তারুণ্যে রাজনীতির দরকার আছে কি নেই?

মাঝে মাঝে তারুণ্য এমন সব কাণ্ড করে যা আমাদের বুকের ছাতি বড় করে তোলে। তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তারাই ভরসা। আবার এমন সব কাণ্ড করে যা আমাদের বুকের রক্ত হিম করে ফেলে। নানা সংঘাতে রাজনীতিদীর্ণ আমাদের সমাজে কোটা আন্দোলন এক নয়া সমস্যা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন বাতিল করা হবে। তাহলে সমস্যা কোথায়? এমন তো নয় যে আজ বললেই কাল বাতিল হবে। সব বিষয়ের একটা প্রক্রিয়া আছে। প্রক্রিয়া থাকে। কাজেই সে সময়টুকু দিতে হবে। না দেয়ার আগেই যারা তারুণ্যকে নিয়ে খেলছে তারা যেমন অপরাধী তেমনি অপরাধী অধৈর্য মারনেওয়ালারা। তারা আর কিছু পারুক বা না পারুক লাঠিসোটা আর অস্ত্র নিয়ে নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের বেশ পেটাতে পারে।

এই পেটানোর ফলে কার লাভ হয়? লাভ হয় তাদের যারা চায় দেশের বিভ্রান্ত তারুণ্য আহাজারি করে মরুক। যারা চায় তারা রাজাকার হোক। আর সে সুযোগ করে দিচ্ছে সরকারি দলের লোকজন। কি দুর্ভাগ্য আমাদের। উপাচার্যের মতো বিশাল পদবির মানুষও যা ইচ্ছে বলেন। এই যে তিনি এদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে দিলেন, এতে কি আসলে তার কোনো লাভ হয়েছে? সবদেশে সবকালে ছাত্রছাত্রীরাই প্রতিবাদ করে। তাদের যৌবনের ধর্মই তাই। কখনো তাদের বুঝিয়ে কখনো দাবি মেনে কখনো সামান্য শাসন করেই বাগে আনতে হয়। এর সঙ্গে জঙ্গির সম্পর্ক কী? তাছাড়া এরা আমাদেরই সন্তান, আমরা বুঝে না বুঝে তাদের জঙ্গির দলে ঠেলে দিয়ে আসলে কি কোনো কিছু লাভ করতে পারব? তাই সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে- দেশে ছাত্রছাত্রী বা তারুণ্যের রাজনীতি করার দরকার আছে কি না।

তারুণ্য রাজনীতি করবে কি করবে না এটা নিয়ে মতভেদ আছে দেশে। খুব স্বাভাবিকভাবে এখন যে পরিবেশ তাতে অভিভাবকেরা চাইবেন সন্তান যেন সে পথ না মাড়ায়। এটা খুব যৌক্তিক চাহিদা। কারণ রাজনীতি মানে এখন আর কোনো আদর্শ বা নৈতিক কিছু নয়। বহু আগেই সে ইমেজ হারিয়ে ফেলেছে রাজনীতি। অথচ আমাদের দেশের ইতিহাসজুড়ে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় অধ্যায়। ষাট দশকের ছাত্র রাজনীতি এদেশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করার কাজ শুরু করেছিল। তাদের জীবন ও সংগ্রাম ছিল মানুষের জন্য অনুকরণীয়। সে সময় তারা স্লোগান দিত- একটি বাংলা শব্দ একজন বাঙালির জীবন। ষাট দশকের সেই সুবর্ণকালে আসাদ ঘরে না ফিরলেও শামসুর রাহমানের ভাষায়- ফিরে গিয়েছিল আসাদের শার্ট। সেই সূচনাকে আরো প্রাণবন্ত আরো অর্থবহ করে তুলেছিল তাদের উত্তরাধিকারীরা।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও সূচনালগ্নে তারুণ্যের যে সংগ্রাম ও ভূমিকা তার উজ্জ্বলতায় স্বাধীনতা পেয়েছিলাম আমরা। চার খলিফা নামে খ্যাত ছাত্র রাজনীতির চার নেতার কেউই মূল দলে থেকে বা সরে গিয়ে নিজেদের আসন পাকা করতে না পারলেও একাত্তর অবধি এরাই আমাদের তারুণ্যের স্তম্ভ। ছাত্র রাজনীতি না থাকলে পাকিস্তানি শাসকদের লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর মোকাবিলা করাটা সহজ হতো না। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির মূল নেতা ও মাথার ওপর সূর্যের মতো থাকলেও এরাই ছিল ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। সে সময়কার তারুণ্যের জয়জয়কার বা ভূমিকা বুঝতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানলেই এর সত্যতা চোখে পড়বে।

মুজিব বাহিনী কাদেরিয়া বাহিনী শেখ ফজলুল হক মণি বা সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা নিয়ে আজ আমরা যত তর্ক বিতর্ক করি না কেন, সে সময়কালে এরা না থাকলে বাঙালি পড়ে পড়ে মার খাওয়ার বাইরে ঘুরে দাঁড়াতে পারত না। মুক্তিযুদ্ধে যারা লড়াই করতে গিয়েছিলেন সেই শহীদ রুমি বা অসংখ্য শহীদের বেশিরভাগই ছিল তরুণ। যারা লড়াই করতে গিয়েছিল তাদের রক্তে যৌবন চোখে তারুণ্য মগজে স্বাধীনতা। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

