তিন যুগেও স্থায়ীকরণ হয়নি সওজের সহস্রাধিক কর্মচারী

দীর্ঘ তিন যুগেও চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) কয়েক হাজার কর্মভিত্তিক (ওয়ার্কচার্জড) কর্মচারী। ফলে অবসরে গিয়েও বিনা পেনশনে মানবতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। অবসরে গেলে কিভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন-যাপন করবেন এ হতাশায় দিন অতিবাহিত করছেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর এসব কর্মচারী। তাদের অভিযোগ সব সরকারের আমলে আশ্বাস দিলেও আজও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রতিবারই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইল আটকে যায়।

সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বর্তমান অস্থায়ী ভিত্তিতে সারা দেশে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারী। যার মধ্যে রয়েছেন অফিস সহকারী, গাড়ী চালক, পিয়ন, চৌকিদার, খালাসী ও সড়কের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা। ১৯৮৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত এ ধরনের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কোনো কর্মচারীকে নিয়মিত করা হয়নি। তখন প্রায় ৭ হাজার ৩২৫ জন কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। এরমধ্যে ২ হাজারের অধিক কর্মচারী কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ ও মেয়াদ শেষে অবসরে চলে গেছেন। যা ২০০৫ সালে এসে দাঁড়ায় সাড়ে ৪ হাজার। যাদের সবাই ছিলেন অনিয়মিত। আর বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবী হয়েও এদের কেউ মৃত্যু ও অবসরের পর কোনো পেনশন পাননি। ফলে বৃদ্ধ বয়সে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। নিয়মিত ও অনিয়মিত কর্মচারীরা চাকরিরত অবস্থায় একই সুযোগ-সুবিধা পেলেও চাকরি শেষে নিয়মিতরা এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থ ছাড়াও মাসিক পেনশনের টাকা পেয়ে থাকেন। যেটা অনিয়মিতরা পান না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের শেষে কর্মরত অবস্থায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান গাড়ী চালক আবদুল আউয়াল। কিন্তু একদিকে মৃত্যুর শোক অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত তার স্ত্রী। প্রায় ২ বছর আগে স্ত্রীসহ ৪ সন্তান রেখে মারা যান চৌকিদার রমজান আলী। প্রায় একই সময় চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া রসমত উল্লাহ কেরানিগঞ্জে কাঁচা তরকারি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন বলে জানান তার সহকর্মীরা। মিরপুরের সরকারি কলোনির একটি টিনশেড ঘরে কোনো রকম দিন যাপন করছেন এক বছর আগে অবসরে যাওয়া ২ কন্যা সন্তানের পিতা সিরাজগঞ্জের নুরুল ইসলাম। তিনি জানান, কয়েক মাস পর মাথা গোঁজার শেষ স্থানটুকু ছাড়তে বলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সারাজীবন সরকারি চাকরি করে বৃদ্ধ বয়সে যতদিন বাঁচি একটু আরাম আয়েশে থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পেনশন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কষ্টে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে বলে জানান নুরুল ইসলাম।

অবসরে যাওয়া এমন কর্মভিত্তিতে চাকরিরত সহস াধিক কর্মচারীর কঠিন, নির্মম ও বেদনাদায়ক করুণ জীবন কাহিনীর চিত্র চোখে পড়ে।

অনেক কর্মচারী জানান, অতীতের সব সরকারের আমলেই এসব কর্মচারীকে নিয়মিত সংস্থাপনে আনার আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। বর্তমান সরকার গত কয়েক বছর আগে এসব কর্মচারীকে নিয়মিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও মন্ত্রণালয়ের আমলাদের নানা বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুনের অজুহাতে আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ করেন কর্মচারীরা। এমনকি কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে ২ হাজার ৬৬৭ জনকে স্থয়ী করার একটি তালিকা করেন। কিন্তু আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় এসব কর্মচারীরা শূন্য হাতে চাকরি থেকে বিদায় নিচ্ছেন বা অবসরে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একান্ত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন কর্মরত কর্মচারীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন ও সংস্থাপন) মনিরুজ্জামান জানান, আমরা এসব শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়মিত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনেক আগেই নামের তালিকাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। বাকিটা সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। ইতিমধ্যে যারা অবসর বা মারা গেছেন তাদের কি হবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এটা কার্যকরী হলে অবসরে যাওয়া ও যারা মারা গেছেন তাদের পরিবার-পরিজন সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

এ ব্যাপারে অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসানের সঙ্গে মুঠো ফোনে বারবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মানবকণ্ঠ/এসএস