তাপমাত্রা ক্রম বৃদ্ধিতে নানা রকম প্রাকৃতিক সংকট

আফতাব চৌধুরী
পরিবেশ বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে ভাবনাচিন্তা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। ১৯৭২ সালে স্টকহোম সম্মেলনের সূচনা। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রিও বসুন্ধরা সম্মেলন (১৯৯৭)। এ সবেরই ফলে চেতনা বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে গৃহীত হয়েছে নানা কর্মসূচি যেমন বিশ্ব পরিবেশ দিবস, বিশ্ব জলাভূমি দিবস। কোথাও চলছে সবুজ বাঁচাও আন্দোলন। তৈরি হয়েছে আদালতে গ্রিন বেঞ্চ। পরিবেশ অনুকূল বা পরিবেশবান্ধব শব্দটি এখন বহুল ব্যবহƒত। সাম্প্রতিক উদ্যোগ থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না যে, অতীতে পরিবেশ সচেতনতার অভাব ছিল। বনাঞ্চল বিনষ্ট করার বিপদ সম্পর্কে প্লেটো ২৪০০ বছর পূর্বে সতর্ক করেছিলেন। ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখে কপালে ভাঁজ পড়েছিল সমাজসচেতন বুদ্ধিজীবীদের। মূলত যে ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তা হলো দৃষ্টিভঙ্গির। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতির প্রাথমিক স্তরে চেষ্টা ছিল প্রকৃতিকে জয় করা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে মানুষের ক্রমবর্ধমান ভোগ-বাসনা চরিতার্থ করা। এখন বলা হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদকে সযতেœ, সুবিবেচনার সঙ্গে এবং সাবধানে ব্যবহার করা এবং সংরক্ষণ করার কথা।
উন্নত দেশগুলাতে যে আর্থিক সংস্কার কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে তার ফলে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিশ্বায়ন দরজা খুলে দিয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার’ আর্থিক সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ১৯৯২ সালে। গবেষণায় ধরা পড়েছে আইভরি কোস্ট, মেক্সিকো এবং থাইল্যান্ডে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব অর্থভাণ্ডারের গবেষণায় দেখা গেছে আর্থিক সংস্কার কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ১০টির মধ্যে ৭টি দেশে বাড়ছে দারিদ্র্য। কারা নষ্ট করছে প্রকৃতি এবং পরিবেশ? বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে ২৫ শতাংশ মানুষ। এদের ভোগ তৈরি করে বর্জ্য পদার্থ। পৃথিবীর মোট বর্জ্য পদার্থের ৯০ শতাংশের উৎস ২০ শতাংশ মানুষের বল্গাহীন ভোগ। পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে মোটর গাড়ির গুরুত্ব খুব বেশি। উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর লাগামছাড়া ভোগ পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে ব্যাপকভাবে। পরিবেশবিদ এবং পরিবেশবাদীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ দূষণের বিপজ্জনক পরিণতি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ওপর। পরিবেশ বাঁচাতে গেলে লাগাম টানতে হয় শিল্পায়ন, ভোগ ব্যয় তথা উন্নয়নের গতিতে। অথবা পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাড়তি আয়োজন করতে অধিক ব্যয় করতে হয়। যে পথই অনুসরণ করা হোক না কেন ব্যাহত হবে উৎপাদনের অগ্রগতি। মন্দাক্রান্ত মার্কিন অর্থনীতি এ পথে চলতে নারাজ। সুখের কথা মারাকাশ সম্মেলনে ১৬৫টি দেশ অঙ্গীকার করেছে তাপমাত্রা কমানোর জন্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে এ প্রচেষ্টা ফলবতী হওয়া সম্ভব হবে কি?
পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কুফল বেশি পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলাতে। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাস ঘটলে গৃহহারা হবেন অজস্র মানুষ। কারণ তাদের ঘরবাড়ি শক্ত সবল নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ বিপদ কম। দ্বিতীয়ত, খরা হলে বর্ষার ওপর নির্ভরশীল উন্নতিশীল দেশের অসংখ্য মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করবে। দেখা দেবে মহামারী। দারিদ্র্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের নিত্যসঙ্গী। খরা খাঁড়ার ঘা তাদের কাছে। তৃতীয়ত, প্রকৃতির পরিবর্তনের ফলে যেসব অসুখ-বিসুখ হবে তাদের চিকিৎসার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই এসব দেশে। বিনা চিকিৎসায় কত প্রাণহানি ঘটবে তার হিসাব করা এখন দুষ্কর। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় অবস্থা পরিবর্তিত থাকলে গোটা উন্নতিশীল বিশ্বের মানুষ গভীর বিপর্যয়ের কিনারায়। উন্নতিশীল দেশে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি জটিলতর করছে সমস্যা। একাধারে দুর্বল রাষ্ট্র এবং অন্যদিকে পরিবেশ চেতনার অভাব। সবার উপরে আছে জনসংখ্যার চাপ। যার অনিবার্য ফলশ্রুতি পরিবেশ দূষণ। পরিবেশ ভাবনা এখনও বিশেষ দাগ কাটেনি এসব দেশে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের কাছে এসব প্রত্যাশা অবাস্তব। নুন এবং পান্তাসহ মুখরোচক এবং স্বাস্থ্যকর সবই যাদের আছে তারা আরও ভোগ বাড়িয়ে দূষণ বাড়িয়ে চলছে। ব্যক্তিগত সুখ এবং সম্ভোগ তাদের সর্বস্ব। দারিদ্র্য এবং অসাম্যের দুনিয়ায় সঠিক সমাধান সম্ভব নয়।
খুবই দুর্ভাবনার বিষয় হলো রিও সম্মেলনের ২১তম কর্মসূচি কার্যকর করার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তার এক-তৃতীয়াংশ দিতে রাজি হচ্ছে না উন্নত দেশগুলো। ওই কর্মসূচি অনুসারে শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে আনার কথা। সে পথে হাঁটেনি উন্নত দেশগুলো। নানা প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখন পিছু হাঁটছে। বাতাস ছড়াচ্ছে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কার্বন-ডাইঅক্সাইড। কিয়াডা প্রোটাকল না মানার ফলে নিঃসরণের মাত্রা কমানোর দায়িত্বও নেই আমেরিকার। প্রথমে স্থির হয়, প্রত্যেক দেশকে আপন লক্ষ্যমাত্রার অন্তত অর্ধেক পূরণ করতে হবে নিজস্ব এলাকায়। পরে শিথিল হয় শর্তে। এখন জাপান যদি বাংলাদেশ বা ভারতে কার্বন-ডাইঅক্সাইডের নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর ব্যয়ভার বহন করে তাহলে নিজের এলাকায় নিঃসরণ কম করলেও চলবে। দ্বিতীয়ত, অরণ্য সৃজন কর পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে পারলে বাড়তি অধিকারও পাবে সংশ্লিষ্ট দেশ। এ আপস মীমাংসা দুর্বল প্রয়াস। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা করেছেন তার দেশ নিজের মতো করে পরিবেশ দূষণের সমস্যা লাঘব করতে তৎপর হবে। একদিকে তাপমাত্রার ক্রম ঊর্ধ্বগতি অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা বহুবিধ সংকটের জš§ দিয়ে চলেছে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার (১ম স্বর্ণপদক) প্রাপ্ত

মানবকণ্ঠ/এসএস