ঢাকা সিটির খেলার মাঠ বেদখল

ঢাকা সিটির খেলার মাঠ বেদখলদুই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) বেশিরভাগ খেলার মাঠই চলে গেছে বিভিন্ন ক্লাবের তত্ত¡াবধানে। অনেক মাঠের চারপাশে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। ফটকে ঝোলে তালা। মাঠগুলো সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারছে না। বয়স্করা পারছে না হাঁটতে। আর ছোটরা পারছে না খেলতে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে মাঠগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নেই।

জানা গেছে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মুক্ত ময়দান, খেলার মাঠ, পার্ক-উদ্যানগুলো করা হয়েছে জবরদখল। সার্বজনীন ব্যবহারের জন্য গড়ে তোলা মাঠগুলো কোথাও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দখল করে নিয়েছে। দখলবাজদের দৌরাত্ম্যের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ আর শিশুদের কাছে এসব মাঠ ‘এলিট শ্রেণির মাঠ’ হিসেবে পরিচিত। কারণ, মাঠের সীমানায় নির্ধারিত ক্লাবে কোচিং নেয়া সদস্য ছাড়া বাকিরা অপ্রত্যাশিত। তাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুধু খেলা দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া মাঠের নিয়ন্ত্রণ ক্লাবের দখলে থাকায় স্থানীয়রা বাধ্য হন উন্মুক্ত স্থান বা অন্য এলাকার পার্ক ব্যবহারে। এভাবেই টিএনটি মাঠ থাকলে ওই এলাকার খেলা চলে যায় ফার্মগেট পার্কে অথবা শের ই বাংলার বাণিজ্য মেলার পরিত্যক্ত কংক্রিটের মাঠে। ধানমণ্ডির মাঠটি এখন শেখ জামাল ক্লাবের পক্ষে বেদখল হয়ে আছে। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরের বড় মাঠটি হয়ে গেছে ফ্রেন্ডস ক্লাব মাঠ। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের এবিসিডি এবং ই-ব্লকে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের খেলার মাঠ ও পার্ক হিসেবে বরাদ্দ থাকলেও এটি সিটি ক্লাবের দখলে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ দখলে নিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে। ফলে এলাকাবাসী মাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গুলশানের সার্বজনীন মাঠটির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে ইউথ ক্লাব মাঠ।

ক্রিড়া সংগঠক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে ৩১টি পার্ক ও খেলার মাঠ। সার্বজনীন ব্যবহারের জন্য গড়ে তোলা মাঠগুলো কোথাও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দখল করে নিয়েছে। ফলে ডিসিসির অনেক খেলার মাঠই সাধারণ মানুষের প্রবেশ দখলদার প্রভাবশালীদের কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। মাঠে চলছে ক্লাবের নির্ধারিত কার্যক্রম। মাঠের নিয়ন্ত্রণ ক্লাবের দখলে থাকায়, এলাকাবাসী মাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর তাই স্থানীয়রা বাধ্য হন উন্মুক্ত স্থান বা অন্য এলাকার পার্ক ব্যবহারে। ফার্মগেট এলকার বাসিন্দা সৈয়দ মো. আরমান হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের দেশটা আসলেই সোনার দেশ হিসেবে গড়া সম্ভব, যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি এবং নিজের বিবেককে সঠিকভাবে জাগ্রত করি। তিনি বলেন, বিবেক খাটিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করলে আমাদের দেশের কোথাও সমস্যা থাকা তো দূরের কথা কোনো সমস্যার সৃষ্টিই হবে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, সিটি কর্পোরেশনের মাঠ সাধারণ মানুষের। সেসব মাঠ কোনো ক্লাবের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে রাখা অবৈধ। তবে এগুলো উদ্ধারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা এখনো মেলেনি।

ডিএসসিসির মাঠগুলো ক্লাবের তত্ত্ববধানের বাইরে নিয়ে এসে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার তাগিদ দিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ক্রিড়া সংগঠকগণ।

