‘তাড়াতাড়ি আয় না হলে বাস জ্বালিয়ে দেব’

‘তাড়াতাড়ি আয় না হলে বাস জ্বালিয়ে দেব’

রাজধানীতে দিন-দুপুরে বাস আটকে চালক-হেলপারদের মারধর করে অর্থ লুটের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিজেদের ছাত্র পরিচয় দিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবহন মালিকদের। তাদের মতে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এসব করা হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশের বিরুদ্ধেও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার অভিযোগ করেছেন তারা। তবে পুলিশের ভাষ্য- এ রকম কোনো অভিযোগ তারা পাননি।

বাসমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর আজিমপুর হয়ে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ১৫টি বাস কোম্পানির ৫ শতাধিক বাস এসব হামলার শিকার হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫টি বাস হামলার শিকার হচ্ছে। গত একমাস ধরে নির্দিষ্ট একটি সড়কে এ ঘটনা ঘটলেও ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন সড়কে।

বাস চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিরপুর সড়কে বাস প্রবেশের পর নিজেদের ছাত্র পরিচয় দিয়ে ওইসব দুর্বৃত্তরা অযথাই হেলপারদের সঙ্গে প্রথমে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়। কখনো হাফ ভাড়া নিয়ে, কখনো দুর্ব্যবহারের অজুহাত, কখনো বা মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে এমন সব অজুহাত তুলে হেলপারদের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে। বাসচালককে নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামাতে বাধ্য করে জোরপূর্বক নামিয়ে দেয়া হয় যাত্রীদের। পরে বাসমালিককে ফোন দিয়ে হুমকি দেয়- ‘তাড়াতাড়ি আয় না হলে বাস জ্বালিয়ে দেব’। তবে মালিক আসার আগেই চালক-হেলপারদের মারধর করে টাকা নিয়ে চম্পট দেয় দুর্বৃত্তরা। টাকা দিতে গড়িমসি করলে ভাঙচুর করা হয় বাস। মারধর করে বাসস্টাফদের। অনেক ক্ষেত্রে চালকের পাশে থাকা টুলবক্স ভেঙেও টাকা লুট করে নেয় তারা।

জানা যায়, বাস আটকের জন্য দুর্বৃত্তরা সাধারণত মিরপুর রোডের দুটি স্থান বেশি ব্যবহার করছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশের ’নিউওয়েজ সার্ভিস’ নামে একটি পেট্রোল পাম্প এবং ঢাকা ও সিটি কলেজের মধ্যবর্তী একটি গলি। চালক-হেলপারদের জিম্মি করে ওইসব স্থানে বাস থামাতে বাধ্য করছে দুর্বৃত্তরা। দিনের বেলা এসব ঘটনা অহরহ ঘটলেও সন্ধ্যার পর তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বাসমালিকরা বলেন. সারাদিনের আয় জমা থাকায় দুর্বৃত্তরা ওই সময়টাকেই বেশি টার্গেট করে।

আজিমপুর থেকে চলাচলকারী বাস সার্ভিসগুলো হচ্ছে- ভিআইপি পরিবহন, বিকাশ পরিবহন, মেট্রো লিংক, মিরপুর লিংক পরিবহন, বিহঙ্গ পরিবহন, আশীর্বাদ পরিবহন, হিমাচল পরিবহন, নীলাচল পরিবহন, ঠিকানা পরিবহন, সেফটি পরিবহন, দেওয়ান পরিবহন, পালকি পরিবহন, দ্রুতি পরিবহন ও ডি লিংক পরিবহন।

তবে এসব রুটে চলাচলকারী কোনো পরিবহন মালিকই নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। এ প্রসঙ্গে তাদের যুক্তি নাম প্রকাশিত হলে দুর্বৃত্তরা নির্দিষ্ট পরিবহনকে টার্গেট করে হামলা চালাবে। তবে পরিবহন মালিকরা শিগগরিই এসব বিষয়ে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন তারা।

মালিকরা আরো জানিয়েছেন, গত একমাস ধরে প্রতিদিনই প্রকাশ্যে চলছে এই লুটপাট। পুলিশকে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনা জানানো হলেও এ পর্যন্ত কোনো দুর্বৃত্তকে তারা আটক করতে পারেননি। তাদের মতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ছাত্রদের নাম করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্রান্তকারী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে এ ক্ষেত্রে তারা সুকৌশলে অপপ্রয়োগের চক্রান্তে লিপ্ত আছে। কারণ ইতোমধ্যে ছাত্র নামধারীরা ফেসবুকে হাফ ভাড়ার দাবিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সংঘবদ্ধ থেকে উসকানি দিচ্ছে।

ছাত্রদের হাফভাড়া প্রসঙ্গে বাসমালিকরা বলেছেন, এটি সরকারি পরিবহন-বিআরটিসির জন্য প্রযোজ্য, বেসরকারি পরিবহনের জন্য না। গত বছর ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ৯ দফা দাবির মধ্যে হাফভাড়ার প্রসঙ্গটিও ছিল। কিন্তু সড়ক পরিবহনমন্ত্রী এই দাবিটি নাকচ করে দেন বলে জানান পরিবহন মালিকরা।  তাদের মতে এখনই পরিস্থিতি শক্ত হাতে মোকাবিলা করা না হলে তা আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

জানা যায়, গতকাল বুধবার দুপুরেও আসাদগেট আড়ংয়ের সামনে ২টি এবং বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশে ১টি বাস আটকে টাকা লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা।

এ প্রসঙ্গে একটি বাসচালক এই প্রতিবেদককে বলেন, ফার্মগেট খামারবাড়ী খেজুর বাগান থেকে ৪-৫ জন ছেলে বাসটিতে উঠে চালককে বাসটি রাস্তার পাশে থামাতে বলে। চালক কারণ জিজ্ঞেস করলে যুবকরা বলে, তোরা ছাত্রদের কাছ থেকে হাফভাড়া নিস না কেন? চালক বাস না থামিয়ে চালাতে থাকলে যুবকদের একজন তাকে মারধর করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে আসাদগেট আড়ংয়ের সামনে এসে বাস থামাতে বাধ্য হন তিনি। সেখানে তারা আরো একটি বাস থামিয়ে দুটি বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে চালক-হেলপারের কাছ থেকে টাকা লুট করে দ্রুত চলে যায়।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরকার মানবকণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে কেউ করেনি। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কখনো কখনো বাসস্টাফদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বিতণ্ডা হয়। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু প্রতিনিয়ত একটি নির্দিষ্ট স্থানে বাস আটকে অর্থ লুটের ঘটনা ঘটলে অবশ্যই তা আমরা জানতে পারতাম।

মানবকণ্ঠ/এসএস