ঢাকা আসলে কোন শ্রেণি-পেশার নাগরিকের?

বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয় স্থান নিয়েছে। সহজ করে বললে মানে দাঁড়ায়, বসবাসের ন্যূনতম যোগ্যতা হারাতে বসেছে ঢাকা। এমন রায়ভিত্তিক তালিকা তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ইকোনমিস্টের মালিক প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা ইউনিট ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। এমন কথা ঢাকায় বাস করে কেবল আমরাই অনুভব বা উপলব্ধি করছি না, অন্যেরাও ভাবছে, দেখছে, উপলব্ধি করছে।

সম্প্রতি ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বসবাসের সূচক নির্ভর গবেষণায় এই রায় দেয়া হয়েছে। অবকাঠামো, স্থিতিশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশ এই পাঁচটি সূচকে মোট ১৪০টি শহরের বাসযোগ্যতা নিরূপণ করে ইআইইউ । এ বছর ১৪০টি দেশে ঢাকার অবস্থান ১৩৯তম। গত বছর ছিল ১৩৭তম। ঢাকার অবস্থান ক্রমশ নিম্নমূখী।

এমন প্রতিবেদন বেশ আলোড়ন তুলেছে। তোলাই স্বাভাবিক। যেহেতু ইআইইউ-এর প্রতিবেদন নেতিবাচক, সুতরাং কিছু মানুষ এই প্রতিবেদনে চাপা উত্তেজনায় ভুগবেন, ক্ষুব্ধ হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। দেখা যায় যে, ভিনদেশীয় মূল্যায়ন যদি পুরস্কৃত হবার মতো হয়, তখন চারপাশে বিজয়ের বিজলি জ্বলে ওঠে। জয়ের জয়জয়কার হয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, অন্যদেশ বা জাতির বা সাদা চামড়ার প্রশংসা আমাদের অনেকেরই কাছে এতবেশি প্রিয়, কাক্সিক্ষত হয়ে থাকে যে, কখনো সখনো নিজেদেরকে ঐ প্রশংসার চাইতেও অধিক বেশি প্রশংসিত করে ফেলি নিজেরা এবং তা ঐ প্রশংসারই তোড়ে। ব্যাপার অনেকটা এ রকম যে, যতটুকু আসল, তার বহুগুণ নকল মিশিয়ে ফেলা।

পুরস্কার কতটা যৌক্তিক, তেমন বিশ্লেষণের চাইতে, অঙ্কের জোড়াতালির হিসাব মিলিয়ে সাফল্যের ঢেঁকুর তোলেন। ঢেকুর তুলতেই পছন্দ করেন। ঠিক এই অবস্থার বিপরীত একটা অবস্থা রয়েছে। এই বিপরীত অবস্থা দেখা যায় তখন, যখন অন্যদেশ, জাতি আমাদের সম্পর্কে কোনো একটি নেতিবাচক মূল্যায়ন করে থাকেন। নেতিবাচক মূল্যায়ন কোনোভাবেই মানতে রাজি বা আগ্রহী হন না এই শ্রেণির মানুষ। স্বার্থান্বেষী মানসিকতার কারণে তাদের পক্ষে এটা মানতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তখন এমন মূল্যায়নের বিরোধিতা চলতে থাকে। প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়।

নেতিবাচক মূল্যায়ন প্রত্যাখিত হয়। বলাও হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়, অন্যদের নাক না গলালেও চলবে। নাক না গলানোটা সমীচীন বলে উল্লেখ করেন। আপন সাদা তখন পর সাদা হয়। সুতরাং ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা কোনোভাবেই মেনে নেবার কথা নয়, অন্তত তাদের। না বলে উপায় নেই যে, এই দ্বিমুখী বা দ্বৈত আচরণই কোনো সমস্যার সুষ্ঠু, সুস্থ সমাধান দেয় না। কখনো দেয়ওনি। এই দ্বৈত বা দ্বিমুখী আচরণ রাষ্ট্রে বড়সড় ফাঁকফোকর রেখে দিতে, ব্যক্তিগোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারে যথেষ্ট সহায়ক হয়। হয়েছেও। দ্বৈত নীতি ব্যক্তি থেকে যখন রাষ্ট্রে গিয়ে পৌঁছে, তখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারায়, ধিক্কৃত হয় জনসাধারণের কাছে।