জানা গেছে, মেয়র সাঈদ খোকনের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল গ্রিন ও ক্লিন ঢাকা গড়া। গ্রিন ও ক্লিন ঢাকার প্রকল্পের অংশ হিসেবে যেসব মাঠের নকশা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কলাবাগান মাঠ, বাসাবো মাঠ, লালবাগের দেলোয়ার হোসেন মাঠ, আমলিগোলা মাঠ, শহীদনগর মিনি স্টেডিয়াম, বালুরঘাট মাঠ ও শহীদ আবদুল আলিম মাঠ, বাবুবাজারের রহমতগঞ্জ মাঠ, বংশালের সামসাবাদ মাঠ, বাংলাদেশ মাঠ, গোলাপবাগ খেলার মাঠ এবং ধোলাইখালের সাদেক হোসেন খেলার মাঠ। আর পার্কের মধ্যে রয়েছে- কারওয়ান বাজারের পান্থকুঞ্জ, গুলিস্তানের ওসমানী উদ্যান, যাত্রাবাড়ী পার্ক, শরাফতগঞ্জ পার্ক, গুলিস্তান পার্ক, জিন্দাবাহারের সিরাজউদ্দৌলা পার্ক, জগন্নাথ সাহা রোড পার্ক, হাজারীবাগ পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, বংশালের সিক্কাটুলি পার্ক, বংশাল পার্ক, মালিটোলা পার্ক, ওয়াটার ওয়ার্কস রোডের বশিরউদ্দিন পার্ক, সায়েদাবাদের আউটফল স্টাফ কোয়ার্টার শিশুপার্ক, মতিঝিল পার্ক, ধানমণ্ডি ৩ নম্বর পার্ক, হাজারীবাগের গজমহল পার্ক, বকশীবাজার পার্ক ও রসুলবাগ শিশুপার্ক। ডিএসসিসি সূত্র জানায়, কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পার্কগুলোর কৃত্রিম লেক, পুকুর, স্লিপার ও দোলনা সংস্কার করা হবে।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকাকে বাঁচিয়ে তোলার নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে একটি গ্রিন ও ক্লিন ঢাকা উপহার দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিটি মানুষের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রয়োজন। এ চিন্তা থেকেই এক সময় নগর পরিকল্পনায় পার্কের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু অবৈধ দখলদারদের কারণে নগরীর জানালা বলে পরিচিত পার্কগুলো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

নাগরিকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ডিএসসিসির আওতাধীন সীমানায় অবস্থিত এসব পার্ককে পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে। সরকার ও ডিএসসিসির যৌথ অর্থায়নে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের ৩০ ভাগ অর্থ ব্যয় করবে ডিএসসিসি আর ৭০ ভাগ অর্থ দেবে সরকার। প্রতিটি পার্কে থাকবে খাবার পানির ব্যবস্থা। শরীর চর্চা বা হাঁটাচলা শেষে বিশ্রামের পর হালকা খাবারের জন্য পার্কের ভেতরে বা নির্দিষ্ট স্থানে ক্ষুদ্র আকৃতির দোকান বসানোর অনুমতি দেয়ারও চিন্তা করছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া এসব পার্কে সন্ধ্যার পর যাতায়াতকারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য পার্কের ভেতর বিদ্যুতের আলোর ব্যবস্থা করা হবে। পার্কে প্রবেশ ও বাহিরের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেয়া থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে ও সুরক্ষার কথা ভেবে রাত ৯টার পর কেউ এসব পার্ক ব্যবহার করতে পারবে না। সবসময় সংরক্ষিত রাখার জন্য সার্বক্ষণিক গেট লাগানো থাকবে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় এসব পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ করার চিন্তা করছে সংস্থাটি। পার্ক ব্যবহারকারীদের স্বার্থে প্রতিটি পার্কের কয়েকটি স্থানে পার্কের নাম উল্লেখসহ পার্কে প্রবেশ ও বাহিরের সময়সহ পার্ক ব্যবহারের নিয়মাবলী লাগানো থাকবে।

মানবকণ্ঠ/এএম