তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

সাহিত্যপ্রেমী মানুষ যারা এই নামটি তাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। যে নাম উচ্চারিত হলে এক ঝলকেই সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাসাহিত্য আজ বিশ্ব দরবারে একটি বিশেষ স্থান দখল করার কৃতিত্ব অর্জন করে আছে। এই অর্জন খুব সহজে সম্ভব হয়নি। এর পেছনে অনেক সাহিত্যিকের নিরলস সাহিত্য চর্চার অবদান রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালে যে ক’জন অগ্রগণ্য সাহিত্যিককে এক পলকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে নজরে পড়ে তাদের মধ্যে তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতমদের একজন। তিনি বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও গল্পলেখক। তার লেখায় বিশেষভাবে পাওয়া যায় বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের সাঁওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউরি, ডোম, গ্রাম্য কবিয়াল সম্প্র্রদায়ের কথা। ছোট বা বড় যে ধরনের মানুষই হোক না কেন, তারাশঙ্কর তার সব লেখায় মানুষের মহত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তার লেখার সবচেয়ে বড় গুণ। সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন চিত্র তার অনেক গল্প ও উপন্যাসের বিষয়। সেখানে আরো আছে গ্রামজীবনের ভাঙনের কথা, নগরজীবনের বিকাশের কথা। মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম অনুভূতিকে তিনি এমনভাবে তার রচনায় বর্ণনা করেছেন যে, যে কোনো পাঠকের পক্ষে তা হৃদয়ঙ্গম করা সহজ ছিল। ‘শিবানী’ নামক একটি ছোট গল্পে তিনি যেভাবে একজন গৃহকর্মীর চিন্তাধারাকে তুলে ধরেছেন-এর তুলনা মেলা সত্যি ভার। এক কথায় বলতে হয়, আজ আমরা যা বলি, যা শুনি, যা নিয়ে ভাবি-তা তিনি বহু বছর আগেই বলে গেছেন তার সাহিত্য রচনার মাধ্যমে। তিনি শুধু সাহিত্যেই মানুষের সুখ, দুঃখ, কষ্ট কিংবা দায়বোধ তুলে ধরে মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব পালন শেষ করেননি। রাজনৈতিকভাবেও তিনি অত্যন্ত সচেতন ও সোচ্চার ছিলেন। কংগ্রেসের কর্মী হয়ে সমাজসেবামূলক কাজ করতে গিয়ে কিছুদিন জেলও খেটেছেন। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৮ সালের ২৪ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জš§গ্রহণ করেন। তার বাবা-মায়ের নাম হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রভাবতী দেবী। লাভপুরের যাদবলাল হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করার পর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। জলসাঘর ও অভিযান (সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত), বেদেনি ২০১০-তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে নিশিপদ্ম ১৯৬২, বিচারক ১৯৫৭, ফরিয়াদ ১৯৭১, তামস তপস্যা ১৯৫২, কালবৈশাখী ১৯৬৩, কালিন্দী ১৯৪০, গণদেবতা ১৯৪২, আরোগ্য নিকেতন ১৯৫৩, নাগিনী কন্যার কাহিনী ১৯৫২, সপ্তপদী ১৯৫৭, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা ১৯৫১, কবি ১৯৪৪, কীর্তিহাটের কড়চা ১৯৬৭, চৈতালি ঘূর্ণি ১৯৩১, ধাত্রীদেবতা ১৯৩৯, পাষাণপুরী ১৯৩৩, চাঁপাডাঙার বৌ ১৯৫৪ সহ অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে। দ্বীপান্তর (১৯৪৫), পথের ডাক (১৯৪৩), দুই পুরুষ (১৯৪৩) তার রচিত উল্লেখযোগ্য তিনটি নাটক। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য শরৎস্মৃতি পুরস্কার (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), জগত্তারিণী স্মৃতিপদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), রবীন্দ্র পুরস্কার (আরোগ্য নিকেতন), সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (আরোগ্য নিকেতন), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (গণদেবতা), পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ উপাধির মতো পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। আমরা তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
আব্দুল্লাহ আল সিফাত