দেখলাম, ঢাকা সম্পর্কিত এমন তথ্য উপস্থাপনে প্রতিক্রিয়া প্রকাশে বসে নেই টিভি চ্যানেলগুলো। টকশোর নতুন আইটেম পেয়ে গেছে সরব থাকতে। আলোচকদের সমাহারও ঘটল। একটা বাসসোগ্য শহর তো তো সকলেরই কাম্য। যাই হোক, নগরায়ণ ও বাসযোগ্য শহর নিয়ে পুরনো কথার, নতুন বাচনভঙ্গিও দেখলাম টিভি পর্দায়। সেইসঙ্গে পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বিবিসি বাংলাকে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কোন ধরনের, কোন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের জন্য ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য শহর বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা তার কাছে স্পষ্ট নয়।

তিনি আরো বলেছেন, পৃথিবীর অনেক শহরের তুলনায় ঢাকায় অপরাধের ঘটনা খুবই কম। কোনোমতেই ঢাকার অবস্থান এত নিচে আসতে পারে না বলে তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। যে শহরের তিনি নগরপিতা, সেই শহর সম্পর্কে এমন কথা কেন তিনি মানবেন, কোনোভাবেই মানবার কথা নয়, যতই সত্য হোক। সেটা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। মেয়র ঠিক জানতে চেয়েছেন যে, কোন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের জন্য ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য শহর বলা হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে মেয়রের কাছে আমার পাল্টা প্রশ্ন, তিনি কোন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের জন্য ঢাকাকে বসবাসের যোগ্য বলে মনে করেন? নিশ্চয়ই মেয়রের থলেতে এই প্রশ্নের উত্তর আছে। সুস্পষ্ট না হলেও তার কথায় আভাস পাওয়া যায় যে, ঢাকা কোন একটি শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের জন্য বসবাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। যে তথ্য মেয়র জানেন, ইআইইউ হয়তো জানেন না। জানতে পারেননি। আমরাও তো বিস্মিত এই ভেবে, ঢাকা কি তবে বসবাসের প্রশ্নে শ্রেণি-পেশার মাপকাঠিতে পড়ে গেল !

মেয়র ভুল বলেননি। ঢাকায় কয়েক শ্রেণি-পেশার নাগরিক বাস করেন। প্রকাশ্যে তেমন তালিকা না থাকলেও তা শহরের বাস করে সহজেই অনুধাবন করা যায়। প্রথম শ্রেণি হলো, সরকারের মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক হোমরাচোমরা। দ্বিতীয় শ্রেণি হলো শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, কোটিপতি। তৃতীয় শ্রেণি হলো সব ধরনের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী। চতুর্থ শ্রেণি হলো, সুশীল বলে খ্যাত বুদ্ধিওয়ালা গোষ্ঠী। পঞ্চম শ্রেণি হলো, সাধারণ সরকারি ও বেসরকারে চাকুরে এবং ষষ্ঠ শ্রেণি হলো, স্বল্প আয়ের ও সুবিধাবাদী জনগোষ্ঠী। শহরটা আসলে কোন শ্রেণির বসবাসযোগ্য? যদি রাস্তায় চলাচলের সুবিধার কথা বিবেচনা করি, তাহলে এককথায় প্রথম শ্রেণির। অর্থাৎ সরকারের মন্ত্রী, আমলা ও রাজনৈতিক হোমরাচোমরার।

