ঢেলে সাজানো হচ্ছে বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপিকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন-এ্যাব, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, আন্তর্জাতিক লবিং ফোরাম, ড্যাব, মৎস্যজীবী দল, কৃষক দলের নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভেঙে দিয়ে নতুন করে গঠন করা হচ্ছে বিভিন্ন জেলা কমিটি।

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি মধ্যসারির নেতাদের নিয়ে স্কাইপি কনফারেন্স করে দলপুনর্গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতা করছেন। এপ্রিল বা মে’তে দলটির জাতীয় কাউন্সিল হতে পারে।

এর আগে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর দল ঢেলে সাজানোর দাবি উঠেছিল। তৃণমূল নেতাকর্মী এ নিয়ে তখন ছিলেন দারুণভাবে সরব। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর দলের সিনিয়র নেতারা দলকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন হচ্ছে। জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে শূন্য হয়ে পড়া পদগুলো পূরণ; বার্ধক্যজনিত কারণে অক্ষম নেতাদের সরিয়ে শারীরিকভাবে সক্ষম, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞাবান নেতাদের নিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করবে দলটি। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতারা এ ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করেন। বৈঠকেই আগামী এপ্রিল মাসে দলের কাউন্সিল আয়োজনের প্রাথমিক নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম বলেন, যারা বর্তমানে দলের নেতৃত্বে আছেন, তাদের আরো অ্যাকটিভ হতে হবে। জিয়ার আদর্শকে ধারণ করে আমাদের নেতৃত্বকে এগিয়ে যেতে হবে। এটা করতে না পারলে নেতৃত্বে থাকার প্রয়োজন নেই। দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বিষয়ে ইঙ্গিত দেন নীতিনির্ধারক ফোরামের দুই সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তারাও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাস্তবতায় কাউন্সিল ডেকে দলের নেতৃত্বে পুনর্গঠনের প্রস্তাব করেন।

নেতারা পরিষ্কার বলেন, বর্তমান অবস্থা থেকে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। অবশেষে দলের চেয়াপার্সন খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দলটিতে চলছে এখন চলছে পুনর্গঠন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। এখন আমাদের দুটি কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো পুনর্বাসন, অন্যটি পুনর্গঠন। ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ নেতাকর্মীকে পুনর্বাসন করতে হবে। যারা দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সামনে এনে পুনর্গঠন করতে হবে।

দরকার হলে আমাদের যাদের বয়স হয়ে গেছে, আমরা সরে যাব। তারপরেও এই দলটাকে রাখতে হবে। দলকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পুনর্গঠন করতে হবে। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নেতাকর্মীদের মামলা থেকে পরিত্রাণ ও জেল থেকে মুক্ত করতে হবে। তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সামনে আনতে হবে। তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আমরা যারা ব্যর্থ বলে পরিচিত হয়েছি, তরুণদের জন্য আমাদের পদ ছেড়ে দিতে হবে। তাহলেই বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে। ২০০৮ সালে নির্বাচনের পরও আমরা দলের কাউন্সিল করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম; সারাদেশে আমাদের নেতাকর্মী সাহসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

এদিকে সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল। ওই কাউন্সিলে নীতিনির্ধারক ফোরামের পরিধি বাড়িয়ে উনিশে উন্নীত করেছিল বিএনপি। কিন্তু কাউন্সিলের পর পুনর্গঠিত কমিটিতে দুটি পদ ছিল শূন্য। ১৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির দুইজন তারেক রহমান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনি জটিলতার কারণে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন দেশের বাইরে। মূলত ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিই ছিল বিএনপি নীতিনির্ধারক ফোরামের। আবার এই ১৫ জনের মধ্যে বিগত পৌনে তিন বছরে তরিকুল ইসলাম, ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ ও এমকে আনোয়ার মৃত্যুবরণ করেছেন।

এক বছর ধরে কারাবন্দি রয়েছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। শারীরিক অসুস্থতার কারণে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বেশিরভাগ সভাতেই অংশ নিতে পারেন না। সবমিলিয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতামতের ভিত্তিতেই হচ্ছে দলটির সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ। মূলত ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে স্থায়ী কমিটির নেতাদের নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই কার্যত দল পরিচালনা করে আসছেন।

অপরদিকে রাজনৈতিক মহলের বিবেচনায় ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রতিক‚ল রাজনৈতিক সময় পার করছে বিএনপি। দীর্ঘ একযুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির চেয়ারপারসন কারাবন্দি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও অবস্থান করতে হচ্ছে দেশের বাইরে। দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতাকর্মীর ঘাড়ে এখন মামলার পাহাড়। ক্ষমতার বাইরে থাকার পাশাপাশি চরমভাবে সংকুচিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার।

সরকারের কঠোর নিপীড়নের মুখে খাদের একেবারে কিনারে দলটির অবস্থান। এ ধরনের একটি পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দলের একটি শক্তিশালী নীতিনির্ধারক ফোরামের প্রয়োজন। যারা তাদের মেধা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারবেন। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে বিষয়টি বারবার আলোচনায় এলেও স্থায়ী কমিটিসহ দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠনে বিএনপি কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এবার এ উদ্যোগ নেয়া হয়।

মানবকণ্ঠ/এএম