তিনি নেই তবুও আছেন তিনি

তিনি নেই তবুও আছেন তিনি

কাজের বাইরে আলাদা যে জগৎ আছে সেটি তিনি মনে হয় ভুলে গিয়েছিলেন। কাজ ছাড়া আর কিছুই যেন কল্পনাতে ছিল না তার। নেই ছুটি, নেই কোনো উত্সব, নেই কোনো তার বিশেষ দিন। প্রতিদিনই অফিসে আসতে হবে। এ এক অন্যরকম রুটিন। তার চেয়ার টেবিল আর কম্পিউটার যেন তাকে সকাল হলেই ডাকে। সেই ডাক তিনি শুনতে পেতেন। অফিস আর কাজ যেন তার সবচেয়ে আপন জায়গা। কাজ সকালে থেকেই শুরু হতো, শেষ হতো রাতে। ঘুম থেকে উঠেই বাসাতে এক নজর দেখতেন দেশের প্রথমসারির সব দৈনিক। তারপর নিজে কী কী করবেন সেগুলো ঠিক করতেন গাড়িতে আসতে আসতে।

কখনো প্রটোকল নিয়ে ভাবতেন না। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বা বার্তা সম্পাদক তাতে কী? তার গাড়িতে কেউ না কেউ প্রতিদিনই আসত একসঙ্গে। কেউ না থাকলে আশপাশে থাকা সহকর্মীদের ফোন দিতেন। রাস্তাতে কারো সঙ্গে দেখা হলে নিয়ে অফিসে আসতেন।

কাজ পাগল মানুষটি আবু বকর চৌধুরী। আমাদের বকর ভাই। কেউ কেউ এবিসি বলেও ডাকতেন তাকে। সংবাদ নিয়েই ছিল তার ভিন্ন এক জগত। গণমাধ্যমে যারা কাজ করেন, তাদের আলাদাভাবে বলার দরকার নেই। আর যারা বকর ভাই নামের মানুষটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রেখেছিলেন তারাও জানেন তাকে।

মিশুক, হাস্যোজ্জ্বল এবং প্রাণচঞ্চল মানুষটি খুব সহজে আপন করে নিতেন সবাইকে। শত কাজের ব্যস্ত থাকলে সহকর্মীদের নিয়েই থাকতেন আড্ডা, আলোচনায়। সবাইকে নিয়ে চা খাওয়া, হাঁটতে বের হওয়া এমনকি নিজের ডেস্কে বসে গল্পও করতেন।

কাজের আলাপের পাশাপাশি তিনি আগামী দিনের পরিকল্পনাও করতেন। রাত কি দিন; সব সময়ই যেন সংবাদই ছিল তার প্রাণ। রিপোর্টার, সাব-এডিটর কিংবা অফিসের যে কোনো বিভাগের সহকর্মীদের সঙ্গে ছিল আত্মার সম্পর্ক। তিনি ছিলেন সবারই ভাই, প্রিয় ভাই। কিন্তু নেই এখন আমাদের সেই বকর ভাই। নিউজ চাইছে না তিনি কয়েকদিন কারো কাছে। অফিসের সবাই চুপচাপ। নিষ্প্রাণ অফিস। কেউ বলে না, ‘নিউজ কই’। বকর ভাই বিহীন নিউজ রুম। পত্রিকা বের হচ্ছে কিন্তু তিনি নেই। তার চেয়ার শূন্য। কি-বোর্ডে এই ক’দিনে পড়েছে ধুলা। কম্পিউটারও চালু হয়নি। তার ডেস্ক সামনে কেউ যায় না। হয় না গল্প। ফটোকপি মেশিনের সামনে প্রিন্ট দেয়া নিউজও আউলা চুলের কেউ নিতে আসেন না।

রিপোর্টারদের সংবাদ এডিট করে পেজ মেকাপে বকর ভাই নামের মানুষটি নেই। পত্রিকার অন্য পাতা চেক করে ছেড়ে দেয়ার মানুষটি নেই। পত্রিকা ছেড়ে প্রথম সংস্করণ, দ্বিতীয় সংস্করণ দেখার মানুষটি নেই। নেই সবার খোঁজখবর রাখার মানুষটি। অফিসে সুখ-দুঃখ বা কষ্টের কথা শোনার মানুষটি নেই। নেই আমাদের মানবকণ্ঠের আইনস্টাইন, নেই আমাদের বকর ভাই।

বকর ভাই নেই তবুও আছে আমাদের মনে। তিনি থাকবেন শত শত যুগ স্মৃতি হয়ে। ইতিহাস বলবে কথা। যে ক’জন গণমাধ্যমের কাজ পাগল মানুষ তাদের একজন আবু বকর চৌধুরী। আগামীতে যারা গণমাধ্যমে কাজ করতে আসবেন তাদের কাছে আইকন হয়ে থাকবেন তিনি। বকর ভাই হবেন রেফারেন্স। সবাই জানবে আবু বকর চৌধুরীর কথা, তার কাজের কথা।

ভালো মানুষরা খুব বেশি পৃথিবীতে থাকে না। তার বেলাতেও তাই হয়েছে ৫৪ বছর বয়সে আমাদের একা করে চলে গেলেন। কিন্তু আমরা তার সঙ্গে কাজ করা মানুষরা যতদিন গণমাধ্যমে কাজ করব, তাকে অনুসরণ করেই এগিয়ে যাব। আমাদের শিক্ষক তিনি। তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠান। যে যা কিছুই শিখেছে হয়তো তার শেখানো কাজগুলো সবার আপন হয়ে থাকবে। আর এভাবেই সবার মধ্যে বেঁচে থাকবেন আমাদের বকর ভাই। মানবকণ্ঠের নিউজ রুমে থাকবেন সবার ছায়া হয়ে। পত্রিকার সফল সম্পাদক হিসেবেও তিনি বেঁচে থাকবেন পাঠকদের মনে।

মানবকণ্ঠ/এসএস