সাধারণ মানুষের চলাচল ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোধ করে ভিআইপি তথা মন্ত্রীরা চলাচল করেন। কখনো রং সাইড দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে দাপুটের পরিচয় দেন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক হোমরাচোমরার দল। সম্প্রতি কিশোর আন্দোলনে একটা সত্য ফুটে উঠেছে, এই শ্রেণির অনেকেরই বৈধ কাগজপত্র নেই গাড়িতে। যাচ্ছেতাইভাবে তারা রাস্তায় চলাচল করেন। যদি শহরে বড় বড় দালানকোঠা, অট্টালিকা, শিল্পকলকারখানা বানাবার ও অন্যান্য ব্যবসার ক্ষেত্রে অধিক সুবিধাপ্রাপ্তির কথা বিবেচনা করি, তাহলে এককথায় প্রথম শ্রেণি, তথা মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক হোমরাচোমরা, দ্বিতীয় শ্রেণি শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, কোটিপতি এবং কিছু ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি, তথা সব ধরনের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী এর আওতায় পড়েন। যদি স্বাস্থ্য, শিক্ষার ক্ষেত্রে শহরে বিদ্যমান হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহণের প্রশ্ন তুলি, তাহলে নির্দ্বিধায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থশ্রেণির নাগরিকেরা এই সুবিধাভোগের আওতায় পড়েন।

কারণ, অতি ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণে সামর্থ্য কেবল তারাই হয়ে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিককে এই সব সুবিধাপ্রাপ্তিতে নিজের জমি, ভিটেভাটা বিক্রি করতে হয়। একবারেই সুবিধাবঞ্চিত নাগরিক অভিজাত হাসপাতালগুলোকে দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখেন। যদি শহরের অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে সুবিধাগ্রহণের কথা ভাবি, তাহলে সবচাইতে সুবিধাভোগী হন, কতিপয় সুশীল বলে খ্যাত বুদ্ধিওয়ালা শ্রেণি ও কিছুসংখ্যক নিরাপত্তারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। উল্লিখিত সব ধরনের নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্ত হতে পারেন না সাধারণ সরকারি ও বেসরকারি চাকুরেরা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাগরিক সুবিধাভোগ করতে পারেন না সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, যারা বস্তিতে বসবাস করেন। দেখা যায় যে, নাগরিক সুবিধা অর্থ দিয়ে কিনে ভোগ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাদের নানান ভোগান্তি।

উল্লিখিত শ্রেণি-পেশার দিক বিবেচনা করলে একবাক্যে বলা যায় যে, এই শহর- সরকারের মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক হোমরাচোমরা, শিল্পপতি, কোটিপতি, রাজনৈতিক সুশীল, নিরাপত্তারক্ষাকারীর কতিপয় সদস্যের। ইআইইউ এসব দিক বেশি দেখেছেন কিনা, বলা মুশকিল। তবে যে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্যতায় দ্বিতীয় স্থান দিয়েছেন, সেই পাঁচটি সূচকই উল্লিখিত শ্রেণি-পেশার নিয়ন্ত্রণে।

পরিশেষে বলি, একটি শহরই একটি দেশের সার্বিক অবস্থার কথা তুলে ধরতে সক্ষম। একটি শহরকে বাসযোগ্য করার ব্যর্থতা, একটি দেশকে বসবাসের অযোগ্যতার আগাম বারতা দেয় কিনা, গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার। একদিকে একটি দেশের উন্নয়নের বারতা, অন্যদিকে সেই দেশের রাজধানীর বসবাসের অযোগ্যতা, সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী।

আর অন্য কোনো দেশের কোনো সংস্থার মূল্যায়ন যদি এসব নেতিবাচক ক্ষেত্রে নাই-ই গ্রহণ করি, তাহলে আমার ছোট মাথার পরামর্শ, ইতিবাচক মূল্যায়নও নাই-ই গ্রহণ করি। আসুন না দ্বৈত নীতি থেকে বেরিয়ে আসি। অন্তত একবার চেষ্টা করি ! – লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

মানবকণ্ঠ/এএএম