ঢেলে সাজানো হচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো

ঢেলে সাজানো হচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো

টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ মানে নিয়ে যেতে কাজ করছে সরকার; যাতে উন্নত বিশ্ব এ দেশের গোয়েন্দাদের নিয়ে হিসেবে-নিকেশ করে। এ জন্য গুরুত্ব পাবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। সংস্থাগুলোর আধুনিকরণে গঠন করা হবে গবেষণা সেল।

জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করছে সরকার। বিশেষ করে আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের দক্ষতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দক্ষতা বাড়াতে সরকার আরো পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে গোটা বিশ্ব নির্ভর হয়ে পড়ছে প্রযুক্তির ওপর। বাংলাদেশও সেই গেটওয়তে প্রবেশ করেছে। অপরাধীচক্রের নিত্য নতুন কৌশল রপ্ত করা, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসীদের রুট বদল, স্বল্প সময়ে অধিকতর সফলতা অর্জন, অ্যাডভান্সড ইন্টেলিজেন্স, সমন্বিত গোয়েন্দা কার্যক্রম ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে রিয়াল টাইম (তাত্ক্ষণিক) তথ্য বিনিময়সহ সবক্ষেত্রে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের বেশ অর্জন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আরো গবেষণা দরকার; যাতে নতুন প্রজম্ম এ থেকে অর্জন করে তা কাজে লাগাতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এ বিষয়ে বলেন, আমাদের দেশের গোয়েন্দাদের সক্ষমতা এখন বিশ্বে প্রশংসিত। বিশেষ করে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদে জড়িত জঙ্গিদের মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের প্রশংসা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা করেছেন। অতিমাত্রায় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র গোয়েন্দা দক্ষতার কারণে আস্তানা থেকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করার ঘটনায় আমাদের গোয়েন্দারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো আধুনিক করা হবে। আধুনিকায়নের কোনো শেষ নেই। সামনের দিনগুলোতে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশের গোয়েন্দারারা যে ধরণের উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করবে, বাংলাদেশের গোয়েন্দারাও একই ধরণের উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহার করবে। গোয়েন্দাদের বিশ্বমানের আদলে ঢেলে সাজানোর ব্যাপারে সরকার নানা ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার প্রযুক্তিগতভাবে গড়ে তুলছে গোয়েন্দাদের। আগামীতে আরো নতুন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ঢেলে সাজানো হবে। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে— এমন কিছু করা; যা আগামী প্রজম্মের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকে।

সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ঢেলে সাজানোর জন্য সরকার একটি রূপরেখা করতে যাচ্ছে। যেখানে যার দক্ষতা-অভীজ্ঞতা কাজে লাগানো যায় সেখানে সেই কর্মকর্তাকেই নিযুক্ত করা হবে। আর গঠন করা হবে গবেষণা সেল। আরো উচ্চতায় যেতেই এ পরিকল্পনা নেয়া হয়। দেশ-বিদেশে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা সেল গঠনসহ দক্ষ লোককে উপযুক্ত স্থানে বসানো হবে। এ ক্ষেত্রে পদ-পদবীতে আগামীতে পরিবর্তন আসছে। তিনি জানাান, গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর এর চেয়েও বড় ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। কোনো ঘটনা ঘটলে দৃশ্যমান পরিস্থিতি এমন হয়— যা চারদিকে ভীতির জম্ম দেয়। এমন অনেক ভীতিকর পরিস্থিতি হতে পারত গুলশান হামলার মতই, অথচ আগাম গোয়েন্দা তথ্যের কারণে সে ধরনের গোটা কয়েক পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন গোয়েন্দারা। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সরকারের কাছে দিয়েছে সংস্থাগুলো। আর প্রতেকটি ঘটনা পরিকল্পনা ছিল রাষ্ট্রবিরোধী। যেখানে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।

বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ মানবকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দেশে অনেকগুলো গোয়েন্দা সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। এর মধ্যে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ অন্যতম। বর্তমানে জঙ্গিরা বিদেশে থেকে হামলার হুমকি দেয়। এ ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা জঙ্গিদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে ঢাকার গোয়েন্দাদের আরো জোরদার ভূমিকা নিতে হবে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে আরো ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে যে কাজটি করতে হবে তা হলো— কেন্দ্রীয়ভাবে গোয়েন্দাদের কর্মকাল্ড নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের দিক নির্দেশনা প্রদান এবং চিহ্নিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আরো কৌশলী হওয়া। তিনি বলেন, গোয়েন্দাদের র্কমকাণ্ডের পাশাপাশি তাদের কর্ম পরিবেশকে ঢেলে সাজাতে হবে। যেটা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বিশেষ গোষ্ঠি দেশের ভেতরে নানাভাবে সংকট তৈরির অপচেষ্টা করছে। তারা কখনো ম্যানুয়ালি আবার কখনো ভার্চুয়ালি চেষ্টা করে। তাদের এই ধরণের অপচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে ভীতি ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করা। সামগ্রিকভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা। চক্রটি এখনো সক্রিয় আছে। তারা অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও আগাম তত্পরতার কারণে তাদের সব চেষ্টায় ভেস্তে যাচ্ছে। তিনি জানান, সামনের দিনগুলোতে চক্রটি অরো অভিনব ও কৌশলী আক্রমণের চেষ্টা চালাতে পারে, তাও গোয়েন্দারা আগাম জেনে গেছে। এসব কারণে সরকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো ঢেলে সাজাতে উদ্যোগ নিচ্ছে এবং কিছু কর্ম পরিকল্পনা এখন প্রায় বাস্তবায়নেরও পথে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নির্বাচনের সময় অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল; যা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছেন গোয়েন্দারা। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও উসকানিমূলক তত্পরতা রোধে সামাজিক মাধ্যমে তত্পর ছিল বিশেষ গোষ্ঠী। তারা আবার নতুন কায়দায় তত্পর হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স ও স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মো. মনিরুজ্জামান মানবকণ্ঠকে বলেন, গোয়েন্দারা আগাম তথ্যের মাধ্যমে অনেক ঘটনা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা নাশকতা মোকাবিলায় যে ধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছেন, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে উন্নত বিশ্বের মতোই বাংলাদেশে এখন সাইবার পেট্রলিং আগের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। এতে করে অনেক তথ্য আগাম জানা সম্ভব হচ্ছে। আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে যত আধুনিক ও উচ্চপ্রযুক্তি দেয়া হবে ততই সফলতা আসবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.