সাজাতে সক্রিয় তৎপরতা শুরু করেছেন। তবে তিনি বারবার দল ও এলাকা পরিবর্তন করায় নেতাকর্মীদের মধ্যে তাকে নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা।

এই তিন হেভিওয়েট প্রার্থী নিয়ে সরব হবিগঞ্জ-৩ নির্বাচনী এলাকার জনপদ। ভোটাররা অবশ্য সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই হবিগঞ্জ-৩ আসনের প্রতি বিশেষ নজর দেন পুরো জেলার ভোটাররা। এ আসনটি এক সময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিল। ২০০১ সাল থেকে আসনটি জাপার হাতছাড়া হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী হিসেবে সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়া বিজয়ী হন। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সদর উপজেলার বৈদ্যেরবাজারে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন তিনি। এরপর উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবু লেইছ মো. মুবিন চৌধুরী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাহির নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে জেলার ৪টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন হয় হবিগঞ্জ-৩ আসনটিতে। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তাকে মনোনয়ন দেয়া হয় এবং টানা দ্বিতীয়বারের মতো তিনি বিজয়ী হন।

তবে এবার আওয়ামী লীগের এ দুর্গে হানা দিতে চায় বিএনপি। তরুণ সমাজে জনপ্রিয় জি কে গউছকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। দলীয় প্রভাব ছাড়াও মেয়র আলহাজ জি কে গউছের সততায় অনেকটা মুগ্ধ ভোটাররা। তার এ জনপ্রিয়তায় কিছুটা শঙ্কিত আওয়ামী লীগ বলয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিটে জি কে গউছের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রায় ২ বছর কারান্তরীণ ছিলেন তিনি। কারাগারে থেকেই পৌর নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি।

এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি ও জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির একক প্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একাধারে দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়ে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বমহলেই রয়েছে তার নিবির যোগাযোগ। ইউনিয়ন পর্যায়ের ওয়ার্ড কমিটির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গেও রয়েছে তার সরাসরি যোগাযোগ। তিনি জেলায় অবস্থানকালে ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত খোলা থাকছে তার কার্যালয়। যে কোনো এলাকা থেকে আসা লোকজনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে দিচ্ছেন নানা সমস্যার সমাধান। গ্রাম্য বিরোধ থেকে শুরু পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতেও সমান তালে ভূমিকা রেখে সর্বমহলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে চলেছেন তিনি।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি প্রচার-প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি আগামীতে আবারো নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ ছাড়া এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন মোল্লা মাসুমও মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীই রয়েছেন বর্তমান এমপির সঙ্গে।

এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জোরেশোরে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ও পৌর মেয়র আলহাজ জি কে গউছ। তিনি একাধারে তিনবার হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করছেন।
এ ছাড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ড্যাব সভাপতি ডা. আহমদুর রহমান আবদাল, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক সেলিমও মনোনয়নপ্রত্যাশী। জাতীয় পার্টি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও হবিগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক, জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী এমএ মুমিন চৌধুরী বুলবুল।

১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচিত হন তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তফা আলী। ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী এমএ মোতালিব। ১৯৮৬ সালে ন্যাপ মোজাফফর প্রার্থী অ্যাডভোকেট চৌধুরী আবদুল হাই নির্বাচিত হন। ১৯৮৮, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু লেইছ মো. মুবিন চৌধুরী টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি দুর্বৃত্তদের ছোড়া গ্রেনেডে কিবরিয়া মৃত্যুবরণ করলে এ আসনে উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে জয় লাভ করেন প্রয়াত আবু লেইছ মো. মুবিন চৌধুরী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে বর্তমান এমপি তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. জাহির নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও তিনি অংশ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেয়র আলহাজ জি কে গউছ বলেন, বিএনপি একটি বিশাল দল। এখানে নিজে থেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের স্ট্যান্ডিং কমিটি রয়েছে। তারা প্রার্থী নির্বাচন করেন। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৩৫ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করছি। দল যে সময় যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা মেনে নিয়েছি। কারাগার থেকে দলের সিদ্ধান্তে পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। সব কেন্দ্রে আমার এজেন্ট পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে পৌরবাসী আমাকে নির্বাচিত করেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা সন্দিহান। যতক্ষণ পর্যন্ত সহায়ক সরকার না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর থেকেই জেলার উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা ও কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। উন্নয়নের ছোঁয়ায় শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে হবিগঞ্জ জেলা। ইকোনমিক জোন হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করে। এ ছাড়া জেলাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালকে ১শ’ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ করা হয়েছে। হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, আধুনিক স্টেডিয়াম, প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ শতভাগ পৌঁছে দেয়া, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বৃন্দাবন সরকারি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা, জুডিসিয়াল ভবন নির্মাণসহ সব উন্নয়নই এ আমলে হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে হাওর সবখানেই ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। বাকি কাজগুলো সমাপ্ত করতে আগামীতেও নোকৗয় ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হবিগঞ্জের ৪টি আসন বরাবরই আওয়ামী লীগের আসন হিসেবে পরিচিত। তাই আগামী নির্বাচনেও হবিগঞ্জ-লাখাইসহ জেলার ৪টি আসনই আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারব।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.