বয়স্ক মানুষেরা তাদের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে যাবেন এটাই নিয়ম। বিজ্ঞান বলে একটা বয়সের পর মানুষের মগজের কোষ শুকিয়ে আসে। তাদের চিন্তাশক্তি লোপ পেতে শুরু করে। এটা যে কতটা সত্য আমাদের মতো মানুষেরা এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাই। বলাবাহুল্য, এর সঙ্গে কমে আসে ঝুঁকি নেয়ার সাহস। বলা হয় শৈশব হলো আদর ও স্নেহের যৌবন দ্রোহের ও আবিষ্কারের পরিণত বয়স হিসেব মেলানো ও স্মৃতিকাতরতার। ফলে দুনিয়া বদলে দেয়া মানুষেরা কম বয়সেই তাদের কাজগুলো করে ফেলেন। রাষ্ট্র বা দেশ নিয়ে কিছু করার জন্য যৌবনের চাইতে ভালো বয়স হতেই পারে না। আমাদের দেশের নেতৃত্বে যৌবনের ঘাটতি আজ এতটাই প্রকট আমরা এমন সব কথা শুনি বা এমন সব কাণ্ড দেখি যাতে নেতাদের স্মৃতিভ্রষ্টতা স্পষ্ট। অথচ বঙ্গবন্ধু এমনকি চার নেতাও তাদের বয়স থাকতে থাকতেই নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে গিয়েছিলেন।

সবকিছুতেই উত্তেজনা আমাদের। আমরা হুজুগে জাতি। এর ভালোমন্দ দু’ দিকই স্পষ্ট এখন। ভালোটা এই, আমাদের দেশে অনাচার আর সহিংসতার শেষ নেই। সেসব ভুলে মানুষ কিছুদিনের জন্য হলেও আনন্দে মেতে ওঠে। আর মন্দ হচ্ছে- বাড়াবাড়ি। সবকিছুতে আমরা এমন ভাগাভাগি আর রেষারেষির শিকার হই, যা ভাবতেও ভয় লাগে। এই যে বিশ্বকাপ ফুটবল, গোড়াতে বলি আমরা কি ভালো ফুটবল খেলি? না খেলতে পারার কোনো ইচ্ছে আছে আমাদের? দেশের ফুটবলের হাল চরমে। এককালে আমাদের ধ্যান জ্ঞান ছিল ফুটবল। ঢাকা মোহামেডান বা আবাহনী, ওয়ান্ডার্স কিংবা ব্রাদার্স ইউনিয়নের জন্য পাগল হয়ে থাকতাম আমরা। কবেই গত হয়েছে সেসব দিন। এখন ক্রিকেটের যুগ।

অল্প কিছু দেশ এ খেলাটা খেলে। বিশেষত যারা ইংল্যান্ডের কলোনি ছিল তারাই মূলত এ খেলায় আছে। সেখানে আমরা মোটামুটি একটা জায়গা করে নেয়ায় আমাদের মানুষজন খুশি। আমরা বিশ্বমানের ক্রিকেট খেলি একথা যতটা সত্য, তার চেয়েও সত্য এই মান পরিমাপের জন্য আছে মাত্র সাত আটটা দেশ। ফুটবল এত সোজা কিছু নয়। সারাবিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এ খেলার পাগল। এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপ আমেরিকা সাত মহাদেশের সবাই আছে এতে। আমি বিগত বিশ বছরের অধিক যে দেশে থাকি, যে দেশ আমাকে নাগরিকত্ব দিয়ে আপন করে নিয়েছে সেই সুদূর অস্ট্রেলিয়াও আছে এ দলে। শুধু থাকা নয় বছরের পর বছর, চূড়ান্ত পর্বে খেলে এই দেশ। এবার তারা কেমন খেলছে সেটা সারা দুনিয়া দেখেছে। মাত্র আড়াই কোটি বা তার চেয়ে কম জনসংখ্যার এই দেশ যে কোনো খেলায় বিশ্বমানের। কারণ তারা খেলাকে খেলা হিসেবে নেয়। সঙ্গে থাকে প্রফেশনালিজম। যে কারণে আন্তরিকতা থাকলেও বাড়াবাড়ির জায়গা নেই।

খেলা থেকে জীবন সব জায়গায় এমন আবেগ আর উত্তেজনার জাতিতে রাজনীতি তারুণ্যে কতটা থাকবে আর থাকলে কি হবে রূপরেখা সেটাই এখন ভাবার বিষয়। কারণ বল কিন্তু মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে। ছবিতে দেখছি লাজ লজ্জা ভুলে গালে রাজাকার লিখে মাঠে নামছে তারুণ্য। মেয়েরাও। এভাবে শব্দটি গালাগাল থেকে সম্মানের রূপ নিলে জাতির আর মাথা তুলে বাঁচার পথ থাকবে না। সরকারি বেসরকারি কোনো ছাত্র রাজনীতিই আসলে এখন আর তেমন দরকার নেই। এটাই ভাবার বিষয় আমাদের। – লেখক: সিডনী প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